আমার ইতিহাসস্বভূমি ও সমকাল

বাঙালির শাশ্বত ক্ষাত্রবীর্যের ইতিহাস – ১ম ভাগ

 – সৌম্যদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

“মর্মে যবে মত্ত আশা, সর্পসম ফোঁসে;

অদৃষ্টের বন্ধনেতে, দাপিয়া বৃথা রোষে;

তখনো ভালোমানুষ সেজে, বাঁধানো হুঁকা যতনে মেজে;

মলিন তাস সজোরে ভেঁজে, খেলিতে হবে কষে!

অন্নপায়ী বঙ্গবাসী, স্তন্যপায়ী জীব;

জন-দশেকে জটলা করি, তক্তপোশে ব’সে।

ভদ্র মোরা, শান্ত বড়ো, পোষ-মানা এ প্রাণ;

বোতাম-আঁটা জামার নীচে, শান্তিতে শয়ান।

দেখা হলেই মিষ্ট অতি, মুখের ভাব শিষ্ট অতি;

অলস দেহ ক্লিষ্টগতি—গৃহের প্রতি টান।

তৈল-ঢালা স্নিগ্ধ তনু, নিদ্রারসে ভরা;

মাথায় ছোটো বহরে বড়ো

বাঙালি সন্তান।”

বাঙালি চরিত্রের এই মর্মচ্ছেদ করেছেন স্বয়ং কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

কিন্তু বাঙালি কী সত্যিই এরকম? চিরকাল কী বাঙালি এরকম ই ছিল? শাশ্বত ক্ষাত্রবীর্যের প্রকাশ কী কখনোই ঘটেনি বাঙালিদের মধ্যে? নাকি সেই ইতিহাস ভুলে গেছি আমরা? এরকম বহু প্রশ্ন আসে আমাদের মনে।

‌আজ বাঙালি বলতে ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের লোকেরা বোঝে অলস এবং পরনিন্দা পরচর্চা করা একদল লোক যারা দুর্বল এবং লড়াই করতে জানেনা, যারা নিজেদের স্বাধীনতা বারংবার বিসর্জন দিয়েছে ইন্দ্রিয়সুখের জন্য এবং যারা ধর্ম ও জাতি রক্ষায় কোনদিন যুদ্ধ করেনি।

 

⚫‌কিন্তু ইতিহাস অন্য কথা বলে:-

আজকের দিনে বাঙালি হয়তো কিছুটা আত্মবিস্মৃত, কিন্তু ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে বাঙালি বীরের জাত। মোগল, পাঠান, মগ, পর্তুগিজ, হাবসী, তুর্কি আর ইংরেজ দের নিজ বাহুবলে ও শস্ত্রের জোরে বারংবার পরাজিত করা জাতি হলো বাঙালি।

শস্ত্র ও শাস্ত্র চর্চা বাঙালির রক্তে আছে। বাংলার ইতিহাসে যত মহান বীর রাজন্য , যোদ্ধা  আছেন তাদের সকলের কথা বলতে গেলে শেষ হবেনা কখনো।

কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত র কথায়:-

“বাঘের সঙ্গে যুদ্ধ করিয়া আমরা বাঁচিয়া আছি,

আমরা হেলায় নাগেরে খেলাই, নাগেরি মাথায় নাচি।

আমাদের সেনা যুদ্ধ করেছে সজ্জিত চতুরঙ্গে,

দশাননজয়ী রামচন্দ্রের প্রপিতামহের সঙ্গে।

আমাদের ছেলে বিজয়সিংহ লঙ্কা করিয়া জয়

সিংহল নামে রেখে গেছে নিজ শৌর্যের পরিচয়।

একহাতে মোরা মগের রুখেছি, মোগলের আর হাতে,

চাঁদ-প্রতাপের হুকুমে হঠিতে হয়েছে দিল্লীনাথে।”

⚫‌বাঙালি শক্তিসাধকদের কথা আপনারা অনেকেই হয়তো পড়ে থাকবেন এই ওয়েবসাইটেই। আজ তাই বলবো সেই সমস্ত বীর বাঙালি এবং বাঙালি icon দের কথা যাদের জীবনে শক্তিচর্চা এবং শস্ত্রচর্চা ছিল এক অবিচ্ছেদ্য অংশ, আমাদের অতিপরিচিত যাদের উদাহরণ দিলে আপনারা সবাই উপলব্ধি করতে পারবেন যে বাঙালির মধ্যে শাশ্বত ক্ষাত্রবীর্যের চর্চা অতি প্রাচীন, বাঙালি ভীরু বা কাপুরুষ নয় বরং শস্ত্র ও শক্তি চর্চা করা এক বীর যোদ্ধা জাতি।

🛑বাঙালির ধর্মমত 🕉:-

কোন জাতির ইতিহাস চর্চা করতে গেলে তাদের ধর্মমত জানা অতি প্রয়োজন, কারণ ধর্মমত এর উপর ভিত্তি করেই গড়ে ওঠে সংস্কৃতি ও মানসিকতা।

বাঙালি বলতে আমরা শুধু বাঙালি হিন্দু কেই বুঝি একথা সম্পূর্ণ পরিষ্কার। আরবি মরুদস্যু দের অবৈধ বংশধর ও তাদের দালালি করা অর্ধেক উর্দু তে কথা বলা লোকেরা কখনোই বাঙালি হতে পারে না। বাঙালি মানে অবশ্যই সনাতন ধর্মাবলম্বী।

বাংলায় সনাতন ধর্মের সমস্ত দেবদেবীর ই পুজা হয় এবং বিভিন্ন লৌকিক দেবদেবী ও আছেন। কিন্তু বাংলায় প্রচলিত প্রধান তিনটি ধারা হল:- শাক্ত, শৈব এবং বৈষ্ণব ধারা।

বাংলায় সর্বাধিক প্রচলিত ধারা হল শাক্ত ধারা। প্রত্যেক পাড়ায় দুর্গাপূজা, কালীপূজা হয়ে থাকে এবং দুর্গাপূজা কে আমরা বাঙালির বৃহত্তম উৎসব বলি। এর শিকড় অতি প্রাচীন, গঙ্গাঋদ্ধি যুগ থেকে আজ অবধি বাংলায় মা আদ্যাশক্তি মহামায়া র আরাধনা হয়। মা চন্ডী, মা দুর্গা, মা কালী, মা চামুণ্ডা সকলেই অস্ত্র ধারণ করে থাকেন এবং অসুর দমন করে থাকেন। শাক্ত মত কখনোই আমাদের দুর্বল হতে বা অস্ত্র ত্যাগ করতে শেখায় না। বরং মা এর আশীর্বাদ ধন্য হয়ে শত্রু মর্দন করার কথাই বলে। বাংলার ইতিহাসের অধিকাংশ রাজা এবং বীর ছিলেন পরম শাক্ত।

 

।।ওঁ নমশ্চচন্ডীকায়ৈ।।

বাংলায় শৈবমত ও অত্যন্ত প্রসিদ্ধ। দেবাদিদেব মহাদেব এর আরাধনায় চিরকাল মগ্ন থেকেছে বাঙালি। বাংলায় নাথপন্থী ও তান্ত্রিক শৈব মত চলে বেশি। বহু শৈব রাজবংশ ছিল বাংলার ইতিহাসে। আদিযোগী রূপ হোক বা ভয়ঙ্কর কালভৈরব রূপ সর্বক্ষেত্রে ই তিনি পিনাকপানি, সর্বদা ই তার হাতে থাকে ত্রিশুল। একাধারে তিনি ভোলা মহেশ্বর অন্যদিকে ভয়ঙ্কর রুদ্র। শাক্ত মতের মতো শৈব মত ও সর্বদা ই শক্তিশালী হতে এবং শত্রু দমনের কথা বলে কখনোই দুর্বলতার কথা বলেনা।

।।ওঁ নম শিবায়।।

বাংলায় বিষ্ণুপুজার সংস্কৃতি ও অতি প্রাচীন। পালযুগের প্রাপ্ত মূর্তি গুলির অধিকাংশ ই শ্রীবিষ্ণু র। পালযুগের শ্রেষ্ঠ শাসক সম্রাট দেবপাল ছিলেন গরুড়বাহন শ্রী বিষ্ণুর উপাসক। সেন যুগের সম্রাট লক্ষ্মণ সেন ছিলেন উগ্রমাধব নৃসিংহ উপাসক। বাঙ্গালা সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা দেব বংশীয় রাজন্য রা সকলেই বিষ্ণু পুজারী ছিলেন। এই সমস্ত বৈষ্ণব শাসক রা সকলেই ছিলেন মহাবীর। চতুর্ভুজ চক্রপাণি বিষ্ণু স্বয়ং বিশ্বের সংরক্ষক, বারবার অসত্য দমনে তিনি অবতার রূপ নিয়েছেন।তাই তাঁর উপাসকরা ও সকলে বারবার শত্রু দমন করেছেন।এরপর ষোড়শ শতাব্দীতে শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভুর হাত ধরে বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের জোয়ার আসে। হরেকৃষ্ণ নামে মানুষ মাতোয়ারা হয়ে ওঠে। শ্রীচৈতন্য ও কিন্তু বলিষ্ঠ দেহের অধিকারী ছিলেন, সিংহের ন্যায় ছিল তাঁর গ্রীবা ও বক্ষদেশ। তিনি হাত দিয়ে কাজীর সেপাইদের অস্ত্র ধরে তাদের দমন করেন।

।।ওঁ ত্রৈলোক্য পূজিত শ্রীমন সদা বিজয় বর্দ্ধন। শান্তিং কুরু গদাপানে নারায়নায় নমোহস্তুতে।।

বাংলায় সনাতনের প্রধান তিনটি ধারাই কিন্তু সর্বদা ক্ষাত্রবীর্যের প্রকাশ এবং শস্ত্র ধারণ এর পক্ষপাতী।

আমাদের ঈশ্বর কখনোই আমাদের লড়াইবিমুখ বা দুর্বল হতে বলেন না। বরং সর্বদা শত্রু দমন ও জাতি ধর্ম দেশ রক্ষার প্রকাশ তাঁরা।

🔰⚔️বাঙালির শাশ্বত ক্ষাত্রবীর্যের ইতিহাস ⚔️🔰

                    🔴 প্রথম ভাগ 🔴

বাঙালির ক্ষাত্রবীর্যের ইতিহাস অতিপ্রাচীন।

রামায়ণে উল্লিখিত নাব্যমন্ডলের কৈবর্ত যারা শ্রীরামচন্দ্রের প্রপিতামহ রঘুর সঙ্গে যুদ্ধ করেন, তাঁরা বঙ্গের লোক ছিলেন।

মহাভারতের যুদ্ধেও বঙ্গাধিপতি মহারাজা সমুদ্রসেন ও যুবরাজ চন্দ্রসেন এবং তাম্রলিপ্তরাজ ময়ূরধ্বজ ও যুবরাজ তাম্রধ্বজ কৌরব পক্ষে যুদ্ধ করেন এবং তাঁরা হস্তী যুদ্ধে বিশেষ পারদর্শী ছিল জানা যায়। বাকি ভারতবর্ষের মত এর পরের কিছু কালের ইতিহাস জানতে পারা যায়না।

গঙ্গাঋদ্ধি যুগে বাংলা থেকে উঠে আসেন এক যোদ্ধা, যিনি সমস্ত নৃপতিদের দমন করে এক সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন, তিনি Agragremmes বা ঔগ্রসৈন্য, তাঁকে আমরা চিনি মহাপদ্মনন্দ নামে, তাঁর হস্তিবাহিনী ও ছিল বিশাল ও শক্তিশালী। নিজ বাহুবলে এক বৃহৎ অঞ্চল তিনি শাসন করেন। এরপর নন্দ বংশের পতন ও মৌর্য বংশের উত্থান আর তারপর ভারতবর্ষের রাজনৈতিক রঙ্গমঞ্চে উপস্থিত হয় গুপ্ত বংশ। গুপ্ত বংশের প্রতিষ্ঠাতা শ্রীগুপ্ত অবশ্য পুন্ড্রবর্ধনের (অধুনা মালদহ) লোক ছিলেন বলে জানা যায়। এরপরেই সম্রাট জয়নাগের শাসনের ধারাপথ বেয়েই এক অখণ্ড গৌড় সাম্রাজ্যের উত্থান ঘটে গৌড়াধিপ সম্রাট শশাঙ্কদেবের নেতৃত্বে।

🔶 গৌড়াধিপ সম্রাট শশাঙ্ক 🔶

গৌড়াধিপ সম্রাট শশাঙ্ক কে বাঙালি জাতিসত্তার অন্যতম জনক বলা চলে। যদিও তাঁর প্রাথমিক জীবন এবং পারিবারিক জীবন সম্বন্ধে অনেক মত প্রচলিত কিন্তু একথা নিঃসন্দেহে সত্য যে তিনি বাঙালি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেন। তৎকালীন সময়ে গৌড় একটি সামান্য প্রদেশ ছিল, সেখান থেকে তিনি গড়ে তোলেন পশ্চিমে বারাণসী থেকে দক্ষিণে কলিঙ্গের গঞ্জাম পর্যন্ত বিস্তৃত এক বিশাল গৌড় সাম্রাজ্য। শশাঙ্ক চন্দ্রসুলভ শুভ্রবর্ণ ছিলেন , কাঁধ পর্যন্ত বিস্তৃত কুঞ্চিত কেশদাম, পেশীবহুল বলিষ্ঠ দেহ। তিনি অস্ত্র চালনায় ছিলেন অত্যন্ত দক্ষ, পরমশৈব শশাঙ্ক ছিলেন কালভৈরব এর উপাসক। স্বীয় বাহুবল ও রাজনৈতিক বুদ্ধির জোরে তিনি যতদিন জীবিত ছিলেন ততদিন গৌড় সাম্রাজ্য অক্ষত ছিল।

নরেন্দ্রাদিত্য শশাঙ্ক সিংহাসনে বসার পর গৌড় থেকে  মৌখরীদের বিতাড়িত করেন এবং নিজের শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। মালবের গুপ্ত বংশের সাথে জোট করে তিনি থানেশ্বর ও কনৌজের রাজ্যবর্ধন কে যুদ্ধে পরাস্ত করেন, রাজ্যবর্ধন মারা গেলে হর্ষবর্ধন রাজা হন। রাজা হবার পর হর্ষ রাজা ভাস্করবর্মণের সাথে জোট করেন এবং গৌড় দখলের প্রস্তুতি করে। কিন্তু পথে বাধা হয়ে দাঁড়ান শশাঙ্ক, ততদিনে তিনি প্রচুর ক্ষমতা সঞ্চিত করেছেন, বিস্তৃত অঞ্চলে তাঁর শাসন। এমতাবস্থায় সমগ্র বঙ্গ থেকে সুস্থ যুবাদের নিয়ে এসে শুরু হয় সৈন্য প্রশিক্ষণ। গড়ে ওঠে এক মহাবলী বাহিনী। শশাঙ্ক স্বয়ং নেতৃত্ব দান করেন সেনাকে। তাঁর যোগ্য নেতৃত্ব ও ভীষণ ক্ষমতার সামনে কে হারতে হয় হর্ষ ভাস্কর জোট কে।

মহারাজ শশাঙ্কের জীবদ্দশায় গৌড়ীয় সাম্রাজ্য ছিল সম্পূর্ণ অক্ষত। আশ্চর্যজনকভাবে, এত প্রতাপশালী সম্রাট হওয়া সত্ত্বেও শশাঙ্কের কোনো সভাকবি নিযুক্ত ছিল না, অগত্যা তাঁর কর্মকাণ্ডের সমস্ত তথ্য শত্রুপক্ষের বেতনভোগী কবিদের বিবরণ থেকে জোগাড় করতে হয়। স্বাভাবিক কারণেই, সেইসব বিবরণীতে সভাকবিরা পৃষ্ঠপোষক রাজন্যদের খুশি করতে শশাঙ্কের যথেচ্ছ চরিত্র হনন করেছেন।

মহারাজ শশাঙ্কের মৃত্যুর পর গৌড় সাম্রাজ্য ভেঙে পড়ে। বাংলায় দেখা দেয় অভূতপূর্ব নৈরাজ্য।এরপর চন্দ্রবংশের শাসনে পুনরায় বাঙালি জাতি একত্রিত হয় এবং সাম্রাজ্যবিস্তারে মনোযোগী হয়।

অতঃপর বাঙ্গালী জাতিসত্তার ও বীরত্বের পুনরায় সর্বোচ্চ উত্থান ঘটে পালযুগে।

 

🔶 পালযুগ 🔶

বাংলার ইতিহাসের সর্বাপেক্ষা গর্বের ও সমৃদ্ধশালী সময় ছিল পাল বংশের শাসনকাল। শুধুমাত্র সাম্রাজ্য বিস্তার নয়, সংস্কৃতি ও শিক্ষাতেও পালযুগ ছিল প্রকৃত অর্থেই স্বর্ণযুগ।

🟠সম্রাট প্রথম গোপাল:-

চন্দ্রবংশের পতনের পরবর্তীকালের মাৎস্যন্যায় যুগ শেষ হয়েছিল যখন সম্রাট প্রথম গোপাল কে বিভিন্ন সর্দার ও সাধারণ মানুষ মিলে গৌড়ের সিংহাসনে বসান।

পাল শব্দের অর্থ হল যিনি পালন করেন। গোপাল প্রকৃত অর্থেই বীর ছিলেন। সৌরবংশ জাত এই বীর নিজের প্রায় তিন দশকের শাসনকালে মাৎস্যন্যায় শেষ করেন এবং সমগ্র বাংলা ও বর্তমান বিহার অঞ্চলে নিজ সুশাসন প্রতিষ্ঠিত করেন। এই কাজ করতে গিয়ে বলাই বাহুল্য তাঁকে বহু শত্রু দমন করতে হয় যা তিনি নিজ ক্ষমতায় অত্যন্ত দক্ষ ভাবেই করেন। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র ধর্মপাল সিংহাসনে আরোহণ করেন।

 

🟠 সম্রাট ধর্মপাল:-

গৌড়েশ্বর পরমভট্টারক ধর্মপাল ছিলেন পালবংশের দ্বিতীয় শাসক ও দোর্দণ্ডপ্রতাপ যোদ্ধা। পিতার কাছ থেকে পাওয়া বৃহৎবঙ্গ বিস্তৃত সাম্রাজ্যকে তিনি সমগ্র আর্যাবর্ত জুড়ে বিস্তার করে এক বিরাট আকার দেন। সমগ্র উত্তর ভারতবর্ষ থেকে সিন্ধ অবধি তাঁর সাম্রাজ্য বিস্তৃত ছিল বলা হয়। খালিমপুর তাম্রশাসন অনুসারে মহাপরাক্রমশালী সম্রাট ধর্মপাল এর সামনে পরাজিত হয়ে মালব, হুণ, খশ, বিদর্ভ, সিন্ধসহ সমগ্র আর্যাবর্তের ১০ রাজ্যের নৃপতি এসে তাঁর রাজধানীতে এসে তাঁকে প্রণাম করেন ও মঙ্গলাচরণ করে তাঁর আধিপত্য স্বীকার করেন।

সিন্ধুতে সেসময় ইসলামিক আরবের আব্বাসীয় খিলাফত এর শাসন ছিল, যেখানকার মুসলমান শাসক ধর্মপালের খিদমত করে আনুগত্য স্বীকার করে । সিন্ধুপ্রদেশে পাল সাম্রাজ্য বিস্তার হয় । আরব গুপ্তচর সুলেমান আল তাজির এর ‘সিলসিলাত আল তাওয়ারিখ’ এ সম্রাট ধর্মপালের ৫০০০০ হস্তীসৈন্যের বর্ণনা রয়েছে যেখানে তিনি সম্রাট ধর্মপালকে “ধায়ের আল-আরব” বা “Terror of Arabs” বলে গৌরবান্বিত করেছেন । আর খালিমপুর তাম্রশাসন অনুসারে ধর্মপাল পাঞ্জাব অঞ্চলে মুসলমানদের সাথে যুদ্ধ করেছিলেন । তাই সবরকম বিচারে এদের সাথে যুদ্ধ হয়েছিল ও তাতে বিজয় ঘটেছিল তা বোঝা যাচ্ছে।

ধর্মমঙ্গল কাব্যে সম্রাট ধর্মপাল এর শারীরিক বর্ণনা পাওয়া যায়। তিনি শালপ্রাংশু, দীর্ঘদেহী, বৃষস্কন্ধ, ক্ষীণকটি, প্রশস্ত বক্ষ যুক্ত। তাঁর বাহু ছিল আজানুলম্বিত এবং অত্যন্ত শক্তিশালী ও সুগঠিত। কাঁধের নীচ অবধি বিস্তৃত পশ্চাদগ্রন্থিত কেশদাম। অশ্বপৃষ্ঠে আসীন তিনি হাতে তরবারি নিয়ে বরাহ চিহ্ন অর্থাৎ প্রতিহার দের দমন করেন বলা হয়।

 

🟠সম্রাট দেবপাল:-

পাল বংশের তৃতীয় ও সর্বশ্রেষ্ঠ শাসক ছিলেন পরমেশ্বর পরমভট্টারক গৌড়েশ্বর মহারাজাধিরাজ দেবপাল। তিনি ছিলেন তাঁর মহাপরাক্রমশালী পিতার সুযোগ্য পুত্র। পিতার কাছ থেকে পাওয়া বিশাল সাম্রাজ্য তিনি শুধু ধরেই রাখেননি আরও বিস্তৃত করেন। মহাসেনাপতি ও উপদেষ্টা হিসেবে দেবপাল পেয়েছিলেন পিতৃব্য তথা সম্রাট ধর্মপালের সেনাপতি বক্পালের সুযোগ্য পুত্র মহাবলী জয়পাল কে; তাঁর প্রধানমন্ত্রী তথা রাজনৈতিক উপদেষ্টা ছিলেন ধর্মপালের প্রধানমন্ত্রী গর্গ র পুত্র দর্ভপাণি ও পরবর্তীকালে পৌত্র কেদারমিশ্র। পরাক্রমশালী সেনাপতি ও তীক্ষ্ণ রাজনৈতিক বুদ্ধিসম্পন্ন প্রধানমন্ত্রীদের সহায়তায় সম্রাট দেবপাল এক বিশাল ও সুশাসিত সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, মহাসেনাপতি জয়পাল এক বিশালদেহী, নিজের জেষ্ঠভ্রাতার থেকেও দীর্ঘ, ভীমকায় এবং প্রচন্ড বলশালী ব্যক্তি তথা অসাধারণ যোদ্ধা ও সেনানায়ক ছিলেন। তাঁর নাম শুনেই রাজারা আত্মসমর্পণ করে দিতো।

দেবপালের আমলে পাল সাম্রাজ্যের সেনাবাহিনী ছিল বিশাল।  তাঁর তাম্রশাসনে ব্যক্ত হয়েছে যে, দেবপালের বিজয়বাহিনী দক্ষিণে বিন্ধ্যপর্বত ও পশ্চিমে কাম্বোজ দেশ অর্থাৎ আফগানিস্তান সীমান্ত পর্যন্ত অগ্রসর হয়েছিল।  জয়পালের বংশধর নারায়ণপালের তাম্রশাসনে ব্যক্ত হয়েছে যে, জয়পাল দিগ্বিজয়ে অগ্রসর হলে উৎকলের রাজা দূর হতে তাঁর নাম শ্রবণ করেই অসহায়ভাবে নিজের রাজধানী পরিত্যাগ করেছিলেন। প্রাগজ্যোতিষের (আসাম) রাজা, পাল সাম্রাজ্যের মহাসেনাপতি জয়পালের নির্দেশ মেনে যুদ্ধ না করে পালরাজের বশ্যতা স্বীকার করেছিলেন। কেদারমিশ্রের পুত্র গুরবমিশ্রের লিপিতে ব্যক্ত হয়েছে যে, দর্ভপাণির নীতিকৌশলে দেবপাল হিমালয় হতে বিন্ধ্যপর্বত এবং পূর্ব ও পশ্চিম সমুদ্রের মধ্যবর্তী সমগ্র ভূভাগ পদানত করে করদ রাজ্য পরিণত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এই লিপিতে আরও পাওয়া যায়, মন্ত্রী কেদারমিশ্রের বুদ্ধিবলের উপাসনা করে গৌড়েশ্বর দেবপালদেব উৎকলদিগকে উৎকীলিত করেন, হুণগর্ব খর্ব করেন এবং দ্রাবিড়দেশ ও প্রতিহারদেশ কম্পিত করেন এবং দীর্ঘকাল পর্যন্ত আসমুদ্র পৃথিবী উপভোগ করেছিলেন।

দেবপালের সময়ে পালসাম্রাজ্য গৌরবের চরম শিখরে আরোহণ করেছিল। তাঁর রাজত্বকালে বাঙালি সৈন্য ব্রহ্মপুত্র হতে সিন্ধুনদের তীর এবং সম্ভবত দক্ষিণ ভারতের প্রায় শেষ প্রান্ত পর্যন্ত বিজয়াভিযান করেছিল। প্রায় সমগ্র আর্যাবর্ত তাঁকে অধীশ্বর বলে স্বীকার করত। ভারতবর্ষের বাইরেও তাঁর খ্যাতি ও প্রতিপত্তি বিস্তৃত হয়েছিল।

কিন্তু মহাবলী পালবংশেরও প্রকৃতির নিয়মে কিছু পতন ঘটে। দেবপাল পরবর্তী শাসকরা তাঁর মত পরাক্রমশালী ছিলেন না।

ফলে এই বিস্তৃত সাম্রাজ্যের বিপুল অংশ হারিয়ে ফেলেন তাঁরা, এমনকি স্বাধীন হয়ে যায় রাঢ়বঙ্গ ও। রাঢ়ে তখন রাজত্ব করছেন চন্ডীভক্ত মহাবীর মহামান্ডলিক ইছাই ঘোষ। তিনি মা চন্ডীর আশীর্বাদধন্য এবং মায়ের অনুমতি তে প্রত্যেক যুদ্ধে যাত্রা করে বিজয়ী হয়েছেন।

পালযুগের এরকম এক সময়ে রক্ষাকারী হয়ে আসেন গৌড়েশ্বর পরমভট্টারক সম্রাট মহীপাল।

 

🟠সম্রাট মহীপাল:-

পালবংশের পতনোন্মুখ সময়ে সিংহাসনে আরোহণ করেন গৌড়েশ্বর পরমভট্টারক সম্রাট মহীপাল। পূর্বপুরুষদের ন্যায় তিনিও ছিলেন মহাবলী, পরাক্রমশালী যোদ্ধা ও সুদক্ষ সেনানায়ক। তিনি সেনাপতি হিসেবে পেয়েছিলেন লবসেন কোনার কে, যিনি ধর্মমঙ্গল কাব্যে লাউসেন নামে পরিচিত। লবসেন ও কালীচরণ ডোম এর সাহায্যে সম্রাট মহীপাল সমস্ত বিদ্রোহী সামন্তদের দমন করেন এবং সমগ্র বাংলা বিহার জুড়ে এক শক্তিশালী সাম্রাজ্য পুনরায় গড়ে তোলেন, বারাণসী অবধি তাঁর সাম্রাজ্য বিস্তৃত ছিল।

তবে সম্রাট মহীপাল এর সর্ববৃহৎ কৃতিত্ব হলো দুইবার কুখ্যাত মন্দির ধ্বংসকারী গজনভি কে আটকানো।

১০১৮ খ্রিস্টাব্দ, সোমনাথ মন্দির ও মথুরা নগর কে ধ্বংস করে দেবার পর মাহমুদ গজনভি তখন এগিয়ে আসছে কাশী বিশ্বনাথ লুন্ঠন ও ধ্বংস করতে। কিন্তু তার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ালেন সম্রাট মহীপাল ও তাঁর গৌড়ীয় সৈন্যবাহিনী। এক ভীষণ যুদ্ধে বাঙালি সেনার হাতে কচুকাটা হলো গজনভি সেনা। সম্রাট মহীপাল বারাণসী তে ১০০ টি ঈশানচিত্রঘন্টা(শিব শক্তির সমান রূপ) মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন।

গজনভির সাথে যখন সম্রাট মহীপাল যুদ্ধে ব্যস্ত এবং উত্তর পশ্চিমে আরও এগিয়ে যাচ্ছেন, সেই সময়ে চোল সাম্রাজ্যের প্রথম রাজেন্দ্র চোল বাংলায় আক্রমণ করলেন। কিন্তু সম্রাট মহীপালের অনুপস্থিতিতে প্রবল বিক্রমে চোলদের প্রতিরোধ করেন বঙ্গাধিপতি মহারাজা গোবিন্দ চন্দ্র। রাজা গোবিন্দ চন্দ্র চোল যুদ্ধ জাহাজ গুলিকে বাঙালি ডিঙ্গি নৌকা ও বিশাল তিরন্দাজ বাহিনী দিয়ে আটকে দেন। মেঘনা নদীর বুকে এক ভীষণ নৌযুদ্ধ হয়, ডিঙ্গি নৌকা দিয়ে চোল যুদ্ধপোত গুলিকে ঘিরে ফেলে প্রবল অগ্নি ও বাণবর্ষণ শুরু করেন রাজা গোবিন্দ চন্দ্র। এমন প্রবল প্রতিরোধের জন্য অপ্রস্তুত চোল বাহিনী পিছিয়ে তক্কনলাড়ম(দক্ষিণ রাঢ়) চলে আসে। এমতাবস্থায় সম্রাট মহীপাল অতিসত্বর ফিরে আসেন এবং চোলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যোগদান করেন।

মহীপালের ক্ষমতার বিষয়ে সুপরিচিত চোলরা এবার নিজ রাজ্যের দিকে পলায়ন করতে থাকে এবং তাদের পিছনে এক বিশাল গজেন্দ্র বাহিনী নিয়ে গিয়ে সম্রাট মহীপাল দক্ষিণে মলয় পর্বত অবধি অধিকার করে নেন।

প্রথমবার গজনভি আক্রমণ প্রতিরোধের প্রায় দেড় দশক পর মাহমুদ গজনভির ছেলে মাসুদ গজনভি আবার আক্রমণ করে। আক্রমণের দিন ই বিকালে বিশাল বাহিনী নিয়ে পুনরায় কাশীকে রক্ষা করতে উপস্থিত হন মহীপাল ও তাঁর জেষ্ঠ পুত্র দ্বিতীয় গোপাল। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য দ্বিতীয় গোপাল ছিলেন বিশালাকৃতি ভীমকায়, মহাবলী। গজনভি রা তখন লুটপাট চালাচ্ছে এরকম অবস্থায় বাঙালি সেনাদের প্রচন্ড আক্রমণে তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। মাসুদ তখন শরীফ উল মুলক এর সাথে কথা বলছিল, যখন গোপাল তাঁর গদা নিয়ে মাসুদ কে আক্রমণ করেন এবং মাসুদের মুখ ভেঙে দুটি দাঁত ভেঙে দেন। গৌড়ীয় সেনার ভীষণ প্রতিরোধ এ গজনভি রা পালাতে বাধ্য হয় এবং সম্রাট মহীপাল এর নেতৃত্বে কাশী আবার রক্ষা পায়।

দুইবার কাশী কে রক্ষা করার জন্য সম্রাট মহীপাল সমগ্র ভারতবর্ষে অত্যন্ত সম্মানিত হন এবং আর্যক্ষেমেশ্বর তাঁর চন্ডকৌশিক নাটকে গৌড়াধিপ মহীপাল কে “চন্দ্রগুপ্ত স্বরূপ” বলে বর্ণনা করেন।

মহীপাল প্রায় পঞ্চাশ বছর রাজত্ব করেন এবং অত্যন্ত সুশাসক হিসেবে প্রসিদ্ধ ছিলেন।

 

(লেখক পরিচিতি: পদার্থবিদ্যা স্নাতক, সঠিক ইতিহাস সন্ধানী ও প্রচারক, চরমপন্থী জাতীয়তাবাদী, শক্তিচর্চায় নিবেদিত এক বাঙালি যুবক)

 

(ক্রমশঃ)

Leave a Reply