রাজনীতিস্বভূমি ও সমকাল

সংগঠক শ্যামাপ্রসাদের কালনিরূপণ

– শ্রী অনিমিত্র চক্রবর্তী

 

অত্যন্ত অসুস্থ রবীন্দ্রনাথ তাঁর নাতিদীর্ঘ বক্তব্যে বলেন, “বহুকাল পর আজ আমি রাজনৈতিক সভায় যোগদান করিলাম। প্রথমে এই সভায় যোগ দিতে আমি ইতস্ততঃ করিয়াছিলাম; কিন্তু স্বদেশের ভবিষ্যৎ চিন্তা করিয়া আমি আপনাদের আহ্বান উপেক্ষা করিতে পারিলাম না…।” “……..কোনও কোনও সম্প্রদায়কে তাহাদের প্রাপ্যাতিরিক্ত অধিকার দানের ব্যবস্থায় এই সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারার অনর্থ আরও বৃদ্ধি পাইয়াছে। স্বকীয় উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্য গবর্নমেন্ট বিভিন্ন তুলাদণ্ডে বিভিন্ন সম্প্রদায়কে পরিমাপ করিয়াছেন। আসন্ন শাসনতন্ত্রে নিগূঢ় কারণে হিন্দুদের উপরই সর্বাধিক অবিচার করা হইয়াছে, সেই কারণ এস্থলে বলা নিরর্থক। বাঙ্গলার হিন্দুরা সংখ্যালঘিষ্ঠ সম্প্রদায়; সুতরাং তাহাদের স্বার্থরক্ষার জন্যই বিশেষ ব্যবস্থা করা আবশ্যক, কিন্তু তৎপরিবর্তে তাহাদিগকে তাহাদের প্রাপ্য অপেক্ষাও কম সদস্যপদ দিয়া অপর সম্প্রদায়কে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হইয়াছে। ইহাতে প্রকারান্তরে হিন্দুদিগকে হয়তো প্রশংসাই করা হইয়াছে, কিন্তু অদ্ভুত রাজনৈতিক গণিত শাস্ত্রানুযায়ী যে ব্যবস্থায় এক সম্পদায়কে চিরতরে অপর সম্প্রদায়ের সহযোগিতা নিরপেক্ষ করিয়া তুলিয়া উহাকে অপর সম্প্রদায়ের উপর পীড়নের অধিকার দিয়াছে, তাহা হিন্দুদের উপর প্রকাশ্যে আক্রমণ ব্যতীত আর কিছু নহে। ”

“মহাযুদ্ধের পরবর্তী এই অস্বস্তিকর আবহাওয়ার মধ্যে আমার জন্ম নহে, ভিক্টোরিয়া যুগের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও মানবতার প্রতি প্রগাঢ় নিষ্ঠার আবহাওয়ার মধ্যেই আমার শিক্ষা, সংস্কৃতি অর্জন। আজ আমরা পাশ্চাত্যের সর্বত্র অত্যাচার, উৎপীড়ন ও নিপীড়নের তান্ডব প্রত্যক্ষ করিতেছি – বিশ্বমানবের দুঃখকষ্টের প্রতি অন্যায় অবিচারের প্রতি পাশ্চাত্যের নিদারুণ উপেক্ষা প্রত্যক্ষ করিতেছি; তথাপি এখনো মানবতার আদর্শের প্রতি পাশ্চাত্যের মজ্জাগত আকর্ষণ বিষয়ে আমার মনে দৃঢ় আস্থা বিদ্যমান।”…স্থান কলকাতার বিশালাকায় টাউন হল, জুলাই ১৪, ১৯৩৬/আষাঢ় ৩০, ১৩৪৩; উপলক্ষ গুরুদেব রবীন্দ্রনাথের পৌরোহিত্যে হিন্দু সমাজের বিশাল প্রতিবাদ সমাবেশ তার উপর ক্রমবর্দ্ধমান ঐসলামিক লাঞ্ছনা, অত্যাচারের বিরুদ্ধে । ইতিমধ্যেই বঙ্গের হিন্দুর জীবিকা, দৈনন্দিন জীবনযাত্রা, মেধা, ধর্ম, সংস্কার, নারীর নিরাপত্তা প্রবলভাবে আক্রান্ত হতে শুরু করেছে।

সভায় উপস্তিত ভিন্ন ভিন্ন বরেণ্য ব্যক্তিত্বদের মধ্যে প্রমুখ হলেন বর্ধমানের রাজাধিরাজ, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, ডঃ নীলরতন সরকার, শ্রী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, শ্রীমতী সরলা দেবী চৌধুরাণী, শ্রী রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়, শ্রী তুষারকান্তি ঘোষ, শ্রী রাধাকুমুদ মুখোপাধ্যায় শ্রী হেমেন্দ্রপ্রসাদ ঘোষ, শ্রী পদ্মরাজ জৈন, শ্রী দেবেন্দ্রলাল খাঁ, শ্রী নির্ম্মল চন্দ্র চন্দ্র, শ্রী সনৎ কুমার রায়চৌধুরী । সমগ্র সমাবেশের ব্যবস্থাপক রূপে বন্দিত হয়েছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় । তখনও হিন্দু মহাসভায় তাঁর প্রবেশের তিন বছর বাকি, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিত্বকারী নির্বাচ্চিত নির্দল প্রতিনিধি রূপে বঙ্গীয় আইনসভায় তাঁর প্রবেশেরও এক বছর বাকি ।

কিন্তু স্বদেশ ও স্বজাতির নিত্য লাঞ্ছনা তাঁকে করেছিল সন্ত্রস্ত; বাঙ্গালী হিন্দু জাতির আসন্ন সর্বনাশের ডঙ্কা করেছিল তাঁর চোখ উন্মীলিত। ব্রিটিশ ও মুসলিম লীগের হিন্দু ধ্বংসের যৌথ প্রচেষ্টা ও প্ররোচনায় তার সকল প্রকাশ ঘটেছে তাঁর চিত্তে । এবং সেই চিত্তের প্রকৃত সন্ধান পেতে মনোযোগ দিতে হবে ভারতবর্ষ ব্যাপী ভিন্ন ভিন্ন বাঙ্গালী প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত প্রধান অতিথি রূপে তাঁর বক্তৃতারাশিতে ।….শিক্ষাব্রতী তিনি, কিন্তু হিন্দু বাঙ্গালীর অস্তিত্বসঙ্কটের যুদ্ধে তিনি উন্নত হলেন এক শ্রেষ্ঠ সংগঠকে ।

তাঁর যুদ্ধ তখন অন্দরে ও বাহিরে; আইনসভায় সরকারের বিরোধিতায়, ব্রিটিশের চক্রান্তের বিরুদ্ধে সমালোচনায় বাহিরে তিনি সুতীক্ষ্ণ ।

শার্দূলসম স্যার আশুতোষের মধ্যম পুত্রের কাছে এহেন তৎপরতা প্রত্যাশিত ছিল । স্যার প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের কথায়, বিশ্বববিদ্যালয়ের কর্মে ‘ তুমি বাপের বেটা হইয়াছ ‘ এবং পিতৃসম বিজ্ঞানাচার্যের তাঁর শ্রদ্ধার সম্পর্কের পূর্ণ প্রকাশ ঘটে ১৯৪০র বিশেষ লগ্নে – ‘ বেঙ্গল সেকেন্ডারী এডুকেশন বিল ‘ এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদের সঘোষে শ্যামাপ্রসাদের নেতৃত্বে, আচার্য সকাশে । ১৯৩৭র ফজলুল হক – মুসলিম লীগের ইসলামীকরণের এজেন্ডার প্রথম লক্ষ্য ছিল বঙ্গের শিক্ষাব্যবস্থা । বাংলা ভাষায়, সংস্কৃত-ভাষা জনিত মাত্রাতিরিক্ত হিন্দু প্রভাবে ক্রোধান্বিত ঐসলামিক শক্তি আইনসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে অবিভক্ত বাংলার ইসলামীকরণের লক্ষ্যে পাশ করিয়ে নিতে শুরু করেছিল হিন্দুদের প্রতি চরম বিদ্বেষমূলক একের পর এক আগ্রাসী আইন। তার একটি যদি হয় হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজধানী কলকাতার হিন্দুদের সর্বনাশকারী আইন – ক্যালকাটা মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন অ্যা মেন্ডমেন্ট অ্যা ক্ট, অপরটি অবশ্যই সেকেন্ডারী এডুকেশন বিল । সংস্কৃতের প্রভাবে হিন্দু-সংস্কৃতি প্রধান বাংলা ভাষাকে খর্ব করে ঊর্দূ জাতীয় ইসলামিক ভাষার গুরুত্ব বৃদ্ধি করতে গেলে প্রয়োজন মাধ্যমিক শিক্ষাক্রমের গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন অথবা তার এক ওজনদার বিকল্প । এহেন সরকারী তৎপরতার বিরুদ্ধে (প্রসঙ্গতঃ ১৯৪০-এর ২১শে অগাস্ট অবিভক্ত বাংলার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অ্যাসেম্বলীতে পেশ করেছিলেন ‘বেঙ্গল সেকেন্ডারী এডুকেশন বিল’) প্রতিবাদে গর্জে ওঠে ঐক্যবদ্ধ হিন্দু সমাজ । আইনসভার অভ্যন্তরে এই দুরূহ সংগ্রামে তাঁর সঙ্গী হলেন কংগ্রেসের শরৎচন্দ্র বসু, ডাঃ বিধান চন্দ্র রায়, নলিনী রঞ্জন সরকার, হেম চন্দ্র নস্কর, হরেন্দ্রনাথ রায়চৌধুরী, অতুল চন্দ্র সেন, প্রমথনাথ ব্যানার্জী, কিরণ শঙ্কর রায় প্রমুখ ।

শ্রদ্ধানন্দ পার্কের এক উপচে পড়া জনসভায় শ্যামাপ্রসাদ ঘোষণা করলেন এই সাম্প্রদায়িক বিল প্রত্যাহার করা না হলে তারা মধ্য শিক্ষা নিয়ন্ত্রণ আর পরিচালনার জন্যে পৃথক পর্ষদ স্থাপন করে হিন্দুদের জন্যে আলাদা শিক্ষা ব্যবস্থা প্রণয়ন করবেন। সেই সভা থেকে আর অন্য সভা থেকে একই ঘোষণা করলেন শ্রী শরৎ চন্দ্র বসু। এহেন উত্তাল সংগ্রামে সঙ্গী হলেন বিশ্ববরেণ্য বিজ্ঞানাচার্য স্যার প্রফুল্ল চন্দ্র রায়, ডাঃ নীলরতন সরকার, জাস্টিস স্যার মন্মথনাথ মুখোপাধ্যায়, বেদান্তরত্ন হীরেন্দ্রনাথ দত্ত, ডঃ মেঘনাদ সাহা, ডঃ সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণন, আচার্য্য স্যার যদুনাথ সরকার, ডঃ সুনীতি চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ বিদ্বজ্জনেরা । অসুস্থতার কারণে অনুপস্থিত রবীন্দ্রনাথের প্রতিবাদ পত্র ছড়িয়ে পড়ল প্রতিবাদী সমাজের প্রত্যেক স্তরে ।..দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আবহ, মুসলিম লীগের সাথে মতভেদ, ফজলুল হকের পদত্যাগ, সর্বোপরি দল-মত নির্বিশেষে হিন্দু সমাজের অনমনীয় ঐক্যের সম্মুখে স্তব্ধ হয় সেকেন্ডারী এডুকেশন বিলের আগ্রাসন ।

‘৪৩ র মন্বন্তর চলাকালীন প্রকৃত অবস্থা কেমন ছিল তা পাওয়া বিশিষ্ট ঐতিহাসিক ডঃ তপন রায়চৌধুরীর (শ্যামাপ্রসাদের সম্পূর্ণ বিপরীত মতাদর্শ দ্বারা প্রভাবিত) বিখ্যাত গ্রন্থ, “বাঙালনামা” তে। গ্রন্থানুযায়ী, “ইংরেজ সেক্রেটারি আর বেসরকারি ফোঁপরদালালদের পেজোমি অসহ্য হয়ে ওঠায় শ্যামাপ্রসাদ শেষ অবধি পদত্যাগ করেন। বাংলা ক্যাবিনেটের মিটিং যখন বসত তার এক কৌতুকজনক বিবরণ বিক্রমজিৎ আবিষ্কার করেছেন। এইসব মিটিংয়ে গভর্নর এবং সেক্রেটারিরা এমন ব্যবহার করতেন যে, মনে হত নির্বাচিত মন্ত্রীরা সেখানে উপস্থিত নেই। হক সাহেব উত্যক্ত হয়ে ছোট ছোট কাগজের টুকরোয় শ্যামাপ্রসাদকে বাংলায় নোট পাঠাতেন। শ্যামাপ্রসাদ তা পড়ে দলামোচড়া করে মেঝেয় ফেলে দিতেন। এইসব নোট ইংরাজের টিকটিকিরা সযত্নে সংগ্রহ করে অনুবাদ সহ হুজুরকে পেশ করতেন। একটি চিরকুটে লেখা ছিল, ‘সুভাষ আসতেছে। এগুলার পিঠের ছাল ছালাইয়া নেবে।’

ততদিন পর্যন্ত অপেক্ষা করার ধৈর্য শ্যামাপ্রসাদের ছিল না। উনি পদত্যাগ করে ব্যবস্থাপক সভায় যে-বক্তৃতা দেন তা শোনার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। পিসেমশায়ের সঙ্গে মাঝে মাঝে অ্যাসেম্বলি হলে বিতর্ক শুনতে যেতাম। সুরাবর্দি আর হক সাহেবের বাচনভঙ্গি বিশেষ ভালো লাগতো। কিন্তু তাঁর পদত্যাগের কারণ ব্যাখ্যা করে শ্যামাপ্রসাদবাবুর বক্তৃতার সঙ্গে তুলনা হয় এমন আর কোনও ভাষণ আমি কখনও শুনিনি। উনি ফজলুল হক সাহেবের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন যে, তাঁর সাথে কাজ করতে কখনও কোনও অসুবিধে হয়নি। কিন্তু আত্মসম্মান বজায় রেখে কারও পক্ষে গুটিকয় সেক্রেটারি আর তাদের স্যাঙাত কিছু বেসরকারি ইংরেজ ফোঁপরদালালদের সঙ্গে কাজ করা সম্ভব নয়। উনি নানা তথ্যপ্রমাণ দিয়ে দুর্ভিক্ষের জন্য এইসব লোকগুলির দায়িত্ব প্রমাণ করেন, আর কীভাবে তারা পদে পদে মন্ত্রীদের কাজে বাধা দিয়েছে তাও দেখান। এই বিশ্লেষণ অসহ্য বোধ হওয়ায় সভার এক মনোনীত ইংরেজ সভ্য চেঁচিয়ে ওঠে, “তুমি তোজোর কাছে যাও। সেই তোমার রক্ষাকর্তা। ” (Go to Tojo. He is your savior) শ্যামাপ্রসাদ উত্তর দিলেন, “দুশো বছর শাসনের পর এই যদি তোমাদের অবদান হয়, তবে তোজো আমাদের রক্ষাকর্তা কিনা জানি না, কিন্তু তোমরা যে নও, সে বিষয়ে আমার সন্দেহ নেই। (I do not know if Tojo is our savior, but if after two hundred years of British rule, this is what you have given us, I know for certain that you are not.)”

৪৬র কলকাতা মহাসমর, নোয়াখালীর হিন্দু গণহত্যার রক্তে আঁকা প্রত্যেক প্রচ্ছদপটের মধ্যে ঘনিয়ে এলো দেশভাগের মর্মন্তুদ অধ্যায় । প্রশ্ন তখন হিন্দু বাঙ্গালীর স্থায়িত্বের, দেশভাগই একমাত্র বাস্তব নিজস্ব ভাগ্য নির্ধারণের জন্য – এই নিদারুণ সত্য জানা সত্বেও শ্রী শরৎ বসু-সুরাবর্দি-আবুল হাশিমের ভারত ও পাকিস্তান হতে বহির্ভূত যৌথ, স্বাধীন বাংলার প্রস্তাবও হয়ে উঠছে এক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু ।

“এ রকম একটি সময়ে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় একটি মৌলিক প্রশ্ন তুললেন গান্ধীজির কাছে। সেটি হল – আর্দশের দিক দিয়ে ‘স্বাধীন সার্বভৌম বাংলা’ মেনে নেওয়া হল। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে ‘স্বাধীন সার্বভৌম বাংলা’ পাকিস্তানের অঙ্গপ্রদেশে পরিণত হতে চাইলে, তার বিরুদ্ধে কি রক্ষাকবচ আছে। শরৎ বসু প্রস্তাব দিলেন, সে – ক্ষেত্রে একটা সিদ্ধান্ত নিতে হলে আইনসভার দুই-তৃতীয়াংশের সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিধান থাকবে। গান্ধীজির মত ছিল – সার্বভৌম বাংলা পরে যদি পাকিস্তান অথবা ভারতবর্ষের সঙ্গে যুক্ত থাকতে চায়, তবে সে সিদ্ধান্ত গ্রাহ্য হবে কেবল সংখ্যালঘু হিন্দুদের দুই-তৃতীয়াংশ তা সমর্থন করলে। শ্যামাপ্রসাদ দাবি করলেন যে কয়েক মাস আগের কলকাতা ও নোয়াখালী দাঙ্গার পরিপ্রেক্ষিতে সমগ্র পরিস্থিতির বিচার করতে হবে। সুরাবর্দিকে ‘স্বাধীন সার্বভৌম বাংলা’ -র শাসনতান্ত্রিক কাঠামোতে এই লিখিত প্রতিশ্রুতি দিতে হবে যে, ‘স্বাধীন সার্বভৌম বাংলা’ কখনও কোনওভাবে পাকিস্তানের অঙ্গপ্রদেশে পরিণত হবেনা। গান্ধীজি সুরাবর্দির দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলেন, সুরাবর্দি এ ব্যাপারে মত দেবেন কি না। সুরাবর্দি সাহেব ওই প্রতিশ্রুতি দিতে তার অক্ষমতা জানালেন। বস্তুতপক্ষে, ‘স্বাধীন সার্বভৌম বাংলা কাহিনীর এখানেই সমাপ্তি। “

এ প্রসঙ্গে Gandhi : The Last Phase – এ প্যারেলাল বলেছেন – He (Suhrawardy) was playing for high tricks but lacked the courage or the will or perhaps the both to face up to Quaid-i-Azam who suffered no nonsense in the Moslem League camp and was trying to thread on a thin wire. And Sarat Bose and his friends, with more zeal than prudence, were permitting themselves unwillingly to be drawn into Saheed’s desperate gamble. (সূত্র : বঙ্গসংহার এবং – শ্রী সুখরঞ্জন সেনগুপ্ত।..পৃষ্ঠা – ৪৮)…

১৯৫৮ সালে, দক্ষিণ কলকাতার যুগানুশীলন সাহিত্য সঙ্ঘ দ্বারা প্রকাশিত শ্রী সুনীল গুহর ” স্বাধীনতার আবোল তাবোল ” অনুসারে – “শ্যামাপ্রসাদের মৃত্যুতে ভারতের কি ক্ষতি হয়েছে জানিনা; বোধহয় বিশেষ কিছুই নয়। ভারতীয় রাজনীতি আজকাল যেমন দেখছি তাতে মনে হয় শ্যামাপ্রসাদ কোন ছাড় চল্লিশ কোটি ভারতবাসী নিকেশ হয়ে এক জওহরলাল বেঁচে থাকলেই কৃতার্থ হয়ে যাবে। তবে আমাদের, মানে পাকিস্তানী হিন্দুদের মধ্যে যাঁরা ভারতে গেছেন বা যাবার প্রতীক্ষায় দিন গুনছেন, তাঁদের কাছে শ্যামাপ্রসাদের মৃত্যু এক অপূরণীয় ক্ষতি হিসাবেই দেখা দিয়েছে। দেশ স্বাধীন হবার পর থেকে পাকিস্তানী হিন্দুদের জন্য যতটুকু দরদ ভারত দেখিয়েছে তা ওই এক শ্যামাপ্রসাদের জন্যই। পাকিস্তানী হিন্দুদের নিশ্চয়ই ভারত বা শ্যামাপ্রসাদের দিকে তাকিয়ে থাকা উচিত নয়; তবুও ভিটেমাটি ছেড়ে যেতে যখন হচ্ছে তখন তাকিয়ে না থেকেই বা উপায় কি! আর ভারতের কংগ্রেসী সরকারের পক্ষে শ্যামাপ্রসাদের মৃত্যু তো লটারীতে টাকা পাওয়ার মতই এক লাভের কারণ হয়েছে। পার্লামেন্টে এবং বাইরে বিরোধিতা দুর্বল হয়েছে, উদ্বাস্তুদের নিয়ে ছিনিমিনি খেলবার অবাধ সুযোগ হয়েছে। আজ মাইগ্রেসন সার্টিফিকেট বন্ধ করে দিয়ে পূর্ববঙ্গ থেকে উদ্বাস্ত্ত আসা বন্ধ করে দিলেও বাধা দেবার কেউ নেই। জওহরলাল বা তাঁর সাগরেদরা চুপে চাপে হরির লুট দিয়েছিলেন কিনা তা অবশ্য জানা যায় নি, তবে স্বস্তির নিঃশ্বাস যে ছেড়েছিলেন তাতে কোন ভুল নেই। এক শ্যামাপ্রসাদ অতবড় খানদানী কংগ্রেসী সরকারকে যতখানি কাবু রাখতেন, সে এক অদ্ভুত ব্যাপার। পৃথিবীর অন্য কোন দেশে এ ধরণের নজির আছে কিনা, জানা নেই। এ ব্যাপারটি অবশ্য সম্ভব হ’ত এই জন্যেই যে ঐ কংগ্রেস এবং জওহরলালের খানদানী ব্যাপারটি ছিল একেবারেই ঝাঁপাবস্তু। তাই তাঁদের শায়েস্তা র্রাখতে এক শ্যামাপ্রসাদই ছিলেন যথেষ্ট। শ্যামাপ্রসাদের জনপ্রিয়তাই ছিল জওহরলালের জন অপ্রিয়তার মাপকাঠি।”

“অহিংস উপায়ে, শান্তিপূর্ণ উপায়ে, বিনা রক্তপাতে স্বাধীনতা আনা হবে। এই ভণ্ডামির ঢং দেখাতে গিয়ে ভারতের মাটিতে আজ পর্যন্ত যত রক্তপাত হল, যত লোককে ভিটেমাটি ছেড়ে রাস্তায় আসতে হল, যত মেয়েকে পতিতাবৃত্তি করে উদরপূর্তি করতে হল, তার তুলনা পৃথিবীর ইতিহাসে আর কতগুলো আছে জানিনা, মনে হয় বিগত দুটো মহাযুদ্ধ বাদে এতবড়ো ধ্বংস পৃথিবীতে আর আসেনি। মহাযুদ্ধ দুটোও একদিন শেষ হয়েছে, আবার নতুন করে পুনর্গঠিত হয়েছে দেশগুলো। কিন্তু ভণ্ডামি আর ক্লৈব্যতার ফলে ভারতে যে ধ্বংসের আবির্ভাব হয়েছে, তার শেষ তো আজও দেখা যাচ্ছে না। তবুও বলতে হবে গান্ধী মহাত্মা অহিংস এবং শান্তিপূর্ণ উপায়ে স্বাধীনতা এনে কি এক অপূর্ব চীজ পয়দা করেছেন। ক্ষমতা হাতে থাকলে কিনা প্রচার করা চলে।” –

ইতিহাস গড়তে প্রয়োজন বহু উপাদানের, শিক্ষা ও ইন্দ্রিয়নিগ্রহই শেষ কথা নয় – প্রয়োজন সর্বাগ্রে এক কুশলী মস্তিষ্কের যিনি একত্রে বাঁধতে সক্ষম সকল চিত্তকে। …..এক ঐতিহাসিক মাহেন্দ্রক্ষণে তার পরিচয় দিয়েছেন পরতে পরতে ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ।