বিজ্ঞান

ধ্রুপদী বিজ্ঞানের অলিগলি

আমরা কথায় কথায় অনেকেই বলি যে ‘এটা বিজ্ঞান বলছে আর তাই এটা সত্য’, অথবা ‘ বিজ্ঞানের বলে আমরা বলতে পারি যে এই ব্যাখ্যা সত্য’। আমরা প্রত্যেকেই কখনও না কখনও এই ধরণের বক্তব্য শুনেই থাকি – রাজনীতির তর্কে, বাজারে, চায়ের দোকানের আড্ডায় ইত্যাদি ইত্যাদি।
শুধু তাই নয়, আমরা অনেকেই অর্থনীতি, ভূগোল, জীববিজ্ঞান ইত্যাদি বিজ্ঞান কি বিজ্ঞান নয় সেই নিয়ে তর্ক চালাই এবং পদার্থবিজ্ঞান কি রসায়নকে শুদ্ধ বিজ্ঞান ( পিওর সায়েন্স) বলে অভিহিত করি। কিন্তু কেন করি? আসুন, আজকের আলোচনাতে আমরা যথাসম্ভব গাণিতিক সমীকরণ কম ব্যবহার করে এই ব্যাপারগুলো বোঝার চেষ্টা করব।

সবার প্রথমেই যেটা বলার সেটা হল: বিজ্ঞান কি ব্যাখ্যা করে? না বর্ণনা করে? Does it explain or describe?
বুঝলেন না তো? আসুন, প্রথমে এটাকেই ধরা যাক।
ধরুন, একজন অশিক্ষিত লোককে আপনি জিজ্ঞেস করলেন যে পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে কেন?
সে বলল- কে জানে ভাই! ভগবানের ইচ্ছা।
আপনি মনে মনে হাসলেন, ব্যাটা কিছুই জানে না। তারপর একজন স্কুলছাত্রকে জিজ্ঞেস করলেন একই প্রশ্ন।
সে বলল- নিউটনের মহাকর্ষ সূত্র অনুযায়ী এটা হবে।
আপনি ভাবলেন, হ্যাঁ, ঠিকই কিন্তু নিউটন বলছে বলে এই কাণ্ড হবে এটাই বা কেমন কথা?
তারপর আপনি আরো উঁচু ক্লাসের কাউকে জিজ্ঞেস করলেন।
সে বলল- গ্র্যাভিটেশ্নাল পোটেন্শিয়াল এনারজির জন্য এইটা হয়। সব জিনিসই চায় তার নিজের স্থিতিশক্তি কম করতে…
আপনি রেগে গেলেন,” বুঝলাম, কিন্তু কেন?? কেন ???”
এবার একজন এসে আপনাকে বোঝালো যে ব্যাপারটা আসলে কারভেচার। সূর্যের ভরে স্পেস টাইম কারভেচার দুমড়ে আছে তাই লঘু ভরের পৃথিবী ওই কারভেচারের জন্য বেঁকে যায়।
আপনি হাসলেন, ” বাবারা, সব বুঝলাম, কিন্তু সেটাই বা কেন হয়? ”
দেখবেন শেষে উত্তর আসবে- প্রকৃতির ইচ্ছা।
তখন আপনি ভাবতে বসবেন যে মূর্খ ‘ ভগবানের ইচ্ছা’ বলেছিল আর যে পণ্ডিত ‘ প্রকৃতির ইচ্ছা’ বলল সেদুটোর মধ্যে পার্থক্যটা কি?

পার্থক্য হল আমাদের ধারণার পার্থক্য। বিজ্ঞান আসলে ব্যাখ্যা করে না , সে বর্ণনা করে।

এবার, এই ব্যাপারটা বুঝে যাওয়ার পর দেখা যাক পরের আলোচনা- তাহলে কি সেই অন্তবিহীন বর্ণনামালার কোন গুরুত্ত্ব নেই?
নাহ্, আছে বৈকি!
নিখুঁত বিজ্ঞানের সূত্র মেনে মেঘ হয়, বৃষ্টি পড়ে, জোয়ার ভাঁটা খেলে, সূর্য ওঠে, বাতাস বয়, পরাগমিলন হয়, ফসল ফলে ইত্যাদি সব কিছুই হয়। কিন্তু কেন? এমনকী বর্ণনাও যদি হয়, বিজ্ঞান এত নিখুঁত কেন?

নিউটনের তিনটি গতিসূত্র, মহাকর্ষ সূত্র ইত্যাদি মেনে আমাদের সাবেক বলবিজ্ঞানের জয় যাত্রা। আমরা গর্ব করে বলি যে নিয়মে আপেল মাটিতে পড়ে, সেই একই নিয়মে ব্ল্যাক হোলের চারিদিকে নক্ষত্ররা ঘোরে। এই যে নিশ্চয়তা এর কারণ কি?
একটু আগেই তো দেখলেন যে ব্যাপারটা প্রকৃতির ইচ্ছা না ভগবানের ইচ্ছা সে নিয়েই কিছু বলা যাচ্ছে না!

তাহলে, আমরা নিশ্চিত হতে পারছি কি করে যে পদার্থবিজ্ঞানের যে পরীক্ষা আজ দিল্লির করোল বাগে আমরা করছি সেই পরীক্ষা পরশুদিন নিউ ইয়র্কের টাইমস স্কোয়ারে বা তরশুদিন শনির উপগ্রহের ওপর করলে একই রেজাল্ট দেবে?
বা,
অক্সফোর্ড ল্যাবে রসায়ানাগারে যে ভ্যাক্সিন আজ পরীক্ষা করে নিশ্চিত করলাম যে তা জীবাণু মারতে সক্ষম তা রিয়াধে আজ থেকে তিন মাস পরেও একই রেজাল্ট দেবে?
বা,
যে দাঁড়িপাল্লায় এই ঘরে পাঁচ কিলো চাল ওজন করলাম তা পাশের ঘরে ওজন করলে পাঁচ কিলোই ওজন দেখাবে?

শুনলে অবাক হবেন ( অথবা হবেন না) এর জন্য ভগবান বা প্রকৃতি কারুর দোহাই দিয়েও অথবা না দিয়েও আমরা বলতে পারি- দেবেই, দেবেই, দেখাবেই। কারণ…তা গণিতের সত্য।

পরের দিন- নোয়েটার উপপাদ্য।

 

 

Leave a Reply