আঙিনাশাশ্বত সনাতনসংস্কৃতি

‘একটি ধানের শীষের উপরে’ – ১

“গ্রাম ছাড়া ওই রাঙা মাটির পথ, আমার মন ভুলায় রে…” হ্যাঁ, মন ভুলবেই গ্রামগঞ্জের মেঠোপথে; মাঠের আলে, মাটির আঙ্গিনায় আবার গোবরজলে নিকিয়ে আলপনা দেওয়া মাটির বাড়ির উঠোনেও- যেখানে শীতের সকালে মাদুর বিছিয়ে চলে রোদের ওম নেওয়া আবার তীব্র গরমের ঝাঁঝাঁ দুপুরে থাকে আম- জলপাই আচার বয়ামের রোদ খাওয়ানো আর রোওওজ সকালগুলোয় থাকে পুকুরে নদীতে বা কলতলায় বাসি কাজ সেরে স্নান করে মা-ঠাকুমার সদ্য ভেজা শাড়ির জল টপটপে উঠোন। মনের আর কি? সেতো এমন সুখদৃশ্যে অন্য যাকিছু কাজ ভুলতে বাধ্যই । গ্রামের এই প্রাকৃতিক বাহার যে আর কোনখানে মেলে না !

আজকের ফ্লাইওভার, শপিংমল আর হাইরাজ অধ্যুষিত মানুষের জীবনে ‘গ্রাম’ শব্দটাই বোধ হয় অচেনা। গাছপালার সবুজেঘেরা রোদছায়ার নাচনে কাঁচামেঠো পথ- সোজা নয়, এঁকেবেঁকে গেছে সে। পথের কোনোদিক গেছে ধানজমি মাঠের আলে- আবার কোনোটা গেছে কাঁচাপাকা বাড়ির পাড়ায় কোনোটা আবার মাঠের সদ্য গজানো ভোরের শিশিরে ভেজা শাকসবজি নিয়ে বসা বাজারের দিকে। টিনের চাল দেওয়া মাটির কাঁচা বাড়ির উঠোনে পড়ে থাকতে দেখা যায় পাশের পাড়ার লালু-ভুলুদের ভোকাট্টা হওয়া লাল-নীল-সবুজ ঘুড়ি- যা কুঁচিয়ে কুঁচিয়ে বৃষ্টির জলে ধুয়ে শেষ করবে একদিন তার চার পাঁচটাকা দিয়ে তৈরি অস্তিত্ব। আবার সে পথ দিয়েই দেখা যায় ইঁট আর মাটির দেওয়াল তোলা টালি দিয়ে ঢাকা ছাদের মন্দির- যেখানে সদাই পাওয়া যায় ধূপ-ধুনো আর ফুল চন্দনের সুগন্ধ সাথে সর্বশক্তিমান সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশ্যে মাথা নুইয়ে আশীর্বাদ পাওয়ার আশ্বাস- “আমার খোকাটার কুবাতাস লাগা শরীর ঠিক করো গো ঠাকুর”, “আমাদের সক্কলকে ভালো রেখো”, “ওর বাবার কাজটা যেন থাকে মাগো”!! ওই যে- বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর! নাহ্, তর্ক বিষয়টি বহুপ্রচলিত হলেও তর্ক করা সবজায়গায় চলেনা। দু’টাকার সাদা হলুদ বাতাসা সাথে একটাকা দক্ষিণা আর বাড়িতে ফোটা ফুলের সুবাসে দেওয়া পুজোয় ওদের প্রার্থনার বিশ্বাসে মা দেননি তো ফিরিয়ে- সে হোকনা “ভালো চিকিৎসা পেয়ে তবেই খোকা ঠিক হয়েছে” এটাও খুব ঠিক সাথে রইল মায়ের স্নেহের প্রার্থনাও ঠিক! প্রতি জায়গার নিয়মরীতি, বিশ্বাস-অবিশ্বাস এর দোলাচলেই তো থেকে যাই সবাই, একবাক্যে কিছুই তো উড়িয়ে দেওয়া যায় না! গ্রাম তো খানিকটা এমনই- আরও থাকে গ্রাম্য মানুষরা- তার পরিবার-পাড়াপড়শীরা ।

নাহে বাপু, ওসব ‘নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি’র নাম এখনও কারেন্ট গেলে রাতবিরেতে ঝিঁঝিঁপোকার ডাক শোনা অজপাড়াগাঁয়ে তেমন পরিচিত হয় নি। বরং সহজপাঠের “ডাক পাড়ে ও ঔ, ভাত আনো বড়োবউ”-এর মতো করেই একান্নবর্তী পরিবারে বড়ো মেজো সেজোবউরা কেউ কুটনোবাটনায় মন দেয় তো কেউ মাটির দোপাখা উনুনে কাঠের জ্বালে ভাত রাঁধেন। ঠিক তখনই সকাল সকাল বেজে ওঠে সদ্য স্নান করা ঠাকুমার হাতেধরা শাঁখ- “ঠাকুর সবার মঙ্গল কোরো”! এদিকে বাড়ির ছোটগুলো পড়াফেলে কাগজের তৈরি নৌকা হাতে করে জড়ো হয় রান্নাঘরের সামনে মায়ের হাতের কুমড়োফুলের বড়া কি চালভাজার লোভে; বাজার করা ব্যাগ হাতে কাকু এসে দেয় তাদের চপেটাঘাত!! এসবই তো কান্ড- এইতো হলো গাঁয়ের জীবন- আজন্ম পরিচিত পরিবেশ- গ্রামের বাড়ি।

গাঁ ঘরের একটা নিজস্ব জীবনছন্দ আছে।গন্ধ আছে। বাড়ি যত বড়ই হোক বা ছোট, মাটির উঠোন থাকা অপরিহার্য। রামায়ণে মনে পড়ে গভীর বনে সীতাকে একা রেখে যাওয়ার আগে নিরাপদ চিহ্ণ হিসেবে দেবরের দেওয়া লক্ষণরেখা! সবার বাড়ির উঠোন মানে কিন্তু এই এক গন্ডি- যার বাঁশের খুঁটি বা ছোট গাছপালা বা রাংচিতার বেড়া দিয়ে ঘেরা সীমানা আসলে যেন একেকটা নিরাপত্তার আশ্বাস। না হোক সে পাকা ইঁট সিমেন্টে তোলা দেওয়াল, সে উঠোন কিন্তু প্রতি বাড়ির জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। বৃষ্টিজলে কাদামাখা মাটির উঠোনে চলার সুবিধেয় কিছু সময়ের জন্য দুএকটা ইঁট পেতে সরু একটু পিচ্ছিল না হওয়া পথ করে দেওয়া বাকি সময় উঠোনের একপাশে বাবাকাকার রাখা পুরনো বড়চাকার ঘন্টি আটকানো সামনে আলো দেওয়া সাইকেল তার পাশেই থাকা ছোটদের সবাইকে লুকিয়ে দুপুরের রোদে এপথ ওপথ চষে বেড়ানোর বাতিল হওয়া টায়ার, ঘুড়ি লাটাই, লাট্টু মায় মাটির তৈরী খেলনাবাটি আর পুতুল।

পাশেই কুলো করে শুকোতে দেওয়া রান্নার রকমারি ফোড়ন, জিরেমৌরি শুকনো লঙ্কার বাহার। তাতেই পড়ে যায় উঠোনে লাগানো সজনেগাছের হলদেটে ঝরাপাতা বা ঘরের চালে ওঠা হলুদরঙা কুমড়ো ফুল। পুজো পার্বণে সবার আগে কিন্তু এই গোবরজলে নিকানো উঠোনই সেজে ওঠে চালগুঁড়োগোলা জলের আল্পনা আর সদরের দুপাশে মঙ্গলঘট আর কলাগাছে। সেই উঠোনই রোজ রোজ বিকেলে সেজে ওঠে এবাড়ি ও বাড়ির কচিকাঁচার কুমিরডাঙা, গোল্লাছুট আর লুকোচুরির কলতানে।

ছোটদের আনন্দ, স্কুল যাবো না কান্নার পর মাষ্টারমশাইয়ের পেটানোর ভয়ে ব্যাগ নিয়ে রওনা দেওয়া- গ্রামের কৃষিকাজ- পড়শীর ভালোবাসা মন্দবাসা- পালাপার্বণে ভরপুর এক গ্রাম- নামটি তার পাঁচঘরা- হুগলি জেলার এক অজপাড়াগাঁ বলতে যা বোঝায় তাই!! দিনের শেষে ক্লান্তি কাটাতে খানিক সুখটান-তাসের আড্ডা- মোড়ে মোড়ে টিমটিমে আলোজ্বলা মুদির দোকান- কিছু বাড়ি পাকা কিছু কাঁচা- এপাশে বড়বড় গাছের সারি তো ওপাশে ছোটবড় মন্দির বা মণসাঠাকুরের চাতাল। ওইযে বলেছিলাম, বিশ্বাসে মিলায় বস্তু!! এইমতে এখানে বলা ভালো বারো মাসে তেরো নয়- কয়েকশ পার্বণে ভরা গাঁ।

বলব এ সব কথাই। এ পর্বে আলাপটুকু ত হল সবে। আমার গাঁয়ের পালা পাব্বণ,বুড়ো বট,পোড়ো মন্দির,ভাঙা রাজবাড়ী আর মেঠোপথের ধূলায় মেলানো গোধূলির কথা নিয়ে আসব আবার আগামী পর্বে।

আমার গল্প শুনতে, কান রাখুন কাঞ্জিক এ।

(ক্রমশ)

Leave a Reply