চলচ্চিত্রসংস্কৃতি

বর্ষামঙ্গল –

 

– শ্রীমতী রত্নোত্তমা সেনগুপ্ত

 

আজ আমি যা বলব, সেটা খুবই ভিস্যুয়াল একটা সাবজেক্ট। সিনেমাতে বর্ষা। আমি মাত্র তিনটি আইকনিক সিনেমার গানের উপর বলব। 

আষাঢ়ের প্রথম দিনেই না হোক, বর্ষা নেমেছে। দিন গড়িয়ে মাস পাল্টিয়েছে। এসেছে শ্রাবণ মাস। “হরিয়ালা সাওন ঢোল বাজাতা আয়া, মনকা মোর নাচাতা আয়া, মিট্টি মে জান জাগাতা আয়া, ধরতি পহেনেগি হরি চুনারিয়া, বনকে দুলহানিয়া হো..।” আমরা কৃষিপ্রধান দেশ। বহুকাল ধরে বর্ষা প্রাণ সঞ্চার করে চলেছে এই দেশে, দেশের মাটিতে, দেশের দশেতে। এই সময় বসুন্ধরা, প্ল্যানেট আর্থ সবুজ শ্যামলীমায় ঢেকে যায়। বনকে দুলহানিয়া, যেন এক নববধু, “মন মগন হুয়া। এক লগন লগি।” আমাদের মন মেডিটেটিভ হয়ে যায়। ধ্যানমগ্ন অবস্থা পৃথিবীর। যখন আকাশ আর ভূমি এক হয়ে যাচ্ছে বারিধারায়, তখন যেন একটা বন্ধন বোধ আমাদের মনের মধ্যে জেগে ওঠে।

আপনারা অনেকেই শুনেছেন ‘দো বিঘা জমিন’ এর এই গানটা। গল্পটা ‘দুই বিঘা জমি’র বীজ থেকে জন্মিয়েছে। এক কৃষক, তার খুব আনন্দ হয় যখন তাদের গ্রামে বর্ষা নামে। মেঘের পরে মেঘ এল, কিন্তু সেই মেঘ যখন বৃষ্টি দিলনা, তখন খরা হয়ে গেল। সেই খরা হয়ে যাওয়াতে, তার যেই জমিটা বাঁধা পড়ে ছিল জমিদারের কাছে, সেটা ছাড়াতে পারলনা। সে জমিদারের কাছে গিয়ে কাকুতি মিনতি করল যে “বৃষ্টি তো হলনা, আমি কি করে ঋণ শোধ করব?” কিন্তু জমিদার বলল, “সে সব আমি বুঝিনা, ওই জমিটা পেলে আমি একটা ফ্যাক্টরি লাগাব, একটা ইন্ডাস্ট্রি হবে…”

রবীন্দ্রনাথের মূল কবিতার আধারে সলিল চৌধুরী লিখেছিলেন ‘রিক্সাওয়ালা।’ সত্যেন বোসের পরিচালনায় ছবিটা হয় ১৯৫২ তে। এরপর ১৯৫৩ তে ‘দো বিঘা জমিন’ রিলিজ হয়।

এই সালটার মাহাত্ম্য ? এর আগে, ১৯৫০ সালে দেশ রিপাবলিক হওয়ার পর ১৯৫১-৫২ তে ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশন শুরু হয়। বিভিন্ন স্থানে ড্যাম তৈরি হওয়া শুরু হল। আমাদের এগ্রিকালচার প্রধান দেশে তখন ইন্ডাস্ট্রি বসে যাচ্ছে। ফলে কি হচ্ছে? কৃষকেরা, গ্রামবাসীরা উচ্ছেদ হয়ে শহরে যেতে আরম্ভ করেছে উপার্জনের জন্য। গিয়ে সেখানে রিকশা টানছে।
বর্ষাতে সেই রিকশা কলকাতার প্রাণ, এইটা আমরা কতবছর দেখেছি! সেই রিকশা করে স্কুলে যাওয়া। যখন এম্বাসেডর গাড়ি বর্ষার রাস্তায় বন্ধ হয়ে যেতো, রাস্তা দিয়ে মানুষ যেতে পারতনা, তখন এই রিকশা নিয়ে যেতো। কিন্তু ‘দো বিঘা জমিন’ এ শম্ভু রিক্সা চালিয়েও তার জমি বাঁচাতে পারলনা।
*
এই একই গল্প আমরা পাই অন্য একটি ছবিতে, অনেক পরে, ছবিটা হয় ২০০০ সালে। অলমোস্ট হাফ সেঞ্চুরি পর তৈরি। কিন্তু গল্পটা ২০০ বছর আগের, যখন ইংরেজরা শাসন করছে ভারতবর্ষ।

মেঘ জমেছে আকাশে। সকলের কি প্রচণ্ড উৎসাহ, যে বৃষ্টি হবে! প্রচুর ধান হবে। তারা সমস্ত ঋণ শোধ করে দিতে পারবে। খাজনা দিতে পারবে। কিন্তু বৃষ্টি হলনা। তখন কি হল? যখন তারা ঋণ শোধ করতে পারলনা, তাদের উপর যে খাজনা পাওনা ছিল, তা বাড়িয়ে দেওয়া হল। তারা যে লাগান দিতে পারছেনা, তা দ্বিগুণ, তিনগুণ লাগান হয়ে গেল। ইংরেজদের হাত পা ধরে কাকুতি মিনতি করার পর, তারা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে, চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করল: একটা খেলার মধ্য দিয়ে জিত হারের ফয়সালা হবে। সেই খেলাটা ক্রিকেট – তখন ভারতীয়দের আজানা, কেবল শাসক ইংরেজরা খেলে। তাও, দৈবকৃপায় ও নিজেদের এফর্টে তারা জিতল। এতে তাদের তিনগুণ লাগান মাফ হয়ে গেল।

‘ঘনন ঘনন ঘন -‘ ‘লাগান’ ছবিতে এই গানটা কৃষকের আর্তি, ‘কালা মেঘ, কালা মেঘ, পানি তো বর্ষাও! বিজুরি কি তলবার নেহি, বুন্দকে বান চালাও।’ বিদ্যুৎ চমকাল, হাওয়া বইল, আম্ফান বয়ে গেল, কিন্তু কৃষকের প্রার্থনা, ‘বিদ্যুতের না, তুমি বারিধারা বর্ষাও,’ ব্যর্থ গেলো। তারা আশায় গেয়েছিল, ‘গয়ে দিন বদল, তু ঘরসে নিকল, বরসনে বালা হ্যায় অব অমৃত জল।’ এটাই তো বর্ষা! কিন্তু অমৃত বারিধারা বর্ষালনা। তারা লাগান দিতে পারলনা। তখন ওই পূর্বে বর্ণিত চ্যালেঞ্জ জিতে লাগান মাফ হ’ল।

আমি এরপর চলে যাচ্ছি আবার পেছনে, ১৯৬৬ সালে। ‘আল্লা মেঘ দে, পানি দে ছায়া দেরে দে, আল্লা মেঘ দে।’ ‘গাইড’ ছবিতে শচীন দেব বর্মন এই গানটা গেয়েছেন। ‘গাইডে’ নায়ক রাজু সই জাল করে জেলে গিয়েছিল। সে রোজিকে ভালবাসত। মেয়েটির ফিনান্সিয়াল ডকুমেন্টের সই সে জাল করেছিল যাতে তার স্বামী তার উপর কোনো ক্লেইম করতে না পারে। অর্থাৎ, ভালোবাসার জন্য। কিন্তু তাতে তার জেল হয়েছিল। জেল থেকে যখন বেরোল, তখন সে ছন্নছাড়া। এদিক সেদিক ঘুরতে ঘুরতে সে একটা গ্রামে পৌঁছল। ততদিনে তার চেহারা সাধু সন্ন্যাসীর মত হয়ে গেছে। তার পরনে আলখাল্লা, চুল দাড়ি লম্বা। গ্রামের সব লোকেরা তাকে সন্ন্যাসী বলে ভুল করল। হবি তো হ, সেই গ্রামেও আকাল পড়ল।

এটা নর্থ ইন্ডিয়াতে সেট করা, রাজস্থানের এক খণ্ডে। সেখানে আকালে কেউ খাবার পাচ্ছেনা। বাচ্চাদের থালাতেও খাবার দেওয়া যাচ্ছেনা। পশু পক্ষীও মরে যাচ্ছে। লুট হচ্ছে দোকান।

সেই অবস্থায় সেই সাধু – এখন ‘স্বামী’ নামে খ্যাত – বলল, “তোমরা লুটপাট বন্ধ কর। নাহলে আমি খাওয়া ছেড়ে দিলাম।”  কিন্তু গ্রামে, দিকে দিকে এই বার্তা রটে গেল যে ‘আমি খাওয়া ছেড়ে দিলাম বৃষ্টি হওয়ার জন্য।’ কেননা বৃষ্টি না হলে লুট, মারামারি, বাচ্চা মরে যাওয়া এই সব বন্ধ হবেনা। এই যে বার্তা চারিদিকে ছড়িয়ে গেল, তার থেকে স্বামী আর বেরিয়ে আসতে পারলনা। এক সময় সে ভাবল পালিয়ে যাবে, কিন্তু পালাতে পারলনা – কারণ সকলের চোখ তখন তার দিকে। তাই সে আরম্ভ করল উপোষ।

উপোষ আরম্ভ করার পর কি হল? সবাই তাকে এসে ঘিরে বসে থাকে। খিদের প্রকোপে এক সময় তার লোভ হয় যে ‘ঠাকুরের সামান্য প্রসাদ কলাটুকুই খেয়ে নি।’ কিন্তু তখনই সে ভাবে ‘এতগুলো লোকের বিশ্বাস আমার উপরে। তা মিথ্যে হয়ে যাবে!’ তার মনের মধ্যে একটা দ্বন্দ্ব হচ্ছে, “সত্যিই কি আমি ১০-১২ দিন না খেয়ে থাকলে বৃষ্টি হবে? আর যদি বৃষ্টি না হয়, তবে আমার তো প্রাণটা যাবে। কেন করছি এটা?” তার মন তাকে উত্তর দেয়, “এই যে এতগুলি মানুষ, তারা যে বিশ্বাসটা নিয়ে আছে, সেই বিশ্বাসটার জোর আমি দেখতে চাই। আমরা তো ঈশ্বরকেও দেখিনি। কিন্ত এটা আমাদের সকলের বিশ্বাস যে কেউ আছে। সে আমাদের কেয়ার করে। তার কাছে এই আর্তি যে আমাদের পৃথিবী শুকিয়ে যাচ্ছে, তাকে জল দাও, প্রাণ সঞ্চার কর বৃষ্টি দিয়ে!’

এই করতে করতে ১০/১২ দিন হতে চলল। নানান কাণ্ডের পর বৃষ্টি নামল। বিশ্বাসের জয় হল। এটাকে বিশ্বাসের জয়ই বলব। আর ওই যে কিছুক্ষণ আগে আপনারা বললেন যে ভারত একটা স্পিরিচুয়ালিটি, আধ্যাত্মিক ফোর্সের জায়গা। This Planet Earth is a physical reality and the sky is a spiritual concept. So the rain becomes a spiritual connection.

বর্ষাকাল তাই এক স্পিরিচুয়াল রিয়ালিটি। এর সব কিছুতে স্পিরিচুয়াল ভাব প্রকাশ পায়।

কিন্তু বর্ষার একটা পোয়েটিক সাইডও আছে। একটা রোমান্টিক সাইড, যেখানে কালিদাস মেঘকে পাঠায় দূত করে তার প্রিয়ার কাছে। যেখানে বিদ্যাপতি গায়, ‘ই ভর বাদর, মাহ ভাদর, শুন্য মন্দির মোর! হমরো দুখকো নহি ওর, সখিরি!’ তাই প্রিয়া পাশে থাকলেও রবি ঠাকুরের মনে বিরহ ভাব জাগে।

আর আমি শেষ করব আবার সেই বিমল রায়ের ছবি দিয়ে, যেখানে শৈলেন্দ্র লিখেছেন সুরকার সলিল চৌধুরীর জন্যে – ‘ও সজনা! বরখা বাহার আয়ি…।’

‘পরখ’ ছবির এই অনবদ্য গানটা মূর্ত করছে বর্ষামঙ্গলকে। এখানে বারিধারা নেমেছে। রসের ফোয়ারা বইছে। হাত বাড়িয়ে বৃষ্টির জল ধরা নায়িকার নয়নে ভালবাসা উপছে পড়ছে। মনের কোয়েলিয়া কুহু গাইছে। উষ্ণতা চাইছে তার রমণীয় অঙ্গ। এমন রিমিঝিমি বরষায় ঘনশ্যাম মেঘ আঁধার রাতকে হার মানায়, জাগিয়ে রাখে প্রিয়র স্বপনে…এমন দিনে শুধুই কি ময়ূর নাচে?! নাচে আমাদের অন্তরাত্মাও । কারণ ভুবনমোহিনী প্লাবন সমস্ত প্রাণিজগতে প্রাণের সঞ্চার করেছে!

 

(লেখক পরিচিতি – শ্রীমতী রত্নোত্তমা সেনগুপ্ত – ‘দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া’-র প্রাক্তন আর্টস এডিটর, মাস কম্যুনিকেশন এবং ফিল্ম এপ্রিসিয়েশনের শিক্ষিকা, গ্রন্থ অনুবাদ ও রচনার সাথে যুক্ত। তিনি সেন্ট্রাল বোর্ড অব ফিল্ম সার্টিফিকেশন (CBFC)-এর সদস্য ছিলেন; জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের জুরি বোর্ডে দায়িত্ব পালন করেছেন: তিনি জাতীয় পুরস্কার প্রাপক।)