পরিবেশবসুধাবিজ্ঞান

কলকাতার রাস্তায় আমরা সাইকেল নির্ভর পেশাজীবী

নাগরিক হিসাবে আমরাও চাই যাতায়াতের অধিকার

বিগত ১২ বছর কলকাতা পুলিশের কলকাতার রাস্তায় ‘নো-সাইক্লিং বোর্ড’ টানিয়ে সাইকেল আরোহীদের থেকে রসিদ বিহীন আর্থিক জরিমানা আদায় অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে! সাইকেল নির্ভর পেশাজীবীদের চাই মর্যাদা, নিরাপদে যাতায়াতের জন্যচাই ‘সাইকেল লেন’দাবী জানাচ্ছে‘কলকাতা সাইকেল সমাজ’

১১ আগস্ট জাতীয়-শহীদ দিবসের শততম বর্ষে আরেকবার শৃঙ্খলিত কলকাতার সাইকেল আরোহীবৃন্দ –

১১ই আগস্ট (১৯০৮) সমগ্র বাঙালির কাছে স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে উৎসাহিত হওয়ার দিন। এদিনই বাঙালির সন্তান ক্ষুদিরাম বসু হাসিমুখে দেশমাতৃকার পরাধীনতার শৃংখল মোচনের উদ্দেশ্যে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। আর ঠিক একশতম বছরের সেই শহীদ দিবসেই অর্থাৎ ২০০৮ সালের ১১ই আগস্ট দিনটিতেই কলকাতার শহরের সাইকেল-আরোহীগণ তাদের স্বাধীনভাবে যাতায়াতের (Right to movement) অধিকার হারালেন; কলকাতা পুলিশ কমিশনার শ্রী গৌতম মোহন চক্রবর্তীর (সিপিএম পরিচালিত বামফ্রন্ট সরকার মনোনীত) জারী করা একটি আদেশনামার ভিত্তিতে । (পশ্চিমবঙ্গ ট্র্যাফিক রেগুলেশন আইন, ১৯৬৫-এর ধারা (৪) (১৯৬৫ সালের পশ্চিমবঙ্গ অ্যাক্ট-পঞ্চদশ) এর উপ-ধারা (১) দ্বারা প্রদত্ত ক্ষমতার অনুশীলনে, পশ্চিমবঙ্গ, স্বরাষ্ট্র (পরিবহন) বিভাগের আদেশ নং-এর সাথে যৌথভাবে ২০ জুলাই, ১৯৬৫-এর আদেশনামা ৭৬৩৫-ডাব্লু/টি এবং এই বিষয়টিতে পূর্ববর্তী সমস্ত আদেশ বা বিজ্ঞপ্তিগুলি বাতিল হয়ে এবং রাজ্য সরকারের অনুমোদনে, আমি, কলকাতার পুলিশ কমিশনার গৌতম মোহন চক্রবর্তী, কলকাতায় নিরাপদে এবং নিরবিচ্ছিন্ন যানবাহন চলাচল অব্যাহত রাখতে, এই আদেশ করছি যে কোনও বাই- সাইকেল নীচের উল্লেখিত রাস্তাগুলিতে রাস্তাগুলিতে সমস্ত দিন সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা চলাচল অথবা দাঁড়িয়ে থাকবে না : ৩৮টি উত্তর, দক্ষিণ ও মধ্য কলকাতার রাস্তার নামের তালিকাসহ) .

(রাস্তায় ‘নো-সাইক্লিং’ বোর্ড/কলকাতা পুলিশ)

 

 

 

 

 

 

(কলকাতায় সাইকেল নিষিদ্ধ/কলকাতা পুলিশ)

সংবিধানের মৌলিক অধিকারের বিরুদ্ধে কলকাতা পুলিশের এই আদেশনামার সঙ্গে সঙ্গেই স্বাধীন ভারতবর্ষের নাগরিক হিসাবে সাইকেল-আরোহীগণ আরেকবার পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ হলেন, যখন তারা ভারতবর্ষের সংবিধান প্রদত্ত অধিকার দ্বারা শহরের সাধারণ নাগরিক হিসাবে সর্বত্র যাতায়াতের অধিকার, নিজেদের স্বাধীন পেশা নির্বাহের অধিকার থেকে বঞ্চিত হলেন এবং রাতারাতি খোদ কলকাতাতেই সাইকেল নির্ভর পেশাজীবীদের অধিকার খর্ব করল তথাকথিত শ্রমজীবীশ্রেণীর মানুষের অধিকার-স্বার্থ নিয়ে কথা বলা সিপিএম পরিচালিত বামফ্রন্ট সরকার। শুধু কলকাতা শহরেরই নয় ভারতবর্ষ তথা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের সমাজকর্মী, পরিবেশকর্মী, স্বাধীনতাকামী চেতনাসম্পন্ন মানুষ কলকাতা পুলিশ এবং বাম-সরকারের এই নির্দেশিকায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন এবং এই সিদ্ধান্তকে পরিবেশ চেতনা বিরোধী, অগণতান্ত্রিক এবং নিঃসন্দেহে সাধারণ নিম্ন আয়ের ওপর নির্ভরশীল চাকরিজীবী, এবং স্বাধীন স্বল্প আয়ভুক্ত ব্যবহারজীবী শ্রেণীর স্বার্থ বিরোধী বলে অভিহিত করেছেন। একটি শহরের রাস্তায় চলাফেরা করা বা যাতায়াত করার অধিকার সকল নাগরিকেরই থাকা উচিত,  শহরের সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা কেবলমাত্র মোটরগাড়ি ব্যবহারকারীদের জন্য সংরক্ষিত হতে পারে না। শহরের প্রত্যেক নাগরিকের যাতায়াতের জন্য রাস্তার স্পেস (space) বরাদ্দ থাকা বাঞ্ছনীয়। এই রাস্তা কারও একার নয়! শহরের রাস্তার ওপর শুধুমাত্র মোটরগাড়ি ব্যবহারকারীদের অধিকার থাকবে, যারা হেঁটে যাতায়াত করতে চাইবে –সাইকেলে যাতায়াত করতে চাইবে তাদের জন্য রাস্তার কোন স্পেস বরাদ্দ থাকবে না – এই ব্যবস্থাপনা ভারতবর্ষের সংবিধানের মৌলিক অধিকারের অন্তর্ভূক্ত সাম্যের ধারণা (Article 14, Equality before law এবং Article 21, Protection of life and personal libertyএবং সংবিধানের নির্দেশমূলক নীতির(Article 38, State to secure a social order for the promotion of welfare of the people) পরিপন্থী।

আইনসম্মত জরিমানা আদায় না তোলাবাজি?

কলকাতা পুলিশ কমিশনারের একমুখী হঠকারী এই আদেশনামাটি নিঃসন্দেহে কলকাতার রাস্তায় সাইকেল চলাচলকে বন্ধ করতেই জারী করা হয়েছিল। তৎকালীন বাম সরকার এবং বর্তমানের তৃণমূল সরকার কর্তৃক নিযুক্ত কলকাতা পুলিশ কমিশনারগণ ধারাবাহিকভাবেই কলকাতার রাস্তায় সাইকেল নিষিদ্ধ করার অর্ডারটিকে বাতিলের পরিবর্তে আরোও কঠোরভাবে প্রয়োগের বার্তা দিয়ে ‘নো সাইকেল’ জোনের  আওতাধীন রাস্তার সংখ্যা বাড়িয়ে দিলেন। অর্থাৎ রাজ্যে ক্ষমতাসীন সরকারের পরিবর্তনে রাজধানী শহর কলকাতায় প্রশাসনের সাইকেল বিরোধী অবস্থান কোনও পরিবর্তন ঘটেনি; বরং আরও আটোসাঁটো হয়ে সাইকেল আরোহীদের হেনস্থা ও বেআইনি অর্থ আদায়ের পরিমাণ মূল্যবৃদ্ধির সাথে সামঞ্জস্য রক্ষা করে সময়ের সাথে বেড়ে (২০০৯ এর ৬০/৭০ টাকা থেকে বর্তমানে ১২০/১৫০ টাকা) চলেছে। কলকাতায় নিষিদ্ধ রাস্তাগুলিতে কলকাতা পুলিশের ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ বিভাগ ও স্থানীয় থানার পুলিশ-এর যৌথ বোঝাপড়ায় উর্দিধারী এবং সাদা পোষাকের পুলিশের সৌজন্যে শহরের বিভিন্ন রাস্তার মোড়ে সাইকেল আরোহীদের থামিয়ে, সাদা কাগজে স্থানীয় থানার স্টাম্প দেওয়া স্লিপ ধরিয়ে (বিনা রসিদে) অর্থ (৭০ টাকা থেকে শুরু হয়ে বর্তমানে ১২০/১৫০ টাকা) আদায়ের স্থায়ী ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা হয়, যেখানে পুলিশের ঠিক করা টাকা দিলেই মিলত সেদিনকার মতো সাইকেল চালানোর ছাড়পত্র, অন্যথায় সাইকেল বাজেয়াপ্ত করে আলিপুর কোর্ট থেকে ছাড়ানোর কথা বলা হত। স্বাভাবিকভাবেই ভীত-সন্ত্রস্ত সাইকেল আরোহীরা কোর্টের নাম শুনে এবং কাজের সময়ে সাইকেল খোয়ানোর ভয়ে তখনকার মতো টাকা দিয়ে দিতে বাধ্য হয়।

প্রকাশ্যেই পশ্চিমবঙ্গ ট্রাফিক রেগুলেশন অ্যাক্ট, ১৯৬৫-এর  অবমাননায় কলকাতা পুলিশ –

অথচ পশ্চিমবঙ্গ ট্রাফিক রেগুলেশন অ্যাক্ট, ১৯৬৫-এ কোথাও আর্থিক জরিমানার উল্লেখ ছিল না। এমনকি কলকাতা পুলিশের দেওয়া ওয়েব সাইটে ট্রাফিক আইনভঙ্গকারীদের জন্য যে জরিমানার কথা বলা হয়েছিল তাতেও কোথায় সাইকেল-এর ওপর জরিমানা করার উল্লেখ নেই। সর্বোপরি ১৯৬৫-র যে অ্যাক্ট-এর বলা হয়েছিল যে সরকার ব্যতীত অন্য কোন সংস্থার কর্তৃক এই জাতীয় অর্ডার কার্যকরী করতে হলে অনধিক দু’মাসের মধ্যে সরকারের অনুমোদন নিতে হবে।  ২০১৩ সালে কলকাতা পুলিশের কাছে শ্রী অসীম বরাল নামে এক ব্যক্তি (1A, D.L Khan Road, Kolkata- 700027) RTI Act, 2005 তথ্য অধিকার আইনের ভিত্তিতে করা প্রশ্নের মাধ্যমে জানতে পারেন কলকাতা পুলিশ কমিশনার কর্তৃক জারী করা অর্ডারটি সরকার কর্তৃক অনুমোদিত নয় বা এই অর্ডারটিকে সরকার অনুমোদন করেননি। অথচ কলকাতা পুলিশ একটি সম্পূর্ণ বেআইনি অর্ডারের সাহায্যে প্রকাশ্য কলকাতা শহরের রাস্তায় সাইকেল চালকদের থেকে পাঁচ বছর ধরে জরিমানা আদায় করেছে, বিনা রসিদে (কলকাতা পুলিশের স্ট্যাম্প দেওয়া একটি স্লিপ স্থানীয় থানার তরফে ধরানো হতো)।

আর কোন শ্রেণীর মানুষের কাছে থেকে কলকাতা পুলিশ এই বেআইনি জরিমানার অর্থ আদায় করতেন? তাদের মধ্যে ৯৮% মানুষই হলেন কলকাতার রাস্তায় নিম্ন-আয়ভুক্ত স্বাধীন পেশাজীবী অথবা স্বল্প আয়ের চাকুরিজীবী। এদের অধিকাংশই আছেন যাঁরা আমাদের শহরের নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী এবং জরুরি পরিষেবামূলক কাজের সাথে যুক্ত (যেমন –দুধ, ছানা, খবরের কাগজ, স্বাস্থ্য কর্মী, গৃহসেবিকা, স্কুল-কলেজ-টিউশনে ক্লাসে পড়তে যাওয়া ছাত্র-ছাত্রী, ওষুধ, মাছ, ক্যুরিয়র বয়, যোম্যাটো, অ্যামাজন বা ফ্লিককার্ট- কোম্পানির কাজেও সাইকেল নির্ভর সরবরাহকারী(ডেলিভারি বয়), সিকিউরিটি গার্ড, প্রাইভেট টিউটর, ইলেকট্রিক-প্লামবার মিস্ত্রি, ড্রাইভার, ছোট কারখান্র শ্রমিক, সেলস্‌বয় এবং গার্ল, পুরোহিত, হকার, স্টেশনারি দ্রব্য সরবরাহকারী স্বাধীন পেশাজীবী মানুষ।) এদের পক্ষে মেট্রো-বাস-ট্রাম-অটোয় যাতায়াত করে নিজেদের পেশাগুলি চালানো সম্ভব নয়। উপরন্তু পেশার প্রয়োজনে একমাত্র সাইকেলই তারা খরচ বাঁচিয়ে স্বাধীনভাবে জীবিকা নির্বাহ করতে সক্ষম।

সংবাদপত্রে প্রতিবাদী কলম, বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের আবেদন, এবং সাইকেল আরোহীদের একাধিক সংগঠনে গণস্বাক্ষর সহযোগে বহু আবেদন সত্ত্বেও এমনকি, ভারতবর্ষের অন্যান্য রাজ্যের রাজধানী শহরগুলির উপমা, এবং বিশ্বের প্রথম সারির রাজধানী শহরগুলিতেও যানবাহন ব্যবস্থার পরিকাঠামোয় ‘সাইকেল লেন’-এর উপস্থিতির তথ্য দেওয়া সত্ত্বেও –পূর্বতন বামফ্রন্ট সরকার এবং বর্তমান তৃণমূল সরকার উভয়ই নীতিগতভাবে সাইকেল বিরোধী অবস্থানই গ্রহণ করে। অথচ সমকালীন বিশ্ব পরিস্থিতিতে আধুনিক ঐতিহ্যসম্পন্ন এবং নবীন উন্নত শহরগুলির দূষণ মোকাবিলায় যোগাযোগ ব্যবস্থায় অ-মোটরচালিত যান হিসাবে সাইকেলকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে এবং বিশ্বের প্রথম সারির উন্নত শহরগুলিতে যানবাহন পরিকাঠামোয় ‘সাইকেল লেন’-এর সংস্থান রাখা বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। অর্থাৎ আধুনিক শহরগুলিকে ভবিষ্যতের বাসযোগ্য করা এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দূষণ মোকাবিলা ও ‘লো-কার্বন এমিসন’(low carbon emission)-এর লক্ষ্যে অ-মোটরচালিত যান হিসাবে, সাইকেলকে (by-cycle)পরিকাঠামো স্তর থেকেই অধিক গুরুত্ব প্রদানের কথা বলা হচ্ছে। আমাদের বর্তমান রাজ্য সরকারের দ্বিচারিতা এবং কলকাতা পুরসভার আরেকটি নৈতিক দুর্নীতি আমাদের নজরে আসে।

২০১৩ সালের নভেম্বর মাসে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্যামরনের উপস্থিতিতে ব্রিটিশ কর্মসংস্থান মন্ত্রী শ্রীমতী প্রীতি প্যাটেলএবং কলকাতার মেয়র শ্রী শোভন চট্টোপাধ্যায়ের  মধ্যে একটি মৌ (Memorandum of Understanding) স্বাক্ষরিত হয় –‘Roadmap on Low-Carbon & Climate-Resilient Kolkata ‘(রোডম্যাপ অন লো-কার্বন এবং জলবায়ু-রেসিলেন্ট কলকাতা, পরে ‘রোডম্যাপ’) শিরোনামে। এই সমঝোতা দলিল বা নথিটি ব্রিটিশ সরকারের ১০ কোটি টাকার প্রযুক্তিগত সহায়তা ও অনুদানে তৈরি হয়েছিল।এই সম্মতিসূচক সমঝোতা স্মারকটিতে (রোডম্যাপ “রোডম্যাপ অন লো-কার্বন এবং জলবায়ু-রেসিলেন্টকলকাতা”) স্বাক্ষর করেন কলকাতাস্থ ব্রিটিশ হাইকমিশনার স্কট ফুশডন উড (Scott Furssedonn-Wood) এবং তৎকালীন কলকাতা মিউনিসিপ্যাল কর্পোরশন-এর মেয়র শ্রী শোভন চট্টোপাধ্যায়। সর্বোপরি এই দলিলপত্রের শুরুতেই কৃতজ্ঞতা স্বীকারে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের মন্ত্রী (যেমন বিদ্যৎমন্ত্রী, পরিবেশমন্ত্রী) এবং সচিবদের নাম। এমনকি ড. কল্যান রুদ্র, চেয়ারম্যান,‘পশ্চিমবঙ্গ দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ’ (WBPCB) এবং মি.আর.এন.সেন চেয়ারম্যান, পশ্চিমবঙ্গ ইলেকট্রিসিটি রেগুলেটরই কমিশন (WBERC) এর প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞতা জানানো হয়েছে। রোডম্যাপের দলিলে (Roadmap on Low-Carbon & Climate-Resilient Kolkata পরে ‘রোডম্যাপ’) একাধিকবার প্রধান যে সুপারিশগুলি করা হয়েছে তাদের মধ্যে রয়েছে — সৌরশক্তির ব্যবহারে উৎসাহ প্রদান, দুর্যোগ মোকাবিলার ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্য, কলকাতা শহরের কার্বন নিঃসরণ-এর পরিমান কমিয়ে আনা, প্রাকৃতিক সম্পদের সংরক্ষণ,কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং শক্তি সাশ্রয় যোগ্য দক্ষ পৌরপরিষেবার পাশাপাশি আগামী এক দশকের মধ্যে দশ লক্ষেরও বেশি নতুন সবুজ কর্মসংস্থান সৃষ্টি।

রোডম্যাপ-এ কলকাতার দূষণ নিয়ন্ত্রণে অন্যতম গুরত্ব দেওয়া হয়েছে। কলকাতার বায়ু দূষণের পরিস্থিতি সম্পর্কে বলা হয়েছে — ভারতের বৃহত্তম শহরগুলির মধ্যে কলকাতা পঞ্চম সর্বোচ্চ গ্রিনহাউজগ্যাস (জিএইচজি) নিঃসরণকরে।এটি মাথাপিছু co2 নির্গমনের ক্ষেত্রেও দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অবদানকারী শহর। ২০১৪ সালের সমীক্ষার ভিত্তিতে কলকাতায় নির্গমন ২০২৫ সালের মধ্যে প্রায় ৫৪% বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।কলকাতা ও তার সংলগ্ন এলাকায় ১.৫কোটির বেশি মানুষ অর্থাৎ প্রায় ৭০% বাসিন্দা শহরের পরিবহণজনিত দূষণের কারণে শ্বাসকষ্টের সমস্যায় ভুগছেন।২০১৫ সালের শুরুর দিকে ‘টাইমস অফ ইন্ডিয়া’তে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে বলা হয়েছে যে কলকাতা হ’ল দিল্লিব্যতীত অন্য একমাত্র ভারতীয় শহর, যেখানে ২০৫০ সালের মধ্যে দূষিত বায়ুনিঃশ্বাসের মাধ্যমে গ্রহণের জন্য সর্বোচ্চ সংখ্যক মৃত্যুররেকর্ড গড়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

শহরের পরিবহন পরিকাঠামো ও যানবাহন নীতিতে রোডম্যাপ-এ Unified Metropolitan Transport Authority (UMTA) গঠনের কথা বলা হয়েছে। রোডম্যাপ-এ Section B5: Strategy for Climate-smart City Mobility অংশে পর্যালোচনা ও সুপারিশগুলিতে যানবাহন ও পার্কিং নীতিতে সুনির্দিষ্ট কতগুলি প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে; যেমন –১) ব্যক্তিগত যানবাহনের ব্যবহার কমিয়ে আনা;  Urban Transfer Fund (UTF) বৃদ্ধিতে পার্কিংয়ের রাজস্ব বৃদ্ধি; পাবলিক ট্রান্সপোর্ট এবং আইপিটির মোড শেয়ার বাড়ানো; পাবলিক বাইক শেয়ারিং (পিবিএস) সিস্টেমের প্রসার; ২) এনএমটি (অমোটরচালিত)যানগুলির ট্রিপস বৃদ্ধি; ৩) মোটরগাড়ী জ্বালানীর মানের নির্দেশিকা এবং নির্গমন মানগুলির কঠোর প্রয়োগ ঘটিয়ে – জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে কার্বন নিঃসরণ কমানো; ৪) পথচারী এবং সাইকেল আরোহীদের জন্য নির্দিষ্ট ‘নিরাপদ’ রুট তৈরি। অর্থাৎ শহরে পথচারীদের অনুকূল ফুটপাতের এলাকার প্রসার, যানবাহন মুক্ত সাইকেল লেন বা ট্র্যাকের সম্প্রসারণ;এবং তৎসম্পর্কিত সহায়ক পরিকাঠামো গঠন। পথচারীদের জন্য ফুটপাত এবং সাইকেল ট্র্যাক বা লেনগুলি দখলমুক্ত রাখাতে কড়া পদক্ষেপ গ্রহণ। এগুলি হল মাঝারি-মেয়াদী অ্যাকশন প্ল্যান যা দুই থেকে ৫ বছরে মধ্যে সম্পন্ন হওয়া বাঞ্ছনীয়। শহরের রাস্তাগুলিতে পথচারী এবং সাইকেল চালকদের ওপর হওয়া দুর্ঘটনা হ্রাসে এবং সার্বিকভাবে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুহার কমাতে প্রয়োজন রাস্তাগুলির পরিকাঠামোগত পুনঃনির্মাণ। এর জন্য শহরের  পরিবহণ পরিকল্পনার নকশায় আমূল পরিবর্তন ঘটিয়ে কলকাতা শহরের জন্য রাজ্য পরিবহণ দফতর, ট্রাফিক পুলিশ এবং প্রস্তাবিত Unified Metropolitan Transport Authority (UMTA) এর সহযোগিতায় মুখ্য পরিকল্পনাকারী সংস্থা হিসাবে  থাকবে কলকাতা মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন (কেএমসি)। এই Unified Metropolitan Transport Authority (UMTA) গঠন এবং কলকাতা মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের অধীনস্থ অ-মোটরচালিত পরিবহণ ব্যববস্থাপনার জন্য নির্দিষ্ট বাধ্যতামূলক বাজেটের সংস্থান করা। ((Roadmap on Low-Carbon & Climate-Resilient Kolkata, ২০১৪ পৃষ্ঠা ৫১-৫৫)

আর বাস্তবে বিগত বছরগুলিতে কলকাতা শহরের পরিবহণ ও যানবাহন পরিকল্পনায় রাজনৈতিক-প্রশানসনিক আমলাতন্ত্রের যৌথ ব্যবস্থাপনায় আমরা কি দেখলাম — কলকাতা পুলিশ প্রশাসন সাইকেলকে চিহ্নিত করল শহরের যানবাহন ব্যবস্থার বাধাসৃষ্টিকারী অন্তরায় হিসাবে এবং শহরের মোটরগাড়ির অবাধ নিয়ন্ত্রনহীন প্রসারে বৃদ্ধিতে এবং তাদের নিরবিচ্ছিন্ন গতিশীলতা বজায় রাখতে সাইকেলসহ বিভিন্ন অ-মোরটরচালিত যানগুলিকে কলকাতায় নিষিদ্ধ করা হল। একদিকে কলকাতা শহরের দূষণ মোকাবিলায় কমনওয়েলথ নেশসস্‌-এর সদস্য হিসাবে ও ব্রিটিশ ঔপনিবেশের প্রাক্তন রাজধানী কলকাতাকে দূষণমুক্ত এবং ভবিষ্যৎ বাসযোগ্য করতে পশ্চিমবঙ্গ সরকার, কলকাতা মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনএর মেয়র শ্রী শোভন চট্টোপাধ্যায় ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে ব্রিটিশ হাইকমিশনারের সাথে যৌথভাবে MOU (Memorandum of Understanding) স্বাক্ষর করছে; আর অন্যদিকে কলকাতার নগরপাল (পুলিশ কমিশনার) শ্রী সুরজিৎ কর পুরকায়স্থ প্রথম দফায়– ২০১৩ সালের ৪ঠা জুন নূতন এক নির্দেশিকায় কলকাতায় ১৭৪টি রাস্তায় সাইকেল চালানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন। 

 

(আগামী সংখ্যায় সমাপ্য)

 

 

Leave a Reply