সংস্কৃতি

পটুয়াদের গ্রাম

-শ্রী সুমিত্র বন্দ্যোপাধ্যায়

পটচিত্র। দু’চার কথায় এই শব্দের সংজ্ঞা দেওয়া আমার পক্ষে বেশ মুশকিল। এক কথায় সম্ভব নয়। কারণ পট সম্পর্কে খোঁজ-খবর করতে গিয়ে দেখেছি, বীরভূমের পটের সঙ্গে মেদিনীপুরের পটের বিস্তর ফারাক। আবার এদের সঙ্গে কালীঘাটের পটের কোনও সম্পর্ক নেই। পটশিল্পীদের ধর্মের ব্যাপারে ঢুকলে তখনও দেখা যাবে, বিষয়টি বেশ অন্যরকম। সব পটের কথায় না গিয়ে পশ্চিম মেদিনীপুরের নয়ার পট দেখা যাক।

পিংলার কাছে এই গ্রামে বেশ কয়েক ঘর চিত্রকরের বাস। বড়রাস্তা থেকে যে পথ গ্রামের দিকে ঢুকে গেছে, সেই পথের দু’পাশে তাঁরা থাকেন। অধিকাংশ বাড়ির বাইরে একই দৃশ্য। কোথাও কাঠের জ্বালে রান্না চলছে। আর তার থেকে হাতখানেক দূরে দাওয়ায় বা নিকানো উঠোনে বসে আপন মনে পট এঁকে চলেছেন কোনও চিত্রকর।

পট যাঁরা আঁকেন তাঁরাই চিত্রকর। সকলের পদবীই চিত্রকর। বয়স বা অভিজ্ঞতা দিয়ে তাঁদের দক্ষতা মাপা যায় না। স্কুলে হয়তো ক্লাস থ্রি কি বড়জোর ক্লাস ফোরে পড়ে। কিন্তু পট আঁকায় এরই মধ্যে বেশ দড় হয়ে উঠেছে অনেকেই। নবীন শিল্পীদের হাতের আঁকা বা কোনও কাজের সঙ্গে প্রবীণ শিল্পীদের কাজের পার্থক্য অন্তত আমার মতো সাধারণ লোকজন করতে পারবে না।

পট মানে কাপড়। এক সময় যে কাপড়ের উপরেই এইসব ছবি আঁকা হত তা নিয়ে দ্বিমত নেই। এখনও মূল ধারার পট কাগজে আঁকা হলেও, কাগজের যেদিকে ছবি আঁকা হয় তার উল্টো দিকে আঠা দিয়ে সেঁটে দেওয়া হয় কাপড়। ছবি হাতে ধরে দেখলে অন্তত কাপড়ের অনুভূতি হবে। আবার তা গুটিয়ে রাখতেও সুবিধা, ভাঁজ হয়ে যাওয়ার ভয় কম।

পিংলার শিল্পীরা আজকাল নানা রকম পট আঁকছেন। কালীঘাটের পটের আদলে আঁকা নানা ছবি এখানে পাওয়া যায়। স্থানীয় পটুয়ারাই তা আঁকেন। তবে পিংলার পটের নিজস্ব ধারা রয়েছে, তাদের প্রতিটি পটের একটি করে গল্প রয়েছে। সেই গল্পে বাঁধা গান রয়েছে। পট দেখিয়ে সেই গান শোনান পটুয়ারা। পুরনো গতে বাঁধা গান-গল্প রয়েছে। একই সঙ্গে সাম্প্রতিক ঘটনা নিয়েও চলছে ছবি আঁকা, গান বাঁধা। সুরের তেমন বৈচিত্র্য নেই, ছন্দও গতানুগতিক। ছন্দের পতন কোথাও কোথাও মিলিয়ে দেওয়া হয় সুরের ভাঁজে। তবে এই পট ও গানের মধ্যে নিজস্বতা রয়েছে।

গ্রামে বেশ নামডাক রয়েছে বাহাদুর চিত্রকরের। তাঁর বাড়িতে একটি জাদুঘর তৈরি করছেন, তাঁর কথামতো এখনও সেই কাজ সম্পূর্ণ হয়নি। এটিকে অবশ্য জাদুঘর না বলে সাজানো-গোছানো প্রদর্শশালা বলাই ভাল। সেখানে নানা আঙ্গিকে ও নানা ধরনের পট রয়েছে। কোনওটা বাঁধানো, কোনওটা গোটানো, বাঁধিয়ে নিতে হবে। জড়ানো পটও রয়েছে। বিক্রির জন্য। জাদুঘরের মধ্যে ছোট গ্রন্থাগার, সেখানে বেশ কিছু বই রয়েছে। গ্রন্থাগারের মাঝেই কাঠের তক্তপোশে অবিন্যস্ত বিছানা, খুঁট খোলা মশারি, অন্তত আমরা যেদিন গিয়েছিলাম সেদিন ছবি এমনই ছিল। গ্রন্থাগারে পটের উপরে লেখা কয়েকটি বই রয়েছে, পটচিত্রে অলঙ্করণ করা হয়েছে এমন বইও রয়েছে। তবে সংখ্যায় খুব একটা বেশি নয়।

মূল জাদুঘরের বাইরে আয়তাকার খোলা অংশ রয়েছে। চারদিক খোলা, মাথায় ছাউনি, কিছুটা দোচালার মতো। এই অংশের বাইরের দিকে বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত পট সংক্রান্ত খবর ফ্লেক্সে ছাপিয়ে সাজানো রয়েছে, পাকা রাস্তা থেকে তা দেখা যায়। এর পাশের পথ চলে গেছে জাদুঘরের পাশ দিয়ে পাড়ার মধ্যে। দোচালার ভিতরের অংশে বেশ বড় বড় কয়েকটি চাকা সাজানো। শহরের বড় পুজোর মণ্ডপসজ্জায় এসব দেখা যায়। আর একটা পালকি রয়েছে। আগে বিয়েতে এই পালকি ব্যবহার করা হত। এখন আর কাজে লাগে না। জাদুঘর তৈরি হয়ে গেলে তখন হয়তো পালকি অন্যতম আকর্ষণ হয়ে উঠবে। এখানে এখন বাচ্চারা খেলা করে।

রাস্তার এক দিকে রাস্তা থেকে কয়েক ফুট উঁচুতে এই চালাওয়ালা উঠোন, অপর দিকে যেন কারিগরের হাট। দোচালা-চারচালার ভিতরে সাজানো রয়েছে পট। কোথাও খোলা আকাশের নীচে, কোথাও চালার ভিতরে বসে পট আঁকা চলছে। কুটিরের পাশ দিয়ে পথ চলে গেছে গ্রামের ভিতরে। পথের ধারে কোনও বাড়ি পাকা হলেও অসম্পূর্ণ, কোনওটা এখনও মাটির, কোনওটা সম্পূর্ণ। অনেক বাড়ির বাইরের দেওয়ালের ক্যানভাসে আঁকা রয়েছে পট। কোনওটা সদ্য আঁকা, কোনওটা ঔজ্জ্বল্য হারিয়েছে সময়ের সঙ্গে। বিভিন্ন বাড়ির বাইরে উঠোনে বা দাওয়ায় পা ছড়িয়ে বসে তার উপরে ক্যানভাস রেখে পট আঁকছেন চিত্রকররা। কোথাও ঝুঁকে পড়েছেন পটের উপরে। আমরা কোনও বিশেষ দিনে যাইনি। তাই বর্ষা না হলে যেকোনও দিন এই দৃশ্য দেখা যাবে।

বাড়ির দাওয়ায় মাটির উনানে রান্না করাই যেন এখানে চল। তাতে কাঠের জ্বাল। বন-বাদাড় থেকে সংগ্রহ করা কাঠে রান্না হয় বছরভর। তবে বর্ষাকালে রান্না হয় গ্যাসের উনুনে। গ্যাসের দাম নয়, এখানে কাটে রানান করা কিছুটা ধারা হয়ে রয়ে গেছে। আমার গ্রামের বাড়ি হাওড়া জেলার উদয়নারায়ণপুরো, সেখানেও কাঠে রান্না হয়। সে কথা থাক, কেউ পট কিনুন বা না কিনুন, চাইলেই চিত্রকরদের থেকে গান শুনতে পারেন। ওঁরা গান শোনাতে ভালবাসেন।

পাকা রাস্তা থেকে একাধিক সমান্তরাল পথ ঢুকে গেছে পাড়ার মধ্যে। সব পাড়াতেই পটুয়াদের বাস। যে পটের জন্য নয়ার খ্যাতি, সেই পট আঁকতে এখনও প্রাকৃতিক রঙ ব্যবহার করা হয়। তবে ছবি আঁকার ক্যানভাস বদলে গেলে রঙের মাধ্যমও প্রয়োজন অনুযায়ী বদলে যায়। দোপাট্টা যে রঙে আঁকা হয়, সেই রঙে তো আর কেটলি রঙ করা যায় না।

চিত্রকরদের সমাজ, গান ও গল্প

চিত্রকরদের পাড়াটা বেশ চুপচাপ। যে যার মতো এঁকে চলেছেন। কেউ কেউ পট কেনার জন্য একটু জোর করেন, তবে বেশিরভাগই অপেক্ষা করেন, কতক্ষণে ক্রেতা এসে তাঁর কাজ দেখতে চাইবেন। কোনও একটা পাড়ার পথ ধরলে সঙ্গে সঙ্গেই কোনও না কোনও চিত্রকর খানিকটা যেচে আলাপ করবেন। নিয়ে যাবেন নিজের ঘরে। সেখানে আতিথ্যের ত্রুটি সাধারণত হয় না।

চিত্রকররা সকলেই মুসলমান। হিন্দুপাড়ায় তাঁরা হিন্দু নামে নিজেদের পরিচয় দিয়ে অভ্যস্ত। যেমন রুকসানা হয়ে যান রূপসোনা। তবে এই গ্রামের রূপসোনা চিত্রকর নিজেকে লক্ষ্মী নামে পরিচয় দেন। মুসলমান পাড়ায় যিনি গোলাপ, হিন্দুপাড়ায় হয়ে যান গোপাল। আসমান হয়ে যান আকাশ। মুসলমান হয়েও তাঁরা হিন্দু দেবদেবীর মাহাত্ম্য প্রচার করেন। অনেকে টুসুর গানও গান। এর নৃতাত্বিক কারণ রয়েছে। এই গ্রামে যাঁরা কয়েক শতাব্দী আগে ইসলাম ধর্ম দিয়েছেন তাঁরা আগে হয় হিন্দু ছিলেন, না হলে আদিবাসী ছিলেন। ধর্ম পরিবর্তন হয়েছে, উপাসনার পদ্ধতি পরিবর্তিত হয়েছে কিন্তু রোজগারের উপায় বদল না হওয়ায় তাঁরা গানে পরিবর্তন করতে পারেননি। হাসান-হোসেন ও ইসলামের সঙ্গে যোগ রয়েছে এমন পটের ছবি এঁকেছেন এবং পটের গানও বেঁধেছেন। তবে সেসবে শ্রোতা ও ক্রেতাদের আগ্রহ না থাকায় তাঁরা ঐতিহ্যের মূল স্রোতেই রয়ে গেছেন। তাই অনেক মুসলমান এঁদের কাফের বলে মনে করেন। আদলে এঁরা শিল্পী, ধর্ম-পরিচয় বদলতে সোজা কথায় যা বোঝায়, এঁদের সেই সংজ্ঞায় বেঁধে ফেলা মুশকিল।

দুই রকম নামের ব্যাখ্যা ওঁরা নিজেরাই দিলেন। একসময় জাতের বিচার ছিল যথেষ্ট। ধর্মের বিচার তো আরও মারাত্মক। মুসলমানরা হিন্দুদের উঠোনে এলে সেই জায়গা অনেকে গোবর-জল দিয়ে ধুতেন। এখান থেকে গঙ্গা নদী দূরে হওয়ায় গঙ্গার জল ছড়া দেওয়ার চল এখানে সেভাবে ছিল না। সময়ের সঙ্গে শুচিগ্রস্ততা গেছে ঠিকই, তবে একই ব্যক্তির দুই নামের রীতি এখনও রয়েছে। পরিচয় গোপন করার প্রয়োজন ফুরিয়েছে, তবে রীতি বজায় রয়েছে।

ইসলামে মূর্তিপুজো নিষিদ্ধ। এঁরা ব্যতিক্রমী, তবে প্রয়োজনে। এখানে হিন্দু দেবদেবীর মাহাত্ম্য প্রচার করে গান বাঁধেন তাঁরা, তা গেয়ে শোনান হিন্দুপাড়ায় ঘুরে ঘুরে। সেই গানে থাকে বেহুলা-লখিন্দর, সাবিত্রী-সত্যবান, জগন্নাথদেব এবং আরও নানা পৌরাণিক কাহিনি।

আগে মূলত গোটানো পট আঁকা হত। রোজগারের আরেক উপায় ছিল যমপট। এখন অবশ্য গানের কদর গ্রামে অনেক কমেছে। সংস্কার কমে যাওয়ায় কোনও মুসলমান পটুয়া হিন্দু বাড়ি থেকে যাওয়ার পরে যেমন গোবর-জল ছড়ানো হয় না, তেমনি যমপটের ভীতিও ফুরিয়েছে। এখন তাই গানের চেয়ে বেশি ভরসা পট বিক্রি। রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে, বিভিন্ন মেলায় গিয়ে তাঁরা পট বিক্রি করেন। শৌখিন পটের গল্প সকলে জানেন না, কিন্তু সেই শিল্প সাজাতে তো বাধা নেই। পটেও বৈচিত্র্য এসেছে।

পটের বৈচিত্র্যের কথা বলার আগে যমপট ও গোটানো পট সম্বন্ধে জেনে নেওয়া দরকার। প্রথমে যমপট।

এক সময় পটুয়াদের অর্থ উপার্জনের অন্যতম উপায় ছিল যমপট। কেউ মারা গেলে মৃত ব্যক্তির বাড়িতে পট নিয়ে গাইতে যেতেন পটুয়ারা। সেখানে জড়ানো পট খুলতে খুলতে মৃত ব্যক্তির নামে গান গাইতে থাকেন। শেষ অংশে মৃতের আদলে আঁকা এক ব্যক্তির ছবি দেখা যায়, তাঁর চোখ নেই। গান গেয়ে বলা হয়, টাকা দিলে তবেই সেই ব্যক্তির চোখ আঁকা হবে, মানে চক্ষুদান করা হবে। নইলে পরের জন্মে ওই ব্যক্তি অন্ধ হবেন। তারপরে দরাদরির পরে পটুয়াদের টাকা দিয়ে বিদায় করা হত। এখন যমপটের তেমন চল নেই।

গোটানো পটে পৌরাণিক গল্প থাকে। গানের মধ্যে গল্পে বলতে বলতে পটুয়ারা পট গোটাতে থাকেন। শ্রোতা-দর্শকের সামনে থাকে শুধুমাত্র সেইটুকু অংশ, যে অংশ নিয়ে শিল্পী গাইছেন। এই ধরনের পটে অনেক কাজ করতে হয় বলে এর দামও অনেক বেশি হয়।

পটুয়ারা নানারকম গান বাঁধেন। এইসব গানের সঙ্গে মিল রয়েছে টুসুর। গানের সঙ্গে একটা গল্পও থাকে। যেমন মাছের বিয়ে। গানের কথা পরিবার ভেদে সামান্য আলাদা হতে পারে। মূল ঘটনা একই। দাড়িয়া বা দারিয়া মাছের বিয়ে হচ্ছে। সব মাছ নানা রকম দায়িত্ব নিচ্ছে। বিয়েও হয়ে হল ভালভাবে। কিন্ত বরযাত্রীকে ফিরতে দেখে বিরাট বোয়ালমাছ তাদের গিলে খেতে এল। কারণ তাকে নিমন্ত্রণ করা হয়নি। সব মাছ এসে তাকে শান্ত করল। কনেযাত্রী হিসেবে তাকে বরের বাড়িতে নিমন্ত্রণ করা হল।

গানটা এইরকম

দারিয়ামাছের বিয়ে দিতে চলো গো রঙ্গিলা

ওই দারিয়ামাছের বিয়ে দিতে চলো গো রঙ্গিলা

রুই-কাতলা বলে আমি তোমার বিয়ের পালকি নয়ে যাব গো রঙ্গিলা

দারিয়ামাছের বিয়ে দিতে…

চাঁদামাছ বলে আমি

চাঁদামাছ বলে আমি কপালে সিঁথি হব লো রঙ্গিলা

দারিয়ামাছের বিয়ে দিতে…

প্যাঁকালমাছ বলে আমি

প্যাঁকালমাছ বলে আমি হাতের চুড়ি হব লো রঙ্গিলা

দারিয়ামাছের বিয়ে দিতে…

গাঙামাছ বলে আমি

গাঙামাছ বলে আমি পায়ের নূপুর হব লো রঙ্গিলা

দারিয়ামাছের বিয়ে দিতে…

পুঁটিমাছ বলে আমি

পুঁটিমাছ বলে আমি তোমার বিয়ের খাবার খাব লো রঙ্গিলা

দারিয়ামাছের বিয়ে দিতে…

রুই-কাতলা বলে আমি

রুই-কাতলা বলে আমি তোমার বিয়ের বাঁশি বাজিয়ে দেব লো রঙ্গিলা

দারিয়ামাছের বিয়ে দিতে…

কইমাছ বলে আমি

কইমাছ বলে আমি দইয়ের ভার লেব লো রঙ্গিলা

দারিয়ামাছের বিয়ে দিতে…

শোলমাছ বলে আমি

শোলমাছ বলে আমি মিষ্টির ভার লেব লো রঙ্গিলা

দারিয়ামাছের বিয়ে দিতে…

বোয়ালমাছ বলে আমি

বোয়ালমাছ বলে আমি সব ব্যাটারে খাব লো রঙ্গিলা

(গানের লিঙ্ক — https://fb.watch/brqMxGoO8D/)

পরিবারভেদে মাছের নাম ও ভূমিকা বদল হয়। আবার একই শিল্পী অন্য মাছের কথাও যোগ করে দেন। শিঙি, মাগুর এমনকি পদ্মার ইলিশের নামও আসে। কোনও গানে হারমোনিয়াম বাজানো, খাবার ও জল পরিবেশনের কথা বলা হয়। মাছের বিয়ে হয় জলে, সেখানে কেন জল পরিবেশন করা হবে, সে সব প্রশ্ন করলে আর গান-গল্প শোনা হবে না। গান-গল্পে দুটো বিষয় নির্দিষ্ট: বিয়ে হয় দারিয়ামাছের এবং বোয়ালমাছের নিমন্ত্রণ নেই।

পৃথিবীর সৃষ্টি নিয়েও গান রয়েছে যার সঙ্গে মিল রয়েছে আদম ও ইভের গল্পের এবং কিছুটা মিল রয়েছে মৎস্য অবতারের। এই গান-গল্পও পরিবারভেদে আলাদা হয়। মূল কথা হল ঈশ্বর দুজনকে পাঠিয়েছেন। সেখানে মিল রয়েছে আদম ও ইভের। পরে সব সৃষ্টিকে নৌকায় তোলা হচ্ছে প্রলয়ের সময়, অর্থাৎ মৎস্য অবতারের সঙ্গে মিল। যদিও এখানে মুখ্য চরিত্র জগন্নাথ-বলরাম-সুভদ্রা। শিল্পীদের গানে কখনও উঠে আসে পাখির বিয়ে, কখনও রামায়ণের সেতুবন্ধন, কখনও সাবিত্রী-সত্যবানের গল্প। কখনও অন্য কোনও পৌরাণিক গাথা। সাঁওতালদের কথাও আসে ঘুরেফিরে, কখনও মূল চরিত্র হয় পিচলু হারাম ও পিচলু বুড়ি। আসে শিকার উৎসবের কথা।

১৯৯২ সালে শুনেছিলাম রাজীব গান্ধী হত্যা নিয়ে গান বাঁধা। এখন তাঁরা গান বাঁধছেন করোনা নিয়ে।

করোনাভাইরাস নিয়ে গান শোনালেন রূপসোনা চিত্রকর।  গানের কথা এইরকম –

ভাইরাস থেকে হও গো সচেতন

ও জনগণ

ভাইরাস থেকে হও গো সচেতন

চিনের ইউহান শহর থেকে

ভাইরাস ছড়ায় বিশ্ব জুড়ে

মহামারির রূপ নিয়ে করোনাভাইরাস

ও জনগণ

ভাইরাস থেকে হও গো সচেতন

সাবানে হাত ধুলে পরে

ভাইরাস মুখে যাবে না রে

মুখে মাস্ক পরলে পরে

ছড়াবে না ভাইরাস

ও জনগণ

ভাইরাস থেকে হও গো সচেতন

জ্বর-সর্দি-কফ-কাশি হলে

স্বাস্থকেন্দ্র নিয়ে যাও তারে

ডাক্তারবাবুর কথা শোনো

এই তো আবেদন

ও জনগণ

ভাইরাস থেকে হও গো সচেতন

সকাল-বিকাল লকডাউন করিল

ভাইরাসের চেন ভাঙিল

কত মানুষের প্রাণ বাঁচাল

লকডাউনের কারণ

ও জনগণ

ভাইরাস থেকে হও গো সচেতন

পুলিশ ডাক্তার সাংবাদিকরা

প্রচার করছে সর্বই তারা

জীবন দিয়ে জনগণের

প্রাণ বাঁচাতে চায়

ও জনগণ

ভাইরাস থেকে হও গো সচেতন

(গানের লিঙ্ক – https://fb.watch/bJDDKJ12XX/)

কয়েক দশক আগেও গ্রামাঞ্চলে বাড়িতে বাড়িতে বিদ্যুৎ ছিল না। তাই টেলিভিশনও প্রায় ছিল না। শিক্ষার হার কম, রোজগারও কম ছিল বলে খবরের কাগজের চলও খুব কম ছিল। মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট তো হালে হয়েছে। তাই শেষ কয়েক দশক বাদ দিলে কয়েক শতাব্দী ধরে লোকশিল্প হিসাবে এইসব অঞ্চলের বিভিন্ন গ্রামে পটের গানই ছিল জনশিক্ষা প্রচার ও প্রসারের মাধ্যম। টিকাকরণ কর্মসূচির প্রচারেও পটের গান ও এই ধরনের লোকশিল্প ব্যবহার করা হত সরকারি তরফে।

বিষয় বদল হলেও ছবির ধারায় তেমন বদল নেই। নিজস্ব ঘরানার বাইরে গেলে ঐতিহ্য নষ্ট হবে, আবা চাহিদাও কমে যেতে পারে। সব মিলিয়ে পুরনো ধারা বদল হয়নি। তা সে ছবি আঁকার ধরন হোক বা গানের সুর, বলার ভঙ্গিমা।

শিল্পের মাধ্যম

পট মানে কাপড়। তার উপরে চড়ানো হত প্রাকৃতিক রঙ। সেই রঙ পাকা করতে ব্যবহার করা হত প্রাকৃতিক আঠা। সময়ের সঙ্গে সবই বদলেছে। এখন আঁকা হয় মূলত কাগজে, প্রাকৃতিক রঙ দিয়ে। যে দিকে ছবি থাকে তার অপর দিকে আঠা দিয়ে কাগজ সেঁটে দেওয়া হয়। এগুলিই মূল ধারার পট। রঙ হিসেবে ব্যবহার করা হয় কাঁচা হলুদ, লটকন (লাল), শিমপাতার রস (সবুজ), গাঁদাফুল (বাসন্তী, কমলা, লাল), ভুষোকালি (কাল), আতপচাল (সাদা)। রঙ করা হয়ে গেলে বেলের আঠা বা অন্য কোনও প্রাকৃতিক আঠা দিয়ে রঙ দিয়ে স্থায়ী করা হয়। এখন পোশাকেও পট আঁকা হচ্ছে। কুর্তা, ওড়না প্রভৃতিতে ফ্যাব্রিক রঙ ব্যবহার করা হয়। তেলরঙ দিয়ে আঁকা হয় ট্রে, কোস্টার, কেটলি প্রভৃতি। ঘর সাজানোর জন্য এসবের বাজার তৈরি হয়েছে। একসময় দেখেছি নারকেলের মালায় রঙ গুলে ছবি আঁকতে। এখন প্যালেটেই রঙ গোলা হয়।

ক্যানভাস

নয়ার পটচিত্রে ছবির ধারা একই রয়ে গেলেও সময়ের সঙ্গে বদলেছে ক্যানভাস। আগে পটের ছবি দেখিয়ে গান গেয়ে রোজগার করতে হত। এখন তা নয়। এখন পটের ছবি সংগ্রহ করেন লোকে, বাড়িতে টাঙাবেন বলে। তাই ছবি আঁকা বেড়েছে। সঙ্গে যোগ হয়েছে নানা ক্যানভাস, সেই সঙ্গে বদল হয়েছে রঙে। কাগজ ছেডে় তাঁরা টি-শার্ট ও কুর্তিতে ছবি আঁকতে শুরু করেন। যোগ হয় ওড়না। এ-সবের জন্য ফ্যাব্রিক রঙ ব্যবহার করেন। কাঠের শৌখিন পাত্র, কেটলি প্রভৃতিতে ছবি আঁকার জন্য ব্যবহার করেন তেলরঙ। বাঁশের ফুলদানি, কাচের পাত্র এসবও এখন তাঁদের কাছে ক্যানভাসের নামান্তর। অনেক ক্রেতার সাধ থাকলেও সাধ্য থাকে না, তাই তাঁদের জন্য পোস্টার রঙ ব্যবহার করেন, তাতে পটের দাম কম রাখা সম্ভব হয়। এই তালিকায় গ্রিটিংস কার্ড রয়েছে। দাম কম।

আধুনিক ক্যানভাসে যোগ হয়েছে বহু জিনিস। যেমন মালদহে মেলায় গেলে কুলো কিনে সেখানে ছবি আঁকেন, আবার পোড়ামাটির পাত্র কিনে সেখানেও ছবি আঁকেন। কুলো  বা এই ধরনের দ্বিমাত্রিক ক্ষেত্রে যেকোনও ছবি আঁকা চলতে পারে, কিন্তু কেটলি বা ওই ধরনের পাত্রে সাধারণত মাছ ও পাখির ছবিই তাঁরা আঁকেন। তাতে বোঝা যায় না কোথায় শুরু ও কোথায় শেষ হয়েছে এই ছবি। ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। ক্যানভাসের দামের সঙ্গে যোগ হয় শিল্পের দাম।

মোটামুটি ১০ টাকাতেও পট পাওয়া যায়, করোনা শুরুর আগে সেই দামে আমি নিজে ছোট কুলো কিনেছি। আর তেমন তেমন পটের দাম ১০-১৫ হাজার টাকাও হয়। পুরনো পট এখনও তাঁদের সংগ্রহে রয়েছে। সেসব অ্যান্টিক সংগ্রাহকদের জন্য।

পটের ছবি কিনে ফেরার সময় ঘরোয়া খাবার খাওয়ার অনুরোধ পেতে পারেন। নলকূপের ঠান্ডা জলে গলা ভিজিয়েও নিতে পারেন। তারপরে গ্রাম থেকে বেরিয়ে বাঁদিকে চলে গেলে বাসস্টপ। সেখানে রয়েছে মিষ্টির দোকান। বিখ্যাত নয় এইসব দোকান। চালার নীচে একটু জল-মিষ্টি খেয়ে নিতে বেশ ভালই লাগে।

 

(লেখক পরিচিতি – প্রাক্তন সাংবাদিক, বর্তমানে ভাষাতত্ত্ববিদ; ইতিহাস চর্চা ও মুদ্রা সংগ্রহ তাঁর জীবনের অন্যতম প্রধান অঙ্গ)

Leave a Reply