– শ্রী সৌরভ হালদার
শ্রী সুভাষচন্দ্র বসুর অন্তর্ধানের রহস্যকে যদি একটি দীর্ঘ ইতিহাসের সমীকরণ হিসেবে দেখা হয়, তবে ১৯৪৫ সালের ১৮ আগস্ট কোনও সমাপ্তি নয়—বরং সেটিই ছিল প্রথম অধ্যায়ের শেষ এবং এক দীর্ঘ, অন্ধকার অনুসন্ধানের সূচনা।
তাইহোকুর কথিত বিমান দুর্ঘটনা, সোভিয়েত রাশিয়ার দিকে তাঁর যাত্রার পরিকল্পনা, পরবর্তী দশকগুলিতে ছড়িয়ে থাকা নানা গোয়েন্দা প্রতিবেদন, কথিত রেডিও সম্প্রচার এবং শেষ পর্যন্ত ফৈজাবাদের ভগবানজি—এই সমস্ত ঘটনাকে পাশাপাশি রাখলে একটি প্রশ্ন বারবার ফিরে আসে: ১৮ আগস্ট ১৯৪৫-এর পর আসলে কী ঘটেছিল?
এই অধ্যায়ে কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়ার চেষ্টা নয়। বরং কয়েকটি নথি ও সমকালীন ঘটনার দিকে তাকিয়ে সেই প্রশ্নটির পরিধি আরও বিস্তৃত করা যাক।
তাইহোকুর পর—মস্কোর একটি অস্বীকৃত বার্তা
শ্রী সুভাষচন্দ্র বসুর কথিত বিমান দুর্ঘটনার পরপরই ছড়িয়ে পড়া সংবাদগুলির মধ্যে অন্যতম ছিল তাঁর মৃত্যুর খবর। কিন্তু ব্রিটিশ সামরিক গোয়েন্দা নথিতেই এমন একটি তথ্য পাওয়া যায়, যা ঘটনাটিকে আরও জটিল করে তোলে।
উদ্ধৃত HQ Fourteenth Army-এর একটি SECRET ফাইল, যা কর্নেল Hugh Toye প্রস্তুত করেছিলেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে, সেখানে বলা হয়েছে—বোসের কথিত বিমান দুর্ঘটনায় মৃত্যুর পর N.R.S. Naidu মস্কো থেকে প্রচারিত একটি রেডিও সম্প্রচার শুনেছিলেন, যেখানে বোসের মৃত্যুর খবর অস্বীকার করা হয়েছিল।
এখানে অবশ্য সতর্ক হওয়া জরুরি। একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদনে কোনও ব্যক্তির শোনা রেডিও সম্প্রচারের উল্লেখ থাকা এবং সেই সম্প্রচারের স্বাধীনভাবে প্রমাণিত হওয়া—এক বিষয় নয়। কিন্তু গোয়েন্দা নথিতে এমন একটি তথ্যের উপস্থিতি নিজেই ঐতিহাসিক অনুসন্ধানের দাবি রাখে।
কারণ, যদি সত্যিই মস্কো থেকে এমন কোনও সম্প্রচার হয়ে থাকে, তাহলে প্রশ্ন ওঠে—কে সম্প্রচারটি করেছিলেন এবং তার উদ্দেশ্যই বা কী ছিল?
কিন্তু এই নথির আরেকটি তথ্য আরও রহস্যময়।

সাইগনের নিখোঁজ স্টেনোগ্রাফার –
ব্রিটিশ নথিতে আরও উল্লেখ করা হয় যে INA-র একজন স্টেনোগ্রাফার V.K. Nair সাইগন থেকে নিখোঁজ হয়ে যান।
সাইগন—আজকের Ho Chi Minh City—ছিল সেই স্থান, যেখান থেকে সুভাষচন্দ্র বসু তাইহোকুর উদ্দেশে যাত্রা করেছিলেন বলে প্রচলিত বিবরণে জানা যায়।
অর্থাৎ একই সময়পর্বে দুটি ঘটনা: একদিকে বসুর অন্তর্ধান ও কথিত বিমান দুর্ঘটনা; অন্যদিকে তাঁর সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত একজন স্টেনোগ্রাফারের নিখোঁজ হয়ে যাওয়া।
এটি কি নিছক কাকতালীয়?
নাকি যুদ্ধ-পরবর্তী বিশৃঙ্খলা, INA-র সদস্যদের ছত্রভঙ্গ হওয়া এবং দ্রুত পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতির স্বাভাবিক ফল? এই মুহূর্তে কোনও একটি উত্তরকে নিশ্চিতভাবে গ্রহণ করার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই। কিন্তু গোয়েন্দা নথির এই ছোট্ট উল্লেখটি অন্তর্ধানের ঘটনাকে আরও বিস্তৃত প্রেক্ষাপটে দেখার সুযোগ দেয়।
১৯৬৭: মস্কো রেডিওর আরেকটি রহস্য –
দুই দশকেরও বেশি সময় কেটে যায়।
১৯৬৪ সালে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে তাশখন্দ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। তার কয়েক বছর পর, ১৯৬৮ সালের ২১ অক্টোবর প্রকাশিত একটি হিন্দি সাময়িকী ‘বিশ্ব নেতা’-য় একটি চাঞ্চল্যকর দাবি প্রকাশিত হয়।
দাবি ছিল— শ্রী সুভাষচন্দ্র বসু নাকি তাশখন্দ চুক্তির পর মস্কো রেডিও থেকে সম্প্রচার করেছিলেন।
আরও নির্দিষ্টভাবে বলা হয়, ২৪ এপ্রিল ১৯৬৭ রাত প্রায় ৯টা ৩০ মিনিটে সম্প্রচারিত সেই বক্তব্যে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ আসন্ন বলে ইঙ্গিত করা হয়েছিল এবং ভারতের এক মহান নেতার নেতৃত্বে তার সম্ভাব্য ভূমিকার কথা বলা হয়েছিল।


খবরটি স্বাভাবিকভাবেই বিস্ময় সৃষ্টি করে। …..বিষয়টি লোকসভাতেও পৌঁছায়।
২০ আগস্ট ১৯৬৯, সাংসদ শ্রী সমর গুহ এই সংবাদ প্রকাশের প্রসঙ্গে লোকসভায় প্রশ্ন উত্থাপন করেন।
এরপর ভারত সরকার মস্কোয় অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাসের মাধ্যমে বিষয়টি যাচাই করার চেষ্টা করে।



Radio Moscow’s denial to provide the address of “Subhas Chandra”

এখানেই রহস্য আরও ঘনীভূত হয়।
সোভিয়েত কর্তৃপক্ষ জানায় যে ওই কথিত সম্প্রচারের কোনও যথাযথ রেকর্ড তাদের কাছে নেই। আরও আশ্চর্যের বিষয়—যে বক্তব্যের কথা বলা হয়েছিল, সেটি নাকি ‘Subhas Chandra’ নামের এক ব্যক্তি দিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি শ্রী সুভাষচন্দ্র বসু ছিলেন—এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
অর্থাৎ একটি নাম মেলে, কিন্তু পরিচয় মেলে না।
ইতিহাসের গবেষণায় এটিই সবচেয়ে বিপজ্জনক অঞ্চল—যেখানে একটি তথ্য একই সঙ্গে আকর্ষণীয় এবং অনির্ভরযোগ্য হতে পারে।
তবুও প্রশ্ন থেকে যায়:
শ্রী সুভাষচন্দ্র বসুর নামের সঙ্গে যুক্ত এমন একটি সম্প্রচারের দাবি ১৯৬০-এর দশকে কীভাবে প্রকাশ্যে এল?
১৯৭৯: “নেতাজি জীবিত” — আবারও বিস্ফোরণ |
এরপর আসে ১৯৭৯। ২৩ জানুয়ারি ১৯৭৯—নেতাজির জন্মদিন।
সেই সময় বাংলাসহ ভারতের সংবাদমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে এক চাঞ্চল্যকর দাবি—নেতাজি জীবিত এবং সুস্থ আছেন, এবং তিনি শীঘ্রই ফিরে আসবেন। এই দাবির সঙ্গে একটি ছবি এবং অধ্যাপক সমর গুহ র বক্তব্যও প্রচারিত হয়েছিল বলে সমকালীন বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।

কিন্তু আমাদের আলোচনার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি সংবাদপত্রে নয়—একটি ব্যক্তিগত ডায়েরিতে।
ভগবানজির ব্যক্তিগত ডায়েরিতে ২৩ জানুয়ারি ১৯৭৯-এর পাশে লেখা হয়েছিল:
“কলকাতার সব কাগজেই বেশ ভালভাবেই ঘটনার প্রচার হয়েছে দেখলাম। Photo সহ অধ্যাপকের বক্তব্য খুব ভাল প্রচার পেয়েছে।”
এই একটি বাক্যই অনুসন্ধানকে অন্য মাত্রায় নিয়ে যায়। কারণ, এখানে শুধু নেতাজিকে নিয়ে সাধারণ কোনও মন্তব্য নেই। বরং সংবাদপত্রে প্রকাশিত নির্দিষ্ট ঘটনা, ছবি এবং অধ্যাপক সমর গুহ র বক্তব্য সম্পর্কে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে।
যদি ভগবানজি শুধুমাত্র একজন সাধারণ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক হয়ে থাকেন, তাহলে তাঁর এই আগ্রহ ব্যাখ্যা করা সম্ভব। কিন্তু যদি তাঁর পরিচয়কে ঘিরে ওঠা বিতর্কের প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা হয়, তখন প্রশ্নটি আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।
৩০ জানুয়ারি: ছবির সত্য-মিথ্যার বিতর্ক
মাত্র এক সপ্তাহ পর, ৩০ জানুয়ারি ১৯৭৯, কলকাতার সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয় পাল্টা দাবি।
সেই ছবিটিকে নকল বা পরিবর্তিত ছবি বলে অভিযোগ ওঠে। পশ্চিমবঙ্গের কংগ্রেস (I)-এর নেতা সুব্রত মুখার্জি এই বিষয়ে বক্তব্য দেন বলে উদ্ধৃত বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। অভিযোগ ছিল—নেতাজির দাদা শরৎচন্দ্র বসুর একটি পুরনো ছবির মাথার অংশ কেটে করে তার সঙ্গে নেতাজির মুখ জুড়ে দিয়ে ছবিটি তৈরি করা হয়েছে।

এবার আবার ফিরে আসা যাক ভগবানজির ডায়েরিতে।
৩০ জানুয়ারি ১৯৭৯-এর নোটে তিনি লেখেন:
“এই দিন কাগজে Congress (I) এর অন্যতম নেতা সুব্রত মুখার্জির statement বের হল। সঙ্গে ২/৩ খানা Photo ছাপা হয়েছে এবং তার থেকে প্রমাণিত হচ্ছে যে অধ্যাপকের Photo নকল।”

অর্থাৎ মাত্র সাত দিনের ব্যবধানে প্রকাশিত দুটি সংবাদই ভগবানজির ব্যক্তিগত নোটে ধরা পড়েছে—প্রথমে দাবিটির প্রচার এবং পরে ছবিটির সত্যতা নিয়ে বিতর্ক।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়: ডায়েরির নোটগুলি দেখায় যে তিনি সংবাদমাধ্যমের এই ঘটনাবলি ঘনিষ্ঠভাবে অনুসরণ করছিলেন।
কিন্তু এখান থেকে সরাসরি তাঁর পরিচয় নির্ধারণ করা যাবে না।
ঘটনাগুলির মধ্যে অদৃশ্য সুতো – এখন তিনটি সময়কে পাশাপাশি রাখা যাক।
১৯৪৫ — বসুর কথিত মৃত্যুর পর মস্কো থেকে তাঁর মৃত্যুর অস্বীকৃতির একটি রিপোর্ট; একই সময়ে INA-র স্টেনোগ্রাফার V.K. Nair-এর নিখোঁজ হওয়ার উল্লেখ।
১৯৬৭–৬৯ — মস্কো রেডিও থেকে ‘Subhas Chandra’-র কথিত সম্প্রচার এবং সেই ঘটনা নিয়ে লোকসভায় প্রশ্ন।
১৯৭৯ — নেতাজি জীবিত থাকার দাবিকে ঘিরে সংবাদমাধ্যমের উত্তেজনা এবং ভগবানজির ডায়েরিতে তার তাৎক্ষণিক প্রতিফলন।
প্রতিটি ঘটনাকে আলাদাভাবে দেখলে হয়তো এগুলির কোনওটিই চূড়ান্ত প্রমাণ নয়।
কিন্তু ইতিহাসের রহস্য অনেক সময় একক প্রমাণে নয়—ঘটনাগুলির পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যেই প্রশ্ন তৈরি করে। আর সেই প্রশ্নটিই আমাদের আবার ফৈজাবাদের দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।
যে মানুষটি জনসমক্ষে নিজের পরিচয় গোপন রেখেছিলেন, যিনি ভগবানজি বা গুমনামি বাবা নামে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন, তিনি কেন নেতাজির অন্তর্ধান ও সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন সম্পর্কিত সংবাদ এত গভীরভাবে অনুসরণ করছিলেন?
এটি কি শুধুই একজন নেতাজি-অনুরাগীর কৌতূহল? নাকি এর পিছনে ছিল আরও ব্যক্তিগত কোনও কারণ?
এই প্রশ্নের উত্তর আমরা এখনই দেব না।
কারণ, রহস্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটি এখনও সামনে আসেনি।
ভগবানজির ঘরে পাওয়া চিঠি, তাঁর হাতে লেখা মন্তব্য, নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ এবং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ঘটনাবলির প্রতি তাঁর অস্বাভাবিকভাবে গভীর আগ্রহ—সবকিছুকে একসঙ্গে পড়তে গেলে হয়তো একটি বৃহত্তর ছবি ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতে শুরু করবে।
এবং সেই ছবির কেন্দ্রে থাকবে একটি প্রশ্ন—
তাইহোকুর আকাশে যে গল্পের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়েছিল, সেটিই কি সত্যিই সুভাষচন্দ্র বসুর গল্পের শেষ অধ্যায় ছিল?
নাকি ১৮ আগস্ট ১৯৪৫-এর পর ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত অন্তর্ধানটি কেবল নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করেছিল?
লেখক পরিচিতি –
শ্রী সৌরভ হালদার: একজন গবেষক ও লেখক; পদার্থবিদ্যা ও ইংরেজি বিষয়ে (Honours) উচ্চশিক্ষিত এবং ২০১০ সাল থেকে গবেষণায় নিয়োজিত। তাঁর গবেষণার মূল ক্ষেত্র দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, শীতল যুদ্ধ, নাৎসি জার্মানি, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ও INA এবং আধুনিক ইতিহাস; নেতাজি ও অক্ষশক্তির সম্পর্ক নিয়ে তাঁর গবেষণাভিত্তিক গ্রন্থ রয়েছে। তিনি ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের প্রাক্তন Research Associate এবং Archaeological Survey of India (ASI)-এর স্বীকৃতিপ্রাপ্ত গবেষক ও লেখক।


