অতীত যা লেখেনিসংস্কৃতি

বাংলা চলচ্চিত্রের গন্ধর্বকন্যা – ললিতা

২০১১/১২ সাল হবে।আকাশবাণী এফ এম গোল্ডের পুরোনো বাংলা ছবি বিষয়ক ‘ম্যাটিনী শো’ অনুষ্ঠানে কমেডিয়ান পর্ব তখন শেষের মুখে।।সুযোগ এল ললিতা চ্যাটার্জির কাছে যাবার।দেশপ্রিয় পার্ক রাসবিহারী অ্যাভেনিউ ক্রসিং থেকে ডানদিকের রাস্তায় ঢুকেই বড় সাদা তিন তলা বাড়ী।আমার এফ এম জীবনের শুরুর দিক তখন। আজ এইসব পরিস্থিতিতে , এমন মানুষের সান্নিধ্য পাবার সুযোগ হলে যেভাবে কথা বলি,সেদিন তেমন পরিণত ছিলাম না; তাই ললিতা দি’র বাড়ীতে যাবার আগে তাঁর সম্বন্ধে যথাসাধ্য হোমওয়ার্ক করা হয় নি। আমি তখন ‘বিভাস’ এর অসামান্যা সেই সুন্দরী ‘পদ্ম’কে কাছ থেকে দেখার আনন্দে বিভোর। ‘অ্যান্টনী ফিরিঙ্গী’র ‘মারিনা’র সঙ্গে সামনাসামনি, কথা বলার জন্য অস্থির। বাংলা ছবির স্বর্ণকালের এমন স্বর্ণময়ী অভিনেত্রীর ইতিহাসটুকু ধ’রে রাখার গুরুত্ব সেদিন সত্যিই তেমন ক’রে বুঝি নি।

একদম তিনতলায় দুটি ( বা হয়ত একটিই হবে, পার্টিশন করা)ঘরে তাঁর বসবাস।ঘরে ঢুকে খানিক আলোআঁধারি। বিছানা,সোফা, সাইড টেবল তাঁর সেই ‘হার মানা হার’, ‘মুক্তিস্নান’এর মত সৌন্দর্যে ঝকঝকে নেই বটে,কিন্তু অন্দরসাজে ফেলে আসা দিনের অভিজাত রুচির ছোঁয়া। খানিক বাদে উল্টোদিকের চেয়ারে এসে বসলেন তিনি। শীতের শেষদিক। লম্বা হাউসকোট বা কাফতান জাতীয় কিছু পরেছিলেন তিনি। চেহারা ভেঙেছে অনেকটাই বোঝা গেল,এবং তার থেকেও বেশি,কেমন যেন এক বিষাদছায়া লেপ্টে রয়েছে তাঁর গোটা অস্তিত্বজুড়ে। মুখের অভিজাত হাসিতে আমাদের ওয়েলকাম করলেন।তাঁর কথাবার্তা, ভাবভঙ্গি – সবের মধ্যেই নিখুঁত সাহেবীয়ানার ছোঁয়া ছিল খুব স্পষ্ট, যদিও তাতে তাঁর উচ্চারিত বাংলাভাষা বা আন্তরিকতা কোথাও টোল খায়নি এতটুকুও।যে অনুষ্ঠানের জন্য কথা বলতে গেছি,তার সময়,দিনক্ষণ, নিয়মকানুন,সইসাবুদ,টাকাপয়সা -এ সব কিছু সেরে নিয়ে জানতে চাইলাম তাঁর জীবনের কথা। কেমন যেন হারিয়ে গেলেন তিনি। টুকরো, টুকরো,ছেঁড়া,ছেঁড়া এক একটা ঘটনা কষ্ট ক’রে মনে করছেন – এমনই লাগল খানিক। উত্তম কুমার পর্ব বাদে, অনেক চেষ্টাতেও মনে করতে পারলেন না নিজের অভিনীত ছবির বেশীভাগের নামই। শুধু অনিল চ্যাটার্জির সঙ্গে অভিনীত ‘মুক্তিস্নান’ ছবির কথা আলাদাভাবে বললেন।

চলচ্চিত্র জগতের বহু মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ আমার এর আগে,পরে বহু হয়েছে,এবং হয়ে চলেছে। অদ্ভুতভাবে, তাঁদের সঙ্গে দু এক কথার পরেই আমার দারুণ জমে যায়।কিন্তু ললিতা দি’র সঙ্গে সেদিন যেন জমছিল না। অস্বস্তি হচ্ছিল,অথচ উঠতেও ইচ্ছে করছিল না।আর, বারেবারেই যেটা তুমুলভাবে অবাক করছিল,তা হল ওঁর নিখুঁত ইংরেজি উচ্চারণ এবং কখনো কোনো কোনো কমেন্টে আচমকা এসে পড়া ভারতীয় দর্শন,বিশ্ব ইতিহাস ইত্যাদির প্রসঙ্গ।

আমাদের সাদাকালো যুগের ইন্ডাস্ট্রি কাঁপানো নায়িকারা অভিনয়ে মাত ক’রেছেন অনেকেই।ললিতা চ্যাটার্জি যাঁদের তুলনায় কয়েক হাজার মাইল পিছিয়ে কেরিয়ারের দিক থেকে; কিন্তু শিক্ষার এমন দিপ্তী ত চোখে পড়ে নি। তাহলে কি…!! প্রশ্নটা থেকেই যাচ্ছিল। হঠাৎ ললিতা দিই নিজেই আমার দিকে ফিরে বেশ খুশি হয়ে ব’লে উঠলেন, ‘তুমি ত রেডিও প্রেজেন্টার, জান, আমিও কিন্তু রেডিও প্রেজেন্টার ছিলাম। বাংলাতেই। ‘ কোথায়,কবে জিজ্ঞেস করার আগেই উনি ব’লে উঠলেন, ‘বি বি সি তে’। আমার বিস্ময়ের পাল্লা আরও চড়ছে। ললিতা দি, ভেতর থেকে হেসে উঠে বললেন, ‘জান,ওদের কাছে এখনও আমি টাকা পাই’!

‘মানে’!!???

দীর্ঘদেহী প্রাচীনা সুন্দরী, শেষ বিকেলের নরম রোদের মত আলতো হাসলেন।

“আসলে খুব অল্পবয়সে এক বিখ্যাত ব্যাবসায়ী পরিবারের ছেলের সঙ্গে বিয়ের পরেই আমি ত লণ্ডন চ’লে গিয়েছিলাম।ওখানে গিয়ে তখন আমি বি বি সি তে নিয়মিত বাংলা অনুষ্ঠান করতাম। তারপর আমার দুই ছেলে।তারপর ফিরে আসার সময়ে আমার আর শেষ fee টা নেওয়া হয় নি।” সন্ধে ঘনিয়ে রাতের দিকে যাচ্ছিল। আমার ওঠার তাড়া করতেই হল কারণ শ্রীরামপুর ফিরতে সময় লাগবে। ললিতা দি বললেন, ‘দোলন, আবার এস একদিন’। উঠে আসার সময়ে চোখ গেল সেন্টার টেবলের ওপর রাখা একটা স্টিল ফটোতে। ছবিটা এ সময়ের হলেও সাদাকালো; আর তোলার মধ্যে একটা দারুণ মুন্সিয়ানা আছে,দেখলেই বোঝা যায়।একটা বহুতলের গায়ে পড়া আলোছায়ার খেলা। জিজ্ঞেস করতে বাধ্য হলাম, ‘এটা কার তোলা দিদি?’ বললেন, ‘আমার বড় নাতির;ও মুম্বইয়ের স্টিল ফটোগ্রাফার ‘।ঘরের আর এক দেওয়ালে একটা কাপল ফটো দেখিয়ে বললেন, ঐ ওর মা বাবা। আমার ছেলে চলে গেছে।ওর মা আবার সংসার করেছে যদিও,কিন্তু আমার সঙ্গে তার বন্ধুত্ব অটূট। বড় ভাল মেয়ে।’

ললিতা দি’র খোলা জানলার মত হৃদয় থেকে উৎসারিত একঝলক বাতাস আমার চোখেমুখে এসে লাগল। কিন্তু জানার যে আরও বাকি ছিল। প্রণাম ক’রে বেরিয়ে আসতে যাব, পা ছুঁতেই দিলেন না। অত লম্বা মানুষ, আমায় প্রায় জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘এসব হয়ে যাক,একদিন এস। অনেক গল্প আছে’…

সত্যিই বিস্ময়কর সে সব গল্প। জানলে ম’নে হতেই পারে যে এ হেন গল্পের নায়িকাদের সঙ্গে জীবন যদি পাশাখেলা কিছু কম খেলত,বাংলা ইন্ডাস্ট্রি আজ সত্যিই অনেক উপকৃত হত।

এই সব গল্প নিয়ে আসব আবার পরের পর্বে। ততক্ষণ, কাছে রাখুন ‘কাঞ্জিক’কে। 

Leave a Reply