আঙিনাস্বভূমি ও সমকাল

গ্রন্থ আলোচনা – ‘উনিশ শতকে বাংলার জাতীয়তাবাদ: রাজা রামমোহন থেকে শ্রী অরবিন্দ’

গ্রন্থের লেখক: অধ্যাপক গৌতম মুখোপাধ্যায় – 

গত ৫ই সেপ্টেম্বর, ২০২১ তারিখে পূর্ণ প্রতিমা, কলকাতা থেকে প্রকাশিত অধ্যাপক গৌতম মুখোপাধ্যায়ের লেখা ‘উনিশ শতকে বাংলার জাতীয়তাবাদ : রাজা রামমোহন থেকে শ্রীঅরবিন্দ’ গ্রন্থতে জাতীয়তাবাদী ইতিহাস চর্চায় একটি ভিন্ন আঙ্গিকে তুলে ধরা হয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকেই ভারতে যে ‘dogmatic’ ইতিহাস চর্চার বীজ সযত্নে প্রোথিত হয়েছি, সেই পরিকল্পিত ধারার বিরুদ্ধে গিয়ে সনাতন ভারত তত্ত্বের ‘scholastic’ আলোচনাকে পুনর্মূল্যায়িত করেন। উনিশ শতকে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ভারতীয় প্রতিক্রিয়াগুলি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে দুইটি ধারার প্রতিক্রিয়া দেখানো হয়েছে; প্রথম ধারার প্রতিক্রিয়াটি গ্রামীণ কৃষক, জমিদার ও উপজাতিদের সশস্ত্র বিদ্রোহ, দ্বিতীয় ধারাটি হল ইংরেজি শিক্ষিত ও পাশ্চাত্য সমালোচনায় বিদ্ধ শহুরে ও গ্রাম থেকে উঠে শহরে বসবাসকারীদের বৌদ্ধিক আন্দোলন।

দ্বিতীয় ধারার প্রতিক্রিয়াটি মূলত কলকাতা কেন্দ্রিক বুদ্ধি – বিভাষা আন্দোলন বা বাংলার রেনেসাঁস নামে পরিচিত, যা থেকে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের দর্শনটি ক্রমশ পরিণত হয়েছিল। তবে, প্রচলিত ইতিহাস চর্চায় ভারতীয় জাতীয়বাতাবাদের দর্শন যাঁদের চিন্তা-ভাবনা দ্বারা সমৃদ্ধ হয়েছিল, তাঁদের দুটি গোষ্ঠী তথা উদারবাদী সংস্কারক ও রক্ষণশীল সনাতনী হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই চর্চায় তৎসময়ের পন্ডিত, সমাজ চিন্তক ও ইতিহাস পর্যবেক্ষকদের উক্ত ফাই গোষ্ঠীর কধ্যে ফেলা হয়েছে। এমনকি, এই ব্যক্তিত্বদের চিন্তা ও ঐতিহাসিক ভূমিকার ওপর আলোকপাত করার ক্ষেত্রে কিছু জনকে স্বল্প পরিসর দেওয়া হয়েছে বা ইতিহাস গত ভাবে তাদের গুরুত্ব স্বীকার করা হয়নি, আবার কখনো এদের ভাবনা-চিন্তায় থাকা মতদ্বৈধতার ওপর অধিক জোর দেওয়া হয়েছে। বিশেষ মোড়কে উনিশ শতককে দেখানোর জন্যই এই ধরণের ইতিহাস চর্চা করা হয়েছে। আলোচ্য গ্রন্থটির মধ্যে প্রচলিত ইতিহাস কড়চার ঐ খামতি গুলিই উঠে আসেনি পাশাপাশি এই পর্বের পন্ডিত, সমাজ চিন্তক ও ইতিহাস পর্যবেক্ষকদের দ্বারা ভারত চর্চার স্বাধীন দৃষ্টিভঙ্গি জন্ম নিয়েছিল তা অন্বেষণ করা হয়েছে। এই ভারত চর্চা যে ভারতীয় সমাজকে ‘দেশ’ চেতনা থেকে ‘জাতি’ চেতনায় উত্তীর্ণ করেছিল, তা গ্রন্থটিতে দেখানো হয়েছে।

সমস্ত গ্রন্থটি মোট ১৩’টি অধ্যায় ও ২১৬’টি পৃষ্ঠা সহযোগে লিখিত হয়েছে। গ্রন্থের প্রথম অধ্যায় ‘জাতীয়তাবাদী চেতনা-প্রদীপ্ত বাঙ্গালীর নব অভ্যুত্থান’ – এ ইউরোপীয়দের প্রাচ্যচর্চার মধ্য দিয়ে ভারতের সংস্কৃতি ও সভ্যতার সমালোচনার উত্তরে কলকাতাবাসী বাঙ্গালী পন্ডিতদের লেখনী থেকে যা উঠে এসেছিল সেই ঐতিহাসিক ধারাটি বিশ্লেষণ করা হয়েছে , যার মধ্য দিয়ে লেখক জাতীয়তাবাদী ভাবনার প্রাথমিক বিকাশ লক্ষ্য করেছেন। সেক্ষেত্রে তিনি বিভিন্ন ধারার ইতিহাস চর্চার মনোগ্রাহী আলোচনা রেখেছেন, যার মধ্য দিয়ে এই পর্বে ভারতীয় জাতিওয়াতবাদ বিকাশে ভারত চর্চার গুরুত্বটি ব্যাখ্যা করেছেন।

অধ্যাপক মুখোপাধ্যায় এরপরের চার’টি অধ্যায়ে অধ্যায়ে রাজা রামমোহন ও তাঁর পরবর্তী সময়ের পন্ডিত অক্ষয়কুমার দত্ত, রাজেন্দ্রলাল মিত্র প্রমুখদের ভারত চর্চা ও ভারত তত্ত্ব নির্মাণ প্রভৃতির প্রতি অবলোকন করেছেন। অধ্যায়গুলোতে তথ্য সহকারে রাজা রামমোহন রায়ের বিশ্ব দরবারে ভারত তত্ত্বকে উদ্ঘাটনের মধ্য দিয়ে কিভাবে বিশ্ব ভ্রাতৃত্বের ধারণা প্রচার করেছিলেন; ভারত তত্ত্ব নির্মাণে তাঁর অনুসৃত চিন্তা-পদ্ধতিগুলি অক্ষয়কুমার দত্ত ও রাজেন্দ্রলাল মিত্র প্রমুখদের দ্বারা পরিপূর্ণতা ও গভীরতা প্রাপ্তির ইতিহাস ব্যাখ্যায়িত হয়েছে। অক্ষয়কুমার দত্ত ও রাজেন্দ্রলাল মিত্র উভয় লেখনীর দ্বারা ও বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠান পরিচলনা করে সমগ্র ভারতকে কোন সূত্র ধরে জাতি গঠনের প্রয়োজনীয়তায় প্রাদেশিকতার ঊর্ধে সর্বভারতীয় চেতনায় সমৃদ্ধ করেছিলেন তা তথ্য সহকারে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, আর তা ব্যাখ্যার মধ্য দিয়ে তাঁদের ভারত চর্চায় ভারত তত্ত্বের দিকগুলি যথা ভারতের ঐতিহ্যগত চিন্তা পদ্ধতি, দৃষ্টিভঙ্গি ও সামাজিকতা প্রভৃতি প্রচ্ছন্ন ভাবে উঠে এসেছে।

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ঊনিশ শতকে বাঙ্গালীর রাজনৈতিক ভিক্ষাবৃত্তির উপর তীব্র কষাঘাত করে গৌরবময় সৃষ্টির আবেদন রেখে যে প্রবন্ধ ও উপন্যাসগুলি লিখেছিলেন, তা প্রচলিত ইতিহাস চর্চায় অনেক ক্ষেত্রেই হিন্দু পুনরুজ্জীবনবাদী ও সাম্প্রদায়িক চেতনা সম্পন্ন বলে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। অধ্যাপক মুখোপাধ্যায় তাঁর এই অধ্যায়ে উক্ত ব্যাখ্যাগুলির পক্ষপাতিত্বের দিকটি আলোছায়া সাথে সাথে বঙ্কিমের ইতিহাস পর্যবেক্ষণ সত্তা, জাতি গঠনে ঐতিহ্য ও সমাজের প্রীতি তাঁর দার্শনিক চিন্তা এবং তা ভারত তত্ত্বকে কিভাবে সমৃদ্ধ করেছিল প্রভৃতির ইতিহাস সম্মত ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

সপ্তম, অষ্টম ও নবম অধ্যায়ে ঊনিশ শতকে বাংলার ইতিহাসের উত্তরণের পর্যায় বলে অভিহিত করেছেন। ঔপনিবেশিক শাসনের পাশ্চাত্য সংস্কৃতি ও মিশনারিদের খ্রীষ্ট ধর্ম প্রসারের অভিঘাতে বাংলার দৈনন্দিন সাংস্কৃতিক জীবনের বিভিন্ন ধারায় ঘাট-প্রতিঘাত দেখা দিয়েছিল। অধ্যাপক মুখোপাধ্যায় এর পরিপ্রেক্ষিতে বাংলায় গড়ে ওঠা বিভিন্ন সভা ও পত্রিকার মাধ্যমে বাঙ্গালী চিন্তনের আত্ম অনুসন্ধান ও সমন্বয় চেতনা বিকশিত হওয়ার ধারাটি পর্যায়ক্রমে তাঁর আলোচনায় দেখিয়েছেন। ‘সত্য’ ও ‘ধর্ম’ বিষয়ে ঐতিহ্যগত ধারণাকে বাঙ্গালী শিক্ষিত গোষ্ঠী (সংস্কারক ও সনাতনী নির্বিশেষে) ঊনিশ শতকের পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তিশীল ভাবে প্রতিস্থাপন করার ইতিহাস তুলে ধরেছেন। পাশাপাশি বাংলায় সমসাময়িক পন্ডিতদের ভারত তত্ত্ব চর্চার অন্যতম ফলশ্রুতি হিসাবে দেশপ্রেম ও আত্মশক্তি বিকাশের ইতিহাস চর্চিত হয়েছে।

অধ্যাপক মুখোপাধ্যায় তাঁর শেষ চারটি অধ্যায়য়ে ইতিহাসের মুখ্য ধারায় রাজনারায়ণ বসু ও শ্রী অরবিন্দের অবদানকে কিভাবে ও কতটা দেখানো হয়েছে সেই বিষয়টি তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে উভয়েরই চিন্তা দর্শনে ভারত চর্চার চিরকালীন প্রাসঙ্গিকতা ব্যাখ্যা পেয়েছে। তিনি রাজনীতি ও ধর্ম বিষয়ে উভয়ের চিন্তা ও দর্শনের সংশোধিত মূল্যায়ন করেছেন।

পরিশেষে বলা যায়, গ্রন্থে ঊনিশ শতকের বাংলায় জাতীয়তাবাদ যেভাবে অংকুরিত হয়েছিল তার ওপরে পুনঃ চর্চা হয়েছে। এই গ্রন্থে ইউরোপীয় প্রাচ্যবাদীদের বিপরীতে ভারতীয়দের দ্বারা ভারত চর্চা এবং বিশ্বের দরবারে ভারত তত্ত্ব উদ্ঘাটিত করার ইতিহাস তৎসময়ে চিন্তাবিদের লেখনীগুলির পর্যালোচনা দ্বারা মূল্যায়ন করা হয়েছে। এমনকি এই দিকগুলির অন্বেষণের মধ্য দিয়ে অধ্যাপক মুখোপাধ্যায় আমাদের মত পাঠকের কাছে গবেষণা দ্বারা ইতিহাস চিন্তায় পুনঃ মূল্যায়ন করার আবেদন রেখেছে।

গ্রন্থটির সমালোচনা করেছেন – শ্রী জয়ন্ত মাজিগোপ (PhD গবেষক, সিধো-কানহো-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয় – State aided College Teacher, M.G. College Lalpur, Purulia)

Leave a Reply