বিপন্নতার মানব মুখ

বানভাসী

 – ফেরারী ফৌজ

“হালদারের পাড় ডুবে গেল৷” সকাল সকাল বড়দের মুখে আলোচনা শুনে ঘুম ভাঙল৷ ওইদিককার পনের কাঠার ধান নিয়ে বাবাকেও বেশ চিন্তিত লাগল৷ বাতাসে তখন পুজো পুজো গন্ধ দিব্যি এসে গিয়েছে৷ যদিও বৃষ্টি ব্যাগড়া দিতে শুরু করেছিল আগেই৷ এবার অবশেষে আমরা ছোটরাও বন্যা নিয়ে ভাবতে শুরু করলাম৷ চিন্তা চাপল এরকম চলতে থাকলে পুজো হবে তো আদৌ? হঠাৎ করে যেন শৈশবের স্বপ্নজগত থেকে আমরা বাস্তবের মাটিতে এসে পড়লাম৷ সেই অনুভূতিটা ফিরে এল যেটা হয়েছিল উরিষ্যায় সুপার সাইক্লোনের সময়৷ নিয়ম করে খবর দেখতে শুরু করলাম বোধহয় সেই প্রথম৷ ২৪ ঘন্টার বাংলা খবরের চ্যানেল তখনও বহুদূর৷ খবর বলতে সন্ধ্যা সাতটায় ডিডি বাংলার সংবাদ, ইটিভিতে আমার বাংলা আর সন্ধে ছটায় বিখ্যাত খাস খবর৷ দেখতাম বন্যার ছবি, গ্রামের পর গ্রাম জলমগ্ন, স্কুল বাড়ির ছাদে আর্ত মানুষজন৷ ইতিমধ্যে জল বাড়তে শুরু করল৷ মা’য়ের শুনলাম সব ছুটি বাতিল, অতিরিক্ত ডিউটিও করতে হবে৷ প্রায় দিনই ঘুম ভেঙে বাবাকেও দেখতাম না৷

দুপুরে হয়ত একবার আসতেন বর্ষাতি গায়ে, খাওয়া সেরে অল্পক্ষণ পরেই আবার বেরিয়ে যেতেন৷ ফিরতেন আবার সেই রাতে৷ বাড়িতে যেটুকু সময় থাকতেন ফোন আসতে যেতেই থাকত৷ গ্রামে তখনও মোবাইলের প্রচলন হয়নি৷ গম্ভীরমুখে ল্যান্ডলাইনে ত্রাণকার্যের বিষয়ে আলোচনা চলত৷ কান খাড়া করে শোনা শুরু করলাম৷ অমুক জায়গাতে আরও ত্রিপল লাগবে, তমুক জায়গাতে নৌকো পাঠাতে হয়েছে৷ কোথাও জল এত উঠেছে যে পাটবাড়িও প্রায় ডুবে গিয়েছে! বাবার এক ছায়াসঙ্গী জানাল “তোর মাথার ওপর তিনফুট জল, বুঝলি?” হাঁ হয়ে গিয়ে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করলাম৷ এবার সরাসরি ভয় হতে লাগল৷ ভরসা পেলাম বাবার কথায়৷ ছোটবেলায় বাবা মানে সুপারহিরো, সেখানে আমার বাবা আবার সারাদিন ঘুরে ঘুরে উদ্ধারকাজ চালাচ্ছে, বোধহয় মনে হয়েছিল বন্যাও বাবাকে ভয় পায়৷

 ইতিমধ্যে একদিন বিদ্যুত গিয়ে আর এল না৷ শুনলাম ইলেক্ট্রিক পোস্ট, তার সব জলের তোড়ে ধুয়ে গিয়েছে৷ গ্রামের রাস্তা ছোট সাঁকোর কাছে অনেকখানি ভেঙে গিয়েছে৷ ‘পাকা রাস্তা’, অর্থাৎ জেলা সদরের সাথে যোগাযোগকারী রাস্তা বহু জায়গায় হয় ভেঙে গিয়েছে, নয়ত জল বের করতে লোকে কেটে দিয়েছে৷ ততদিনে এটাও বিলক্ষণ জানি দুর্গতদের কাছে খাবার নেই৷ কোথা থেকে যেন শুনেছিলাম হেলিকপ্টার থেকে ফেলা খাদ্যসামগ্রী মানুষ ঠিকমত পাচ্ছে না, আবার অন্যভাবে পৌঁছানোও যাচ্ছে না৷ বন্ধুদের তখন হাত পা নেড়ে বোঝাই “হেলিকপ্টার থেকে প্যাকেটগুলো ফেলছে কিন্তু সবাই লুফতে পারছে না, ফলে সেসব জলে পড়ে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে৷” জানিনা কেন বারবার আমি সাঁতার জানিনা এটা মনে করে একইসাথে নিজের জন্য শঙ্কা ও সেইরকম কোন দূর্গত এর জন্য সহমর্মীতা জাগত৷ অনেকদিন পর মাকে একটু সময় জুড়ে কাছে পেয়ে কৌতুহল প্রকাশ করি৷ খাবার বেড়ে মা বলতে থাকে “একটুও নষ্ট করবি না, জানিস আজ একটা বাচ্চা এসেছে হাসপাতালে, সে দুদিন ধরে খেতে পায়নি? এসেই আগে বলছে আমাকে খেতে দাও৷”

অবাক চোখে প্রশ্ন করতে থাকি ও কি কলমী শাক আর কুমড়োও খেয়ে নিল? মা বলে যায় “খেতে না পেলে ওটার জন্যই মারামারি করে মানুষ বুঝলি?” কখনও গল্প করে ৭৮-এর বন্যার৷ হস্টেলে বসে সহপাঠির থেকে শোনা নারকেল গাছে রাত কাটানোর গল্প৷ কখনও বa সাপের কামড়ে কোন বাচ্চার মা হারা হওয়ার গল্প৷ যে গল্প শুনিনি তা হল সারাদিন ডিউটি করে তারপর বিদ্যুতহীন বাড়িতে মা’র আদৌ বিশ্রাম হত কিনা সে গল্প, বৃষ্টি মাথায় করে জল ভেঙে মেডিক্যাল টিমের সাথে ঘোরার গল্প, ক্রমেই কঠিন হতে থাকা যোগাযোগের মধ্যে বাবার উদ্বেগ ও তীব্র মানসিক চাপের গল্প৷ এর সাথে জাঁকিয়ে বসতে লাগল অদ্ভুত এক বিষণ্ণতা, সেটা কতটা দুর্গতর প্রতি সমব্যথীতা র কারনে আর কতটা একটানা বাবা মা এর সঙ্গবঞ্চিত হওয়ার কারনে সেটা বলা মুশকিল৷

 সবকিছুরই শেষ থাকে৷ বৃষ্টিও একদিন ধরে এল, জলও নেমে গেল৷ কয়েকদিনের ব্যস্ততা ঝুপ করে নিভে গিয়ে কেমন যেন একটা ক্লান্তিময় আবেশ চারিদিক ছেয়ে ফেলল৷ যে মাঠ বিশাল জলাশয়ে পরিনত হয়েছিল সেখানে জেগে রইল শুধু লণ্ডভন্ড পাকা ধান৷ তার মাঝ দিয়ে ভেঙে, গর্ত হয়ে, এবড়ো খেবড়ো হয়ে যেন দাঁত বের করে শুয়ে রইল গ্রামের আঁকাবাঁকা পথ৷ সর্বত্রই কেমন একটা ধ্বংসের পদচিহ্ন৷ বড়দের মুখ গম্ভীর,  ফসলের কতটা ক্ষতি হল বিচারে ব্যস্ত৷ খবরে দেখলাম বহু স্থানে নলকূপ ডুবে গিয়েছিল, এখন তার জল পানের অযোগ্য৷ বড়দের প্রশ্ন করতে লাগলাম কী করে সেসব আাবর পানের যোগ্য হবে তা নিয়ে৷ তারপর সেসবও চাপা পড়ে গেল পুজোর আবেশে৷ শুনলাম বহু জায়গায় এ বছর দুর্গা পূজা হবে না৷ সারা পুজো জুড়ে এই ভাবনাটা দফায় দফায় মনে জেগে উঠত৷ নিজেকে বেশ ভাগ্যবান মনে হয়েছিল৷ এর কুড়ি বছর পর আবার দুর্গাপূজা হবে কিনা সে নিয়ে প্রশ্ন উঠবে,  সেবার বন্যা, এবার মহামারী৷ জানিনা আজকের একজন ছ বছরের বাচ্চা মহামারীকে কীভাবে মনে রাখবে, তার তো স্কুলটুকুও খোলা নেই৷ বিশ্বজুড়ে এই দশক বলতে মানুষ মহামারীকেই মনে রাখবে৷ 

 

(ক্রমশ)

Leave a Reply