বামপন্থারাজনীতি

পৃথিবী বদলে যাবে – ১

(সিপিআই (এম এল) – এর প্রতিষ্ঠাতা চারু মজুমদারের মৃত্যুর পঁচিশ বছর পর নতুন পরিস্থিতিতে তাঁর পুনর্মূল্যায়নের প্রয়াস করেন শ্রী শৈবাল মিত্র – প্রকাশিত হয়েছিল ‘আজকাল’ পত্রিকায়, ১৮ই জানুয়ারি, ১৯৯৮। প্রসঙ্গত, শ্রী মিত্র নিজেও নকশালবাড়ি আন্দোলনের এক অত্যন্ত সক্রিয় কর্মী ছিলেন, পরবর্তীকালে সাহিত্যিক রূপেও সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য বৃষ্টির মধ্যে রয়েছে – ‘ঘুমভাঙানি’, ‘অগ্নির উপাখ্যান’, ‘ভুলভুলাইয়া’, ‘নন্দনবাসিনী’, ‘জেগে আছে একজন’, ‘পাপশাস্ত্র’, ‘গোরা’, ‘অবশেষে প্রধানমন্ত্রী হলুম’, ‘পাঁচটি বজ্রনির্ঘোষের উপন্যাস’ ‘অজ্ঞাতবাস’, ‘অগ্রবাহিনী’ ইত্যাদি উপন্যাসগুলি।)

মহামতি লেনিনকে উদ্ধৃত করে ত্রিশ বছর আগে চারু মজুমদার যখন বলেছিলেন, ‘পার্লামেন্ট শুয়োরের খোঁয়াড়’, দেশের বেশিরভাগ মানুষ সে কথা বিশ্বাস করেনি। ১৯৬৮ সালে অজয় মুখার্জির নেতৃত্বে দ্বিতীয় যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা ক্ষমতাসীন হওয়ার পরে লেনিনকে উদ্ধৃত করে চারু মজুমদার যখন বললেন, ‘সংসদীয় পথে নির্বাচিত মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়ে সমাজতন্ত্রী এবং বামপন্থীরা জনকল্যাণমূলক কোনও কাজ করতে পারে না,, বরং পুঁজিবাদী ব্যবস্থা সম্পর্কে মোহ সৃষ্টি করে, এবং সেই রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে জনসাধারণের ঘৃণা থেকে আড়াল করে রাখে’, তখনও সে কথা দেশবাসী গ্রহণ করেনি। নির্বাচন তাই আজও হচ্ছে। সংসদীয় ব্যবস্থা আগের মতই বহাল আছে। সংসদীয় গণতন্ত্রে মানুষ যে অবস্থা হারায়নি, নির্বাচনে মানুষের অংশগ্রহণ থেকে তা প্রমাণ হয়। কিন্তু নির্বাচনে অংশ নেওয়া থেকে এমন প্রমাণ হয় না যে, সকলের এই ব্যবস্থাতে সমান আস্থা আছে। আস্থা আর অবিশ্বাস, দুটি পাশাপাশি আছে। লেনিনেরও ছিল। সংসদকে শুয়োরের খোঁয়াড় বলেও জারশাসিত রাশিয়ান সংসদ, ডুমা নির্বাচনে তিনি অংশ নিয়েছিলেন।

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সংসদের জনকল্যাণমূলক ভূমিকা না থাকলে, সদলে লেনিন সংসদে ঢুকতেন না। কল্যাণকর ভূমিকার পাশাপাশি সংসদীয় গণতন্ত্রে দুর্নীতি, কেলেঙ্কারি করার সুযোগ কম নেই। সংসদীয় গণতন্ত্র মন্থন করে তখন পাঁক, কাদা উঠতে থাকে। সংসদকে কর্দমাক্ত, পিচ্ছিল করে শূকররা মুনাফা লোটে। সংদদকে তখন শুয়োরের খোঁয়াড় মনে হয়। শূকরদের উৎপাতে গণতন্ত্রের সেরা মঞ্চটি সাময়িকভাবে কলুষিত হয়ে ওঠে। ‘শুয়োরের খোঁয়াড়’ শদ্বটি আলঙ্কারিক। সংসদ সম্পর্কে শেষ কথা নয়। শেষ কথা কেউ বলতে পারে না। লেনিনও না। লেনিন, চারু মজুমদার – কেউ-ই বলতে চাননি। ‘সত্তর দশক মুক্তির দশক’ করার কথা চারু মজুমদার যখন বলেছিলেন, তখনও তা ছিল আপেক্ষিক। তাঁর কাঙ্খিত ‘মুক্তি’ সত্তর দশকের মাঝামাঝি একটু অন্যভাবে ঘটেছিল।

ত্রিশ বছর ধরে চালু একদলীয় স্বৈরতান্ত্রিক শাসন ভেঙে পড়েছিল ১৯৭৭-এ। জরুরী অবস্থার অবসানে ভারতবাসী হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছিল। হারানো বাক-স্বাধীনতা, চিন্তার স্বাধীনতা, রাজনৈতিক স্বাধীনতা ফিরে পাওয়াকে ‘মুক্তি’ ছাড়া আর কি বলা যেতে পারে?

সত্তর দশকে রাজনৈতিক মুক্তির আবহ তৈরী না হলে পশ্চিমবঙ্গে কুড়ি বছর ধরে বামফ্রন্ট ক্ষমতাসীন অবস্থায় থাকতে পারত না। ‘মুক্তির দশক’ শব্দটি নিয়ে যারা এখন হাসাহাসি করেন, বিষয়টা তাঁদের একটু খতিয়ে ভেবে দেখতে অনুরোধ করি। ১৯৭৭-এ ইন্দিরা গান্ধী সরকারের পতনের পরে মুক্তির যে-উপকরণগুলো দেশবাসীর কাছে পৌঁছেছিল, নির্বাচন বয়কট স্লোগানের সূত্রে সেফুল আগেভাগে সংগৃহীত হয়েছিল। নকশালবাড়ি কৃষক অভ্যুত্থান, নকশালপন্থীদের ব্যাপক আত্মদান ছাড়া বামফ্রন্ট ক্ষমতায় আসত না। রাজনৈতিক বৃত্তে যথেষ্ট গুরুত্ব আর যথাযোগ্য সম্মান পেত না তরুণ প্রজন্ম।

ভূমিসংস্কার, অপারেশন বর্গা এবং এরকম কর্মসূচি এখনও পর্যন্ত অঘোষিত থেকে যেত। তবে কর্মসূচি ঘোষণা আর হাতে-কলমে প্রয়োগের মধ্যে তফাৎ আছে। তফাৎ যত চোখে পড়ে, গোলমাল বাড়তে থাকে। পরীক্ষায় ফেল করা ছাত্র মন দিয়ে লেখাপড়া না করে লেখার কলমটা ভেঙে ফেলে। সাংসদ, বিধায়ক এমনকি মন্ত্রীদের নামোল্লেখ করে মানুষ যে মন্তব্য করছে, তা মোটেই প্রশংসাসূচক নয়। মন্তব্যগুলো শুনে মনে হয়, ত্রিশ বছর আগে চারু মজুমদারের উচ্চারিত কথাগুলো সামান্য রদবদল করে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।

সংসদীয় গণতন্ত্র সম্পর্কে যারা বিরূপ মত প্রকাশ করছে, তাদের বড় অংশ আবার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে। ভোটকেন্দ্রে লাইন দিয়ে ভোট দিচ্ছে। প্রশ্ন হল, কোনটা সত্যি? সংসদীয় ব্যবস্থা সম্পর্কে বিরূপতা, না ভোট দেওয়া? সংসদীয় পথের অনুগামীরা বলবেন, ভোটে অংশগ্রহণের ঘটনাই সত্যি। বিরুদ্ধ পক্ষ উল্টো কথা বলবেন। চারু মজুমদার বেঁচে থাকলে কি করতেন? ১৯৬৮ সালে যিনি নির্বাচন বয়কটের ডাক দিয়েছিলেন, আজও কি তিনি তাই করতেন? বলা মুশকিল। তবে সংসদীয় গণতন্ত্র যত সঙ্কটাপন্ন হচ্ছে, তত বেশি করে শোনা যাচ্ছে চারু মজুমদারের নাম। সত্তর দশককে স্মরণ করে প্রবীণ আর মাঝবয়সীরা পরিচিতদের মধ্যে বসে চাপা গলায় বলছে, চারু মুজমদারের মত একজন নেতা এখন দরকার। চারু মজুমদার বেঁচে থাকলে দেশে এ-দশা হতো না। কথাগুলোর গুরুত্ব কম-বেশি যাই হোক, যত অল্প লোকে বলুক, মজুমদারের মৃত্যুর পঁচিশ বছর পরেও কিছু মানুষ যে তাঁকে ভোলেনি, তার তাৎপর্য কম নয়।

গত পঁচিশ বছরে পশ্চিম বাংলায় অনেক উল্লেখযোগ্য রাজনীতিবিদের মৃত্যু হয়েছে। রাজ্যের তিন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল ঘোষ, প্রফুল্ল সেন, অজয় মুখোপাধ্যায় মারা গেছেন। তাঁরা ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী। প্রফুল্ল সেনের ঘনিষ্ঠ কিছু অনুগামী এখনও তাঁর জন্মদিবস পালন করলেও প্রফুল্ল ঘোষ, অজয় মুখোপাধ্যায়ের জন্য সেরকম কোনও অনুষ্ঠান হয় কিনা জানা নেই। মার্কসবাদী কম্যুনিস্ট পার্টির নেতা মুজফ্ফর আহমেদ, প্রমোদ দাশগুপ্তের স্মরণে দলীয় অনুষ্ঠান হয়। চট্টগ্রাম যুববিদ্রোহের দুই নেতা অনন্ত সিংহ, গণেশ ঘোষকে নিয়ে সংবাদপত্রে প্রকাশিত কোনও স্মরণসভার খবর বছরে একবারও পড়ে না। এস ইউ সি আই নেতা শিবদাস ঘোষের জন্মবার্ষিকী দলীয়ভাবে উদযাপিত হয়। চারু মজুমদারের প্রতিষ্ঠিত দল সিপিআই (এমএল) আপাতত বহুবিভক্ত হলেও, ২৮শে জুলাই নেতার মৃত্যুদিন প্রায় সব গোষ্ঠী থেকে অনুষ্ঠিত হয়। নদীয়া জেলায় বনধ পালিত হয়. চারু মজুমদারকে স্মরণ করে তাঁরা অকালমৃত এক স্বপ্নের স্মৃতিতর্পণ করে।

(ছবি: চারু মজুমদার )

(ক্রমশঃ)

Leave a Reply