শক্তিচর্চাশাশ্বত সনাতন

শক্তিচর্চা – প্রকৃত দেশপ্রেম, সমাজসেবা

“…..অসিধারণ বঞ্চিতানাম্ ভিক্ষা সদা সম্বলম,

অধীনতা চির জীবনম্,

অসিধারকঃ পরদাস্য মোচনকারী। ।….”   অসি অর্থাৎ তরবারি।……প্রাচীন হিন্দু শাস্ত্রে শক্তিচর্চা, শস্ত্রচর্চার মহিমার গুণকীর্তন করা হয়েছে অসংখ্যবার। শস্ত্র বিনা মনুষ্য সমাজ রক্ষা অসম্ভব, অতএব শাস্ত্রের যথার্থতা ও ন্যায়ের রক্ষার্থে অসিধারণ এক অতীব প্রয়োজনীয় সত্য – দেহচর্চার গুরুত্বও সমপরিমাণ ও এক অর্থে অসীম। সুস্থ, সবল দেহ বিনা ব্যক্তি তথা সমাজ তথা রাষ্ট্র সৃষ্টি ও রক্ষা করা যায় না। প্রাচীন মহাকাব্য রামায়ণ, মহাভারতেও তাই দৃষ্ট হয় ন্যায়ের রক্ষার্থে শস্ত্রধারণ মহাক্ষত্রিয়দের দ্বারা। প্রশ্ন – তা কি শুধু যোদ্ধাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না জনসাধারণের মধ্যেও প্রচলিত ছিল।  কথিত আছে সংস্কৃত শব্দ ‘অক্রবাট’ থেকেই আখড়া শব্দের উৎপত্তি। এবং মহামতি চাণক্যের আর এক নাম মল্লনাগ। বাঙ্গালীদের মধ্যে দেহচর্চার সংস্কৃতিও অতি প্রাচীন। স্বয়ং মহাপ্রভু চৈতন্যও ছিলেন মহাবলী, লাঠি ও অলাতচক্র চালনায় তাঁর পারদর্শিতা অসীম, পরমহংসদেব শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণও যৌবনে কুস্তি করেছেন; অপর বলী অবশ্যই রাজা রামমোহন, তলোয়ার ও গুপ্তি চালনায় তাঁর দক্ষতা ছিল ঈর্ষনীয়। ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে দেহচর্চার যে নব হিল্লোল দেখা গিয়েছিল বাঙ্গালীদের মধ্যে বিশেষত শ্রী নবগোপাল মিত্র, শ্রী প্রিয়নাথ বসুর নেতৃত্বে তার ছোঁয়া স্পর্শ করেছিল বাংলার সুদূর পল্লীকেও, যার ভিত্তিতেই গড়ে ওঠে পরবর্তীকালের অগ্নিযুগ।

এই সহস্র ব্যক্তিদের অন্যতম হলেন শ্রী নীরদ সরকার, যাঁর সম্পর্কে এই প্রবন্ধ।

যখনই নীরদ সরকারের নামটি উত্থাপন করি আমার আমার ব্যায়াম শিক্ষক প্রদীপবাবু হাতের ডাম্বেল নামিয়ে সোৎসাহে বলে ওঠেন, “ ৭০-এর দশকে আমরা তখন কলেজে পড়ি । ওনার ছবি দেওয়া বই নিয়ে সালকিয়ার বাড়িতে দেখা করতে গেছিলাম; সে কবেকার কথা! দেখা করেছি, শিখেছি, সুঠাম চেহারা, কাঁধ অবধি চুল, সাদা পাঞ্জাবী পাজামা, খুব সাদামাটা, স্টেজে বলতে উঠলে থামানো যেত না, ভয় পেতেন না। ব্যায়াম শিখেছি ওনার কাছে।। নীলমণি দাশকেও দেখেছিলাম অনেকবার।”….এমন অনাবিল স্মৃতি যাঁর সম্পর্কে এখনও অব্যাহত তাঁর সম্পর্কে কৌতূহল জাগা স্বাভাবিক তো বটেই। আজ থেকে ৪০ বছরেরও আগে তিনি প্রয়াত হয়েছেন; তবুও তাঁর সম্পর্কে গুঞ্জন শোনা যায় বঙ্গের ব্যায়াম মহলে। একইভাবে শুনতে পাই আমরা অমিততেজা শ্রী পিকে গুপ্ত, শ্রী কমল ভান্ডারী সম্পর্কেও। প্রশ্ন ওঠে তখনই – আজকের সর্বাবস্থায় ও প্রত্যেকরূপেই দুর্বল বাঙ্গালী কি এঁদের কথা শুনে, রোমাঞ্চিত হয়ে অমোঘ শক্তিচর্চার আলোকে ফিরবে?

এতবড় মাপের সুশিক্ষিত ক্রীড়াবিদ আজও কী রয়েছেন বাঙ্গালীদের মধ্যে? উত্তরঃ না। নেই। তবে, অবশ্যই ছিলেন, দুজন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম অবশ্যই মেজর পিকে গুপ্ত, ও অপরজন অবশ্যই শ্রী কমল ভাণ্ডারী। কে কমল ভাণ্ডারী? সংক্ষেপে, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনস্তত্ত্ব বিভাগে ফার্স্ট ক্লাশ ফার্স্ট এবং ছ’বারের ভারতশ্রী তথা কলকাতা পুলিশের প্রাক্তন আসিসট্যাণ্ট কমিশনার। দেহচর্চা ছাড়াও জীবনের প্রায় অন্যান্য প্রতিটি বিভাগে এঁদের করায়ত্ত ছিল অতুলনীয় দক্ষতা।এবং তার একমাত্র কারণ অনন্ত সাধনার মনোবৃত্তি, সুনিবিড় অখন্ড অধ্যাবসায়,জ্ঞানের চর্চার।

নীরদবাবু এই বিরল গোষ্ঠীরই এক অন্যতম সদস্য। আদি নিবাস বর্তমানে বাংলাদশে অবস্থিত ঢাকা জেলার মানিকগঞ্জ মহকুমার কো গ্রামের ডঃ মঙ্গলচন্দ্র সরকারের কনিষ্ঠ পুত্র। বাল্যকাল থেকেই নীরদ ছিলেন অত্যন্ত দুর্বল, নানাবিধ রোগে আক্রান্ত। গ্রামের বিদ্যালয়ে পাঠ শেষ হলে তিনি ভর্তি হন মানিকগঞ্জ স্কুলে কিন্তু তাঁর অত্যন্ত দুর্বল শরীর তথা কঙ্কালসার আকৃতি ও পেট সমগ্র স্কুলে তাঁকে এক কৌতুকের পাত্রে পরিণত করে। তাঁকে বহু ব্যাক্তি, বিশেষত শিক্ষকেরা পড়াশোনা শেষ করার পূর্বে স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটাতে পরামর্শ দেন। শিক্ষকদের পরামর্শ ও সহপাঠীদের তাঁর প্রতি অবজ্ঞা, নীরদের জীবনে আনে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। স্বাস্থ্যের উন্নতিকল্পে তিনি যোগ দেন স্থানীয় কালিবাড়ির ব্যায়ামাগারে। কিন্তু বাদ সাধলেন বয়োজ্যেষ্ঠরা। তাঁদের  মতে, খেলাধুলোয় বেশি মনোযোগ পড়াশুনায় ক্ষতি করবে। একপ্রকার, ব্যায়ামাগারে যাওয়ার উপরে এক অলিখিত নির্দেশ জারি হয়ে গেল।

দেহচর্চার আস্বাদন পেতে শুরু করেছেন নীরদ তখন, প্রত্যাশিতভাবেই তাঁর মন বিদ্রোহী হয়ে উঠলো এহেন নির্দেশের বিরুদ্ধে। তাঁর পক্ষে এসে দাঁড়ালেন সেজদা, মাতৃহারা ছোট ভাইয়ের উপর যাঁর স্নেহ, ভালোবাসা ছিল সীমাহীন। সংগোপনে শরীরচর্চায় উৎসাহ দেওয়া সেজদার বুদ্ধিতেই অবশেষে বের হল এক অভিনব উপায়। দিনের বেলায় ব্যায়ামাগারে চর্চা রুদ্ধ হওয়ায় সাহায্য নেওয়া হল রাত্রির অন্ধকারের। যখন সমগ্র শহর থাকতো নিদ্রায় অভিভূত, তখন তাঁর শ্রদ্ধেয় উকিল বড়দা, মক্কেলের কাজ শেষ করে ঘুমোতে যাওয়ার আগে ছোট ভাইয়ের ঘরে উঁকি দিয়ে তার সজোরে ঘুমের আওয়াজে নিশ্চিন্ত বোধ করতেন। অল্পক্ষণ পড়েই কপট নিদ্রা ত্যাগ করে, দরজায় শিকল টেনে ব্যায়ামাগারে নীরদ তাঁর দলের ছেলেদের নিয়ে ব্যায়াম সহ  লাঠি, ছোরা ও অসি চর্চা  নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়তেন। ভোর হওয়ার আগে নিঃশব্দে বাড়ি এসে সুবোধ বালকের মতো ঘুমিয়ে পড়তেন। দুঃখের বিষয়, এই অভিনব কৌশল চললো না বেশীদিন। একে বড়দার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এড়ানো দায়, অন্যদিকে রাত্রি ধরে ব্যায়াম, লাঠি ও অসি অভ্যাস নজরে এলো পুলিশের। অবস্থা গুরুতর হওয়ায় শেষ পর্যন্ত তাঁর বাবা এসে নীরদকে বোঝালেন, ভয় দেখালেন, তিরস্কারও করলেন কিন্তু লাভ হল না বিশেষ। ততদিনে নীরদ নামকরা শক্তিমান হয়ে উঠেছেন, বহু লাঠিয়াল তাঁর একনিষ্ঠ ভক্তে পরিণত হয়েছে। উপরন্তু সেটি স্বদেশী আন্দোলনের যুগ; গান্ধীজির আহ্বানে দলে দলে ছেলেরা বিদ্যা প্রতিষ্ঠান ত্যাগ করছে, বিদেশী দ্রব্য বর্জন, সংগ্রাম চলছে ও তার সাথে বিলাতী কাপড় পোড়ানোও।  ব্রিটিশ সরকারও নেই নিশ্চুপ; শুরু হয়েছে পুলিশের জুলুম, ব্যাপক ধর পাকড়।

দেশের ডাকে নীরদও ঝাঁপিয়ে পড়লেন; অশান্ত পুত্রকে ধরে নিয়ে আসার জন্য বাবা লোক পাঠালেও সময় থাকতেই গা ঢাকা দিলেন নীরদ।  যদিও অল্প কিছুদিনের মধ্যেই ধরা পড়ে তাঁর স্থায়ী নিবাস হল জেলের নির্জন কক্ষ। বাবা তাঁর রাজভক্তির জন্য খ্যাত ছিলেন ব্রিটিশের উচ্চ মহলে; তাই অল্প কিছুদিনের মধ্যেই মুক্তি হলেও শর্ত অনুযায়ী নীরদকে যেতে হল অন্যত্র। ঢাকা ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুলে ভর্তি হলেন; শিষ্যত্ব গ্রহণ করলেন বিখ্যাত ব্যায়ামবীর শ্রী রাজেন্দ্র গুহঠাকুরতা ও শস্ত্রাচার্য শ্রী পুলিন বিহারী দাসের।

নিশ্চয়ই, শ্রী পুলিন বিহারী দাস সম্পর্কে আর নতুন করে বলতে হবে না। তবে, সহজাত দুর্বল স্মৃতিসম্পন্ন বাঙ্গালীকে শ্রী রাজেন্দ্র গুহঠাকুরতা সম্পর্কে দু-চার কথা বলা প্রয়োজন। বলী শব্দের অর্থ বলশালী – রাজেন্দ্রবাবু গত সহস্রাব্দের শ্রেষ্ঠতম বাঙ্গালী বলীদের মধ্যে অন্যতম। তিনি প্রথম বাঙ্গালী যিনি আপন ছাতিতে হাতি তোলার স্পর্ধা দেখান ও ঐতিহাসিক সাফল্য লাভ করেন।  ওনার সম্পর্কে আমার পূর্ব প্রবন্ধ ‘বাঙ্গালীর শক্তিচর্চা – এক তপস্যা’ তে লিখেছি। এহেন গুরুর সাহচর্যে নীরদবাবুর পূর্ণ বিকাশ ঘটে। আলীপুর সেন্ট্রাল জেল থেকে ছাড়া পেয়ে নীরদবাবু তাঁর গুরুর আদেশে একটি ব্যায়ামাগার স্থাপন করেন। তাতে বহু দূর, স্থান থেকে বক্ত, শিষ্যরা এসে যোগ দেন; তিনিও বহু দেহচর্চার প্রতিষ্ঠানের সাথে সংযুক্ত হয়ে পড়েন। এই সময় তিনি ঢাকা শহরের সেন্ট গ্রেগরি স্কুল ও ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুলের ব্যায়াম শিক্ষকের পদ গ্রহণ করেন। এক দক্ষ নাবিকের মত রাজেন্দ্রবাবু তাঁকে পরিচালিত করতে থাকেন। তাঁর আগ্রহেই নীরদবাবু প্রবেশিকা পরীক্ষা দিতে বাধ্য হন একপ্রকার।

একদিন, তিনি চোখে পড়েন তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য তথা সুবিখ্যাত ঐতিহাসিক ডঃ রমেশ চন্দ্র মজুমদারের। শ্রীমান নীরদের পেশী শক্তি ও বিভিন্ন ক্রীড়া প্রদর্শনে মুগ্ধ হয়ে রমেশবাবু তাঁকে ‘আয়রনম্যান’ উপাধিতে ভূষিত করেন। এর মধ্যে অন্যতম ছিল বহু প্রকারের আসন, পিকক, আর্চ,বার্ড, পিরামিড, ভল্টিং রিং, টিথকয়েলিং বা দাঁত দিয়ে লোহা বাঁকানো, চোখ দিয়ে লোহা বাঁকানো ,ধারালো তলোয়ারের ওপর ঝাঁপ, বুকে পাথর ভাঙা, চুল দিয়ে ভার তোলা, মাথা দিয়ে ডাব ফাটানো ইত্যাদি। তাঁর সামর্থ্য ও নিষ্ঠার পরিচয় পেয়ে রাজেন্দ্রবাবুর অনুরোধে নীরদকে অনুশীলন সমিতির সভ্য করেন শস্ত্রাচার্য, চিরপ্রণম্য বিপ্লবী শ্রী পুলিন বিহারী দাস মহাশয়। কিছুদিন পরেই সমগ্র ভারতবর্ষ জুড়ে শুরু হয়ে যায় আগস্ট বিপ্লব বা ‘৪২-এর ভারত ছাড়ো আন্দোলন, যার তাপে গনগনে হয়ে ওঠে সমগ্র দেশ। দেশ, বস্তুতঃ নেতৃত্বহীন কংগ্রেস নেতৃবৃন্দের গ্রেফতারের পর। চতুর্দিকে এক নরমেধ যজ্ঞ চলছে। ভারতরবর্ষকে শিক্ষা দেওয়ার জন্যে কুচক্রী ব্রিটিশ  এক কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করে; অগণিত অসহায়, নিষ্পাপ নরনারীকে খাদ্য থেকে বঞ্চিত করে হত্যা করা হয়।

চতুর্দিকে অরাজকতার সুযোগে মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দ পাকিস্তান আদায়ের জন্য ঢাকা শহরে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ঘটাতে উদ্যত; ঢাকায় শুরু হল ভয়ঙ্কর দাঙ্গা। ঐসলামিক গুণ্ডামি, যথেচ্ছাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ালেন নীরদ, তাঁর বাহিনী ও সর্বশক্তি নিয়ে। কত যে হিন্দু-পরিবারের মান, সম্মান, জীবন নীরদের সাহায্যে রক্ষা পেয়েছিল তার কোন হিসাব নেই। হিন্দুর প্রতিরোধের মুখ ও রক্ষাকর্তা হয়ে উঠেছিলেন নীরদ সরকার।  তিনি শিক্ষা পেয়েছিলেন – “দুর্বলের ক্ষমা , দুর্বলের অহিংসা — মিথ্যা ছলনা বা আত্মপ্রতারণা মাত্র ।  যে ধর্ম – জাতিকে আত্মরক্ষা , সমাজরক্ষা ও মান সম্ভ্রম ইজ্জত রক্ষায় সাহায্য সহায়তা করতে পারে না , যে ধর্ম অন্যায় অপরাধের প্রতিকার প্রতিবিধানের শক্তি দেয় না – সে ধর্ম নয়, অধর্ম এবং অপধর্ম।” – শ্রীমৎ স্বামী প্রণবানন্দজীর  এই পরাক্রমী বাণী তাঁকে এক নতুন দিশার সন্ধান দেয়। নিপীড়িত মানুষের সেবায় ঝাঁপিয়ে পড়েন দেশত্মবোধে অভিভূত নীরদ।

এইপ্রকারের শক্তিধরকে যে ঢাকা ছাড়া না করতে পারলে নিস্তার নেই, হিন্দু নির্যাতন তথা পাকিস্তান তো দূর অস্ত; এই সত্য অনুধাবন করতে দেরি হয়নি মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দের। ইতিমধ্যে একদিন গ্রেগরি স্কুলে এক ইংরেজের মুখ ফাটিয়ে দিয়েছেন মেরে; সুযোগ এসে গেল পুলিশকে নীরদ ও তার সংগঠনের পেছনে লেলিয়ে দেওয়ার।  পুলিশের অত্যাচারে বাধ্য হয়ে নীরদের সহকর্মীরা নারায়ণগঞ্জে চলে আসেন। মানিকগঞ্জে একই সময়ে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ, সরকারি গুদাম ভর্তি চাল ও আটা সৈন্য পাহারায় রেখে দেওয়ার জন্য। এক লাফে চালের দর দু থেকে আড়াই টাকা সের হয়ে গেছে। ভাত দূরে থাক, একটু ফ্যানের জন্য, ছানার জলের জন্য মানিকগঞ্জ জুড়ে ক্ষুধার্ত মানুষের হাহাকার। পথে ঘাটে নিরাপরাধ মানুষের মৃতদেহ পরে রয়েছে। লঙ্গরখানায় একহাতা খিচুড়ির জন্য কঙ্কালসার নরনারীর মিছিল জনদরদী নীরদকে পাগল করে তুললো প্রায়। হিন্দু মহাসভার প্রখ্যাত নেতা, দরদী ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় সাহায্য পাঠান পার্টির পক্ষ থেকে। পূর্ববঙ্গের ঘরে ঘরে তা পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয় নীরদবাবুকেই। মানিকগঞ্জে ফিরে পদ নেন দেবেন্দ্র কলেজের ব্যায়াম শিক্ষকের।

নারীই হিন্দু সমাজের অহঙ্কার; তাই তাঁকে রক্ষা পেতে হবে সর্বাগ্রে সাম্প্রদায়িক লোলুপ ঈমানী গুন্ডাদের হাত থেকে। এইবার তাই তিনি মনোসংযোগ করলেন নারীদের সশস্ত্ররূপে শিক্ষিত করে তোলার জন্য। তাঁদের আত্মররক্ষার জন্য লাঠি, ছোরা, ও অসি চালনার শিক্ষা দিতে শুরু করেন। মুসলিম লীগের কুখ্যাত প্রত্যক্ষ সংগ্রামের ঢেউ সমগ্র কলকাতা মহানগরী ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলকে করেছে রক্তাক্ত; প্রতিরোধে পুরোদমে কাজ করে চলেছে নীরদবাবুর সংগঠন। নোয়াখালীর বিপর্যয়েও তিনি বহু হিন্দু পরিবারকে রক্ষা করেছেন। বঙ্গভঙ্গের পর তিনি সালকিয়া ( হাওড়ায়) নূতন করে ব্যায়ামাগার স্থাপন করলেন। অল্পকালের মধ্যেই তাঁর খ্যাতি চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে, আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা ব্যায়াম ও যোগব্যায়ামের শিক্ষা পেয়ে অশেষ উপকৃত হয়েছেন।

তাঁর ব্যায়ামের ধারা অব্যাহত রেখেছেন তাঁর পুত্র শ্রী পুরন্দর সরকার। বিশ্বখ্যাত ব্যায়ামবীর Eugen Sandow কলকাতা এলে নীরদবাবুকে একটি বারবেল দিয়েছিলেন যা এখনো রক্ষিত আছে তাঁর ব্যায়ামাগারে। যদি কোন সৌভাগ্যবান ব্যক্তি সন্ধান পান ও পড়েন তাঁর লেখা চারটি গ্রন্থ ‘ শরীর ও শক্তি’, ‘সরল যোগব্যায়াম’, ‘নীরোগ দেহে দীর্ঘজীবন’ ও ‘যোগ ব্যায়ামেমেয়েদের স্বাস্থ্য ও সৌন্দর্য’ তিনি অনুভব করবেন অবশ্যই ডিসিপ্লিন, কঠোর শ্রম ও মনীষার অর্থ কি।   শুধুমাত্র ব্যায়াম, শক্তিচর্চার প্রতি আদর্শগতভাবে আত্মসমর্পনের জন্য হেলায় ফিরিয়ে দিয়েছেন বহু লোভনীয় চাকরির সুযোগ। স্বামী বিবেকানন্দের ‘ সত্যের জন্য সবকিছু ত্যাগ করা যায়’ এই ভাবাদর্শের প্রতি তাঁর ছিল অকুন্ঠ আস্থা ও বিশ্বাস।

ক্রমে তিনি হাওড়া জেলা ফেডারেশন অব এসোসিয়েশনের ব্যায়াম-সচিব নিযুক্ত হন। প্রধানত তাঁরই উৎসাহে ‘দেহ ও মন’ নামক একটি ব্যায়াম-সংক্রান্ত পত্রিকাও প্রকাশিত হয়। ‘Health and Strength’ পত্রিকা তো বটেই দৈনিক যুগান্তর, আনন্দবাজার অমৃরবাজার পত্রিকায় তাঁকে নিয়ে লেখা হত।এবং তিনিও কলম ধরতেন ব্যায়ামের প্রসারে, বাঙ্গালীকে শক্তিশালী করে তোলার অভিপ্রায়ে। বেতারেও ব্যায়াম শিক্ষার ক্লাস নিতেন।।

নীরদবাবুর জীবনের ধ্রুবসত্য যা বিশদ হয়েছে দশকের পর দশক ধরে তা তাঁর নিজের বক্তব্য দিয়েই শেষ করি –   ‘ব্যায়াম করে এমন শরীর গড়তে হবে, যে শরীর প্রয়ােজনবােধে সর্ব কর্মে নিয়ােজিত করা যাবে ও দীর্ঘদিন কর্মতৎপর থাকবে । ব্যায়াম করে যেন শুধু আয়েশি সুন্দর পেশীযুক্ত শরীর না হয়। শরীরচর্চা করে সাধারণ লোকের চেয়ে যদি অনেক বেশি কষ্টসহিষ্ণু না হওয়া যায়, তাহলে কেনই বা শরীরচর্চা, কেনই বা স্বাস্থ্য-সাধনা। জগতে সুখে দিন কাটাতে হলে, বিদ্যা অর্জন করতে হলে, মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হলে চাই স্বাস্থ্য ও মনের বল। সেই স্বাস্থ্য পেতে হলে করতে হবে নিয়মিত ব্যায়াম। ইহার সঙ্গে মনের দৃঢ়তা, প্রবল ইচ্ছা ও প্রফুল্লতা বিশেষ প্রয়ােজন। প্রবল ইচ্ছাশক্তিই সর্বপ্রকার উন্নতির সহায়ক। দেহ ভালাে রাখিতে হইলে মনকে ভালাে রাখিতে হয়। মনের সংযম ও পবিত্রতা নীরােগ ও সুস্থতার পরম বন্ধু। মনের তেজস্বিতা, মনােবল ও প্রফুল্লতা অভ্যাস দ্বারা বাড়াইতে হয়। ব্যায়াম করিলে যেমন দিন দিন শক্তি ও পেশি বর্ধিত হয় তেমনি অভ্যাস দ্বারাও মনের বল, প্রফুল্লতা বৃদ্ধি করা যায়। সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হইয়া দীর্ঘ জীবন লাভ করিতে হইলে নিয়মিত ব্যায়াম, পরিমিত আহার,  যৌগিক নিয়মাদি যেমন একমাত্র সহায়, তেমনই মনােবল, প্রফুল্লতা, মনের পবিত্রতা, মানসিক ও নৈতিক উন্নতির শ্রেষ্ঠ সহায়ক। ইহা ছাড়া আর একটি বিষয় আছে, যাহাকে বলা হয় আত্মসংযম। মনের অভ্যাস দ্বারাই আত্মসংযম বৃদ্ধি পায়। শুধু দেহ সুস্থ থাকিলে মন সুস্থ থাকে, সেই মনকে চর্চা দ্বারা ইচ্ছামতাে গড়িয়া তােলা যায়। মনকে অভ্যাস ও চর্চা দ্বারা গড়িয়া তুলিলে সংযম ও ব্রহ্মচর্যরক্ষায় বিশেষ বেগ পাইতে হয় না, দেহকেও সুস্থভাবে অনেক দিন বাঁচাইয়া রাখিয়া কাজে লাগানাে যায়। মনের দৃঢ়তা ও একাগ্রতা থাকিলে ইস্পাতের মতাে স্নায়ু, লােহার মতাে পেশি গড়িয়া তােলা যায় এবং এইরূপ দেহে বজ্রের মতাে মনও তৈরি হইতে পারে। কিন্তু রােগা দুর্বল দেহীর মন বজ্রের মতাে হওয়া সুকঠিন।

✡️দৈহিক বল অর্জন করিতে হইলে মনকে সতেজ করিতে হয়। হিংসা,দ্বেষ, পরশ্রীকাতরতা, ঈর্ষা মন হইতে দূর করিয়া নিজেকে দেশ ও দশের সেবক জ্ঞান করিয়া মহৎ কাজের জন্য একনিষ্ঠ হইয়া শক্তির সাধনা করাই শ্রেয়। ইহাতে শক্তি অর্জিত হয়। মন উদার ও সুন্দর না হইলে শরীরও সুন্দর হয় না, শক্তি তেমনভাবে অর্জিত হয় না; আর অর্জিত হইলেও বেশি দিন তাহা টিকে না, মহৎ কাজের উদ্দেশ্যে সাধনাই সিদ্ধিলাভের পথ।’

প্রণাম। বাঙ্গালী কি কোনদিন এর মর্মার্থ অনুভব করে পুনরায় এই পথে ব্রতী হবে?

 

তথ্যসূত্রঃ

অমৃতবাজার পত্রিকা – ১৯৫৬, আনন্দবাজার – ১৯৩৬,৩৭,৫০,৬৩,

দৈনিক যুগান্তর, লোকসেবক, East India Times

ব্যায়ামচর্চা পত্রিকা – ১৯৮৪

নীরদবাবুর সুপুত্র শ্রী পুরন্দর সরকার নানা নথি দিয়ে সাহায্য করেছেন..

 

পুরন্দরবাবুর সাথে লেখক,নীরদ সরকার মেমোরিয়াল জিমে

Leave a Reply