স্বভূমি ও সমকাল

কলকাতা শহরে সাইকেলের প্রত্যাবর্তনের দাবীতে অনড় নাগরিক সমাজ –

৭৪তম স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে দাবী পেশ মুখ্যমন্ত্রীর কাছে –

 

৭৪তম স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে গত ১৪ই অগাস্ট কলকাতার প্রেস ক্লাবে সকাল ১১টায় কলকাতা শহরের ৬৪টি রাস্তায় কলকাতা পুলিশ কমিশনার কর্তৃক সাইকেল নিষেধাজ্ঞা সম্বলিত অর্ডারটি প্রত্যাহারের জন্য পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর কাছে আবেদন জানালেন কলকাতার সাইকেল আরোহীবৃন্দসহ বহু বিশিষ্ট নাগরিক। কলকাতার নাগরিক সমাজের পক্ষে বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের স্বাক্ষরের জন্য একটি ক্যানভাস রেখে, তাতে কলকাতা শহরের রাস্তায় “হ্যাস ট্যাগ ব্রিং ব্যাক সাইকেলস” স্লোগানের মাধ্যমে সাইকেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আবেদন জানানো হয়। কলকাতা শহরের পরিবেশকে দূষণমুক্ত ও কলকাতা ট্রাফিক পুলিশ, পথচারীসহ সমগ্র নাগরিক সমাজের সুস্থায়ী স্বাস্থ্য রক্ষার্থে সাইকেল ফিরিয়ে আনার কথা বলা হয়। ‘সুইচ অন ফাউন্ডেশন’ এবং ‘বেঙ্গল ক্লিন এয়ার নেটওয়ার্ক’ এর উদ্যোগে এই প্রচার অভিযান চালানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়।

এই প্রসঙ্গে আপনাদের অবগত করানো জরুরি বিগত ২০০৯ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে ‘সাইকেল সমাজ’ বা পরে ‘কলকাতা সাইকেল সমাজ’ নামে এবং ‘কলকাতা সাইকেল আরোহী অধিকার, ও জীবিকারক্ষা কমিটি’ [জগুবাজার অঞ্চলের সাইকেল নির্ভর পেশাজীবীদের সংগঠন] যৌথভাবে কলকাতার রাস্তায় সাইকেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবী নিয়ে ধারাবাহিকভাবে আন্দোলন চালিয়ে এসেছে। গত ১৪ই অগাস্ট প্রেস কনফারেন্স-এ ‘কলকাতা সাইকেল সমাজ’-এর পক্ষে শ্রী
সুনীশ দেব, শ্রীমতী পৌষালি পাল এবং শ্রী অমলেন্দু সরকার বক্তব্য রাখেন। ‘কলকাতা সাইকেল আরোহী অধিকার, ও জীবিকারক্ষা কমিটি’-র পক্ষে বক্তব্য রাখেন শ্রী দুঃখশ্যাম মণ্ডল। এছাড়াও শহরের বেশ কয়েকটি সাইকেল রাইডার্স-এর সংগঠনের সদস্যরা তাঁদের পরিচিত পোষাকে উপস্থিত ছিলেন। কলকাতা, বাইক্স-এর পক্ষে বাইসাইকেল মেয়র’ শ্রী শতঞ্জীব গুপ্তও ভারতবর্ষের অন্যান্য শহরে কীভাবে সাইকেল চলাচলের জন্য সহায়ক পরিকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে তার কয়েকটি দৃষ্টান্তের উল্লেখ করেন।

শ্রী বোধায়ন মুখোপাধ্যায় তাঁর নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলেন যে তিনি নিজেই কীভাবে ফোর হুইলার্স থেকে টু হুইলার্সে ফিরে এসেছেন এবং এই শহরের স্বাস্থ্য এবং অবশ্যই শহরের নাগরিকদের স্বাস্থ্যরক্ষার্থেই সাইকেল ফিরিয়ে আনা জরুরি। শহরের সাইকেলে দুগ্ধ সরবরাহকারী সংগঠনের পক্ষের প্রতিনিধিও, খবরের কাগজ সাপ্লায়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধিরাও ইয়পস্থিত ছিলেন।

‘কলকাতা সাইকেল সমাজ’ -এর সম্পাদক শ্রী অমলেন্দু সরকার বলেন — আমরা একটু আশায় বুক বেঁধেছিলাম যখন KMDA “Cycle for Change Challenge “(Ministry of Housing & Urban Affairs আয়োজিত)প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করলো। প্রায় 120 কিমি সাইকেল pop up lane এর ভাবনা KOLKATA METROPOLITAN DEVELOPMENT AUTHORITY [KMDA] কর্তৃপক্ষ পেশ করেন ,যা বেশ বলিষ্ঠ এবং বাস্তবসম্মত। কিন্তু কলকাতা পুলিশ KMDA এর আবেদন না-মঞ্জুর করেছে বলে সূত্র মারফৎ জানা গেছে। এটা এক ধরণের প্রবঞ্চনা। ঠিক একই ঘটনা ঘটেছিল ই এম বাইপাসে BUS RAPID TRANSIT SYSTEM এর ক্ষেত্রের পরিকল্পনায়। কিন্তু কোন সরকারি বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই ছাড়াই কেবলমাত্র মাননীয় মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম এর সংবাদ মাধ্যম কে দেওয়া এক ভাষ্যে জানানো হয়েছিল BRTS পরিকল্পনা বাতিল করা হয়েছে। BRTS পরিকল্পনায় যে সাইকেল লেন তৈরির পরিকল্পনা গৃহীত হয়েছিল এবং রোড নক্সাতেও তার উল্লেখ থাকা সত্ত্বেও হঠাৎ প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে তার থেকে সরে আসা খুবই বেদনাদায়ক বলে কলকাতা সাইকেল সমাজের সম্পাদক অমলেন্দু সরকার মন্তব্য করেছেন।

সময়ের অভাব থাকায় প্রেস ক্লাবের বক্তব্য সংক্ষিপ্ত করতে বাধ্য হয়েও তিনি বলেন কেন একটি রাস্তায় শুধু মোটরগাড়ির আধিপত্যে থাকবে? Road Space ব্যবহারের ক্ষেত্রেও আমাদের গণতন্ত্র চাই। সেখানে যেমন মোটর গাড়ি থাকবে, পাশাপাশি থাকবে সাইকেল, ভ্যান ইত্যাদি অ-মোটর চালিত যান, থাকবে পথচারির জন্য ফুটপাথ। সাইকেল করিডর বা লেনই একমাত্র দিতে পারে Road Sharing-এ গণতন্ত্র। ৭৪তম স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে আমাদের আবেদন গণতন্ত্র শুধুমাত্র ভোটদানের অধিকারে নয়, আমাদের সমাজ জীবনের সর্বত্রই গণতান্ত্রিক অধিকারগুলি প্রতিফলন থাকা দরকার।

কলকাতা শহরের সর্বত্র দৈনন্দিন কাজের প্রয়োজনে যাঁরা সাইকেল ওপর নির্ভরশীল এবং যাঁরা সাইকেলকেই তাঁদের যানবাহন হিসাবে ব্যবহার করেন কিংবা সাইকেলকে খেলার অংশ হিসাবে বেছে নিতে ইচ্ছুক তাদের জন্য আমাদের শহরে পৃথক সাইকেল করিডর বা লেন অত্যন্ত আবশ্যক। ‘কলকাতা সাইকেল সমাজ’- বিগত ১২ বছর ধরে কলকাতা পুলিশ এবং পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতাসীন পূর্বতন বামফ্রন্ট সরকার এবং ‘মা মাটি মানুষ’ সরকারকে দাবি জানিয়ে এসেছে সাইকেলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে। কলকাতা শহরে প্রতিদিনই এই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করেই দুর্ঘটনার ঝুঁকি নিয়ে, কোন লেন ছাড়াই ঝাঁকে ঝাঁকে, লাখে লাখে সাইকেল চলছে। মূলত নিম্ন আয়ের মানুষ সাইকেল চালান। সাইকেল ফাইনের অর্থ তাদের জীবন-জীবিকার উপর আঘাত, করোনা পরিস্থিতিতে আর্থিক কারণে যারা সাইকেল চালান তাদের পাশাপাশি আর্থিকভাবে অপেক্ষাকৃত বলবান মানুষেরা ও সাইকেল চালাচ্ছেন। এটা এই সময়ের একটা ইতিবাচক দিক, কেননা বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রভাব থেকে আজ ভারতবর্ষের অন্যান্য শহরে এবং বিশ্বের প্রায় সমস্ত প্রথম সারির রাজধানী শহরে সাইকেলকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে, শহরের পরিবেশ স্বার্থে এবং অবশ্যই নাগরিকদের স্বার্থে।

২০১৪ সালের কলকাতা পুলিশের যে নোটিফিকেশনে এখন ও ৬৪ টি রাস্তায় সাইকেল নিষিদ্ধ সেই নোটিফিকেশন জারি হয়েছে West Bengal Motor Vehicle Rules এর অধীনে। এই আইনে সাইকেল ফাইনের কথা নেই। বরঞ্চ সাইকেল ট্র্যাক-এর কথা বলা আছে, ট্র্যাফিক পৃথকীকরণের কথা বলা আছে। সরকার তার তৈরী আইনের মর্যাদা দিক।

২০০৮-এর অগাস্টে KMDA এর তরফে পেশ করা হয়েছিল Comprehensive Mobility Plan । যেখানে পথচারী লেন, সাইকেল লেনের সুপারিশ আছে। বর্তমান সরকারের আমলে ২০১৩ সালে UK govt এবং Kolkata Municipal Corporation এর মধ্যে এক মৌ স্বাক্ষর হয় “Roadmap for Low Carbon and Climate Resilient Kolkata” এই শিরোনামে — সেখানেও কলকাতা শহরের ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্য রক্ষার্থে রয়েছে সাইকেল লেন এর প্রস্তাব। অর্থাৎ সরকারি নীতি পরিকল্পনায় সর্বত্রই রয়েছে শহরে সড়ক পরিবহন ও যোগাযোগ পরিকাঠামোয় সাইকেল লেন বা করিডর গড়ে তোলার প্রস্তাব। কিন্তু এই সমস্ত পরিকল্পনাগুলি রীতিমতো বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে শহরের রাস্তার পাশেই চোখে পড়ে কলকাতা পুলিশের ‘নো সাইক্লিং’ বোর্ডটি। এ এক আশ্চর্য সরকারী নীতি প্রয়োগে সরকারেই অধীনস্থ একটি সংস্থার উল্টোপুরাণ!

যে রাজ্য সরকারের অলংকার সবুজ সাথী প্রকল্প, যার জন্য আমাদের সরকার সারা বিশ্বে সমাদৃত, সেই শহরে সাইকেল ব্রাত্য হতে পারে না। মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রীর কাছে আমাদের আবেদন, অবিলম্বে সাইকেল ফাইন বন্ধ করুন, সাইকেলের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করুন, খুলে দিন “No Cycling Board” কলকাতার রাস্তা থেকে।।

Leave a Reply