রাজনীতিস্বভূমি ও সমকাল

শ্রী হরিপদ ভারতী – এক প্রামাণ্য বীক্ষণ

(আগের পর্বের লিঙ্ক)

 

১৯৭৮ সালে West Bengal Legislative Assembly/পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার ৬৭ তম অধিবেশনের কার্যকাল চলাকালীন ২৮শে মার্চ বাজেটের supplementary estimate/ সাপ্লিমেন্টারি এস্টিমেট সংক্রান্ত আলোচনায় অংশগ্রণ করে শ্রীহরিপদ ভারতী তাঁর বক্তব্য তুলে ধরেছিলেন এইভাবে–“মাননীয় উপাধ্যক্ষ মহাশয়, ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রী তাঁর বিভাগের ব্যয় বরাদ্দের যে প্রস্তাব এখানে রেখেছেন জনতা পার্টির পক্ষ থেকে আমি সেই প্রস্তাব সমর্থন করতে দাঁড়িয়েছি। মাননীয় উপাধ্যক্ষ মহাশয়, প্রাকৃতিক দুর্যোগ আমাদের দেশের নিত্যসঙ্গী। প্রতি বৎসর হয় অনাবৃষ্টি নয় খরা, মাটি দীর্ন-বিদীর্ন হয়, শস্য ভস্মীভূত হয়, পিপাসায় কণ্ঠনালী শুষ্ক হয়ে যায়, আর না হয় অতিবৃষ্টি হয়, বন্যায় শত শত গ্রাম প্লাবিত হয়ে যায়, লক্ষ লক্ষ মানুষ বিপন্ন বোধ করে। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে আর্ত মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়ানো প্রতিটি সুস্থ সচেতন সরকারের কর্তব্য।”

২৮ মার্চের আলোচনায় অংশগ্রহণ করে তিনি বলেন “মাননীয় অধ্যক্ষ মহোদয়, অনেকগুলো মন্ত্রী মহাশয় একে একে এবং মাননীয় অর্থমন্ত্রী অনেকের হয়ে একেবারে অনেকগুলো ব্যয়-বরাদ্দের দাবি পেশ করেছেন এবং সেই ব্যয়-বরাদ্দের দাবি প্রসঙ্গে আমরা আমাদের বক্তব্য রাখবার চেষ্টা করছি। প্রথমে আমি বলতে চাইব যে সীমাবদ্ধ সঙ্গতির মধ্যে এমন সমৃদ্ধ বাজেটের সমারোহ নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য। কারণ মাননীয় মন্ত্রী মহাশয় একে একে সমস্ত বাজেট উপস্থিত করেছেন এবং তারপর দফাওয়ারি বিভিন্ন মাননীয় মন্ত্রী মহাশয় একে একে সমস্ত বাজেট উপস্থিত করেছেন এবং তারপর অতিরিক্ত ব্যয়-বরাদ্দের দাবি উপস্থিত হল। কিন্তু এই সমস্ত ব্যয়-বরাদ্দের দাবি প্রসঙ্গে আলোচনা করবার সময়ে আমি স্থির করতে পারছি না, আলোচনা রাজ্য সরকারের করব না, কেন্দ্রীয় সরকারের করব। কারণ সমস্ত ব্যয়-বরাদ্দে দাবির আলোচনা প্রসঙ্গে সরকার বিভিন্ন মাননীয় সদস্যরা, মন্ত্রী মহাশয়েরা বারবার কেন্দ্রের দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন এবং কেন্দ্র যদি প্রয়োজনীয় অর্থ সরবরাহ না করে, তাহলে রাজ্যের সঙ্গতিতে সম্ভব নয় উন্নত করা—একথা আমরা বারবার শুনেছি এবং আজকে এই সভায় বিভিন্ন সময়ে এই কলকাতা মহানগরী অতিক্রম করে দিল্লির দিকে যাবার চেষ্টা করতে হয়েছে। বারবার কেন্দ্রীয় সরকারকে এখানে আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে আমাদের ক্ষয়-ক্ষতি, দায়-দায়িত্ব তাদের স্কন্ধে ন্যস্ত করার একটা চেষ্টা আমরা দেখেছি এবং এই প্রসঙ্গে এখানে কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের পুনর্বিন্যাসের আলোচনা হয়েছে এবং আলোচনা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ।

ব্যক্তিগতভাবে আলোচনায় আমি অংশগ্রহণ না করলেও আমাদের জনতা পার্টির পক্ষ থেকে বিরোধীদলের নেতা দ্বর্থ্যহীন ভাষায় বলেছেন, আলোচনা আমরা নিশ্চয়ই চাই, আলোচনার প্রয়োজনীয়তা আমরা অস্বীকার করি না এবং কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক সম্বন্ধে শেষ কথা বলা হয়েছে, শেষ সংবিধান রচিত হয়ে হিয়েছে, এমন কথা নিশ্চয় আমি বলছি না। প্রয়োজন থাকলে নিঃসন্দেহে এ সম্পর্কে পূনর্বিন্যাস করতে হবে, প্রয়োজন থাকলে দেশের স্বার্থে নিঃসন্দেহে সংবিধানের পরিবর্তন করতে হবে। কিন্তু যখনই আমরা কোন কোন সংবিধান সংশোধন করতে যাব, নিঃসন্দেহে তৎকালীন কোনও সমস্যাকেই মনে রেখে সংবিধানের পরিবর্তন সাধন করতে আমরা অগ্রণী হব না। কারণ সমস্যা রাজ্য সরকারের কাছে আসবে, বিভিন্ন রকম সমস্যা আসবে। সমস্যার পরিপ্রেক্ষিতে দেশের স্থায়ী সংবিধানের যদি আমরা পরিবর্তন করতে চাই, নিঃসন্দেহে তার মধ্যে দিয়ে দেশের কল্যাণ হবে বলে মনে করি না। কিন্তু সে প্রসঙ্গ থাক। আজকে সেই প্রসঙ্গে কিছু কিছু বক্তব্য এখানে এসেছিল, আমি সে বক্তব্য শুনছিলাম। তখনি শুনেছি যে বিচ্ছিন্নতাবাদের অভিযোগ আপনাদের বিরুদ্ধে আনয়ন করা হচ্ছে, মাননীয় অধ্যক্ষ মহাশয়, মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী খুব জোরের সঙ্গে বলেছেন, বিচ্ছিন্নতাবাদের কোনও সমালোচনা তাদের বিরুদ্ধে আনবার কোন কারণ নেই। আমি নিঃসন্দেহে অনুভব করছি তাদের আলোচনা শুনে যে ভাষাকে এতকাল আমরা জানতাম ভাবের বাহন বলে।। কিন্তু ভাষা যে ভাবকে গোপন করবার জন্য মাঝে মাঝে ব্যবহৃত হতে পারে তার প্রমাণ সেদিন দেখছিলাম। সেই বিচ্ছিন্নতাবাদের যে সমালোচনা সেদিন হয়েছিল তার পুনরাবৃত্তি করব না। কিন্তু অবাক বিস্ময়ে শুনেছিলাম সোভিয়েত রাশিয়ার কথা, শুনছিলাম তার ফেডারেল স্ট্রাকচারের কথা, শুনছিলাম রাষ্ট্রের অন্তর্গত সমস্ত রাজ্যগুলো তাদের সমস্ত বিচ্ছিন্নতাবাদের অধিকার থাকলেও তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে, সানন্দে নিজেদের কল্যাণে রাশিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়ে আছে, তারা বিচ্ছিন্নতার অভিপ্রায় পরিত্যাগ করেও। সত্যি সত্যি আমার মনে হচ্ছিল তখন, আপনারা সব জেনেশুনেও এই সভাতে যে বক্তব্য রাখছেন, সে বক্তব্য সত্যি নয়। কারণ আপনারা নিশ্চয়ই জানেন, আমরা জানি আর আপনারা জানবেন না, সোভিয়েট রাশিয়ার এত ঘনিষ্ঠ হয়ে, একথা তো আমরা মনে করতে পারছি না, নিশ্চয়ই আপনারা জানেন, আজ সোভিয়েট রাশিয়ার বিভিন্ন রাজ্যে ফেডারেলি ঐক্যতান, নিঃসন্দেহে তাদের স্বতঃস্ফূর্ত, স্বাধীন বাদ্যযন্ত্রের আওয়াজে তৈয়ারি হয় না।

বরং ব্রজনেভ নামক বিভিন্ন ব্যান্ড মাস্টারের ইঙ্গিতে ভঙ্গিতে সেই ঐক্যতান পরিচালিত হয়ে থাকে। এটা আপনারা ভাল করেই জানেন যে বিচ্ছিন্নতার দাবি তোলবার অধিকার সেখানে কোনও রাজ্যগুলিকে দেওয়া হয়নি। সংবিধানে লেখা থাকে কথার কথা মাত্র, কার্যত কোনও অধিকার কোনও শক্তি কোনও রাজ্যের নেই। এখানে মাননীয় অধ্যক্ষ মহাশয়, আপনার কাছে বক্তব্য যে বিচ্ছিন্নতার অভিযোগ কেউ মাঝে মাঝে আনতে পারেন। মানসিকতার কথা বলুন আর যাই বলুন সেটাকে উড়িয়ে দেবার আপাতত কোনও কারণ নেই। যদিও এই অভিযোগ আমি আনবার চেষ্টা করছি না এবং আমার আলোচনাও সে প্রসঙ্গে নয়। আমি এ বিষয়ে অবতারণা করেছি যে অর্থনৈতিক দিক থেকে ব্যয় বরাদ্দের দাবির প্রেক্ষিতে আপনারা যে ৭৫% আর ২৫%-এ ফরমূলা এখানে দাবি করেছেন সেই ফরমূলা সম্বন্ধে আপনারা বলেছেন রাজ্যগুলিকে সমস্ত আয়ের ৭৫% দিয়ে কেবলমাত্র ২৫ ভাগ কেন্দ্রীয় সরকার নিয়ে যাবেন।

অথচ মুখ্যমন্ত্রী বলছেন যে তিনি চান না যে কেন্দ্র দুর্বল হোক। তিনি চান কেন্দ্র সবল হোক, রাজ্যগুলিকেও সবল হোক, উভয়েই সবল হোক। কিন্তু মাত্র ২৫% কেন্দ্রের হাতে তুলে দিয়ে ৭৫% টাকা আপনাদের হাতে রেখে আপনারা কোন সব কেন্দ্রের পরিকল্পনা এখানে দাবি করছেন তা আমি বুঝবার চেষ্টা করছি এবং এই যে ৭৫% ফরমুলা আপনারা দিচ্ছেন, এই ফরমুলা কি এবং তার নির্দিষ্ট পরিকল্পনা কি তা আপনারা কেউ এখানে রাখবার চেষ্টা করেন নি। ভিন্ন ভিন্ন রাজ্যের ৭৫% দায়ের অংশ কারা নেবেন এবং কেন্দ্রকে ২৫% যে দেবেন তাহলে আপনারা এইভাবে ভাবছেন কি যে ভারতবর্ষের সমস্ত রাজ্যগুলির যত উপার্জন কেন্দ্রের সামগ্রিক যেটা আয় তার ৭৫% বিভিন্ন রাজ্যের জন্য আর কেবলমাত্র ২৫% কেন্দ্র নেবেন। এই যদি আপনাদের পরিকল্পনা হয় তাহলে তখন প্রশ্ন জাগবে স্বাভাবিকভাবে এই ৭৫% সন্মিলিত উপার্জন বিভিন্ন রাজস্ব খাতে সরকার আপনাদের কাছ থেকে নেবেন এবং এই টাকা বিভিন্ন রাজ্যের মধ্যে বন্টন করা হবে কোন নীতিতে? কারণ আপনারা স্বীকার করেছেন যে ভিন্ন ভিন্ন রাজ্যের আর্থিক অবস্থা ভিন্ন ভিন্ন রকম। পশ্চিমবাংলার কিছু সামর্থ আছে এবং ৭৫% যদি আপনারা পান নিশ্চয় আপনারা পশ্চিমবাংলার উন্নতি করতে পারেন দ্রুত গতিতে। আপনাদের ভাবাদর্শ নিয়ে সারা পশ্চিমবাংলাকে গঠন করতে পারবেন। কিন্তু আপনাদের আর একটা রাজ্য ত্রিপুরা, তার ৭৫% কেন সমস্ত টাকা সেন্ট পারসেন্ট টাকা কেন্দ্র ছেড়ে দিতে প্রস্তুত আছে যদি কেন্দ্রকে ব্যয় ভার বহন করতে না হয় ত্রিপ্যরার উন্নতির জন্য। এতে আপনারা কি প্রস্তুত আছেন এমন একটা ব্যবস্থা গ্রহণ করতে যেখানে জানেন না ত্রিপুরার জন্য কেন্দ্রকে কত ব্যয় করতে হয়। বিভিন্ন রাজ্যের সমস্ত সঙ্গতির কথা বিবেচনা করে আজকে আপনাদের কল্যাণের জন্য আপনারা চাইছেন। মুখ্যমন্ত্রী সেদিন বলবার চেষ্টা করেছিলেন যে আমরা সমস্ত রাজ্য অনগ্রসর রাজ্যগুলির উন্নতির জন্য পারস্পরিক সহযোগিতার একটা ক্ষেত্র প্রস্তুত করব—আমাদের কিছু অর্থ তাদের দিয়ে তাদের উন্নতির জন্য চেষ্টা করব অর্থাৎ আমরা কিছু ত্যাগ করব—সেই ভারতবাসী মার্কসিস্ট হয়ে স্মরণ করব তেন ত্যক্তেন ভুঞ্জীথা —তা করুন। যদি এত ত্যাগ করবার মতো সঙ্গতি আপনাদের থাকে ৭৫% পেয়েও তাহলে ওই সীমাবদ্ধতার আওয়াজ মাঝে মাঝে তুলে সমস্ত দায় দায়িত্ব কেন্দ্রের হাতে ন্যাস্ত করে নিজেদের অক্ষমতা ঢাকবার চেষ্টা করছেন কেন? এই প্রশ্ন নিশ্চয় আমরা আপনাদের কাছে আনতে পারি।

আমাদের মুখ্যমন্ত্রী বেতার মন্ত্রীও বটে এবং আজকে বিধানসভায় সবাই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা যা হল তাতে বর্তমানকালে যদি কিছু থাকে তাহলে বিদ্যুৎ এবং এটাকে পাওয়ার বলা হয়েছে এবং এটা সঙ্গতিপূর্ণ। একটা রাষ্ট্র একটা সমাজের অর্থনৈতিক এবং সামাজিক উন্নতির জন্য বিদ্যুৎ যেভাবে প্রযুক্ত হয় তাকে পাওয়ারই বলা উচিত। সমস্ত অর্থনৈতিক শক্তিটা আজকে মূলত ঐ পাওয়ারের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু যে ইলেকট্রিসিটি আমাদের মুখ্যমন্ত্রীর নিজের দপ্তর তার হালটা আজকে কেমন তা একটু ভাববার চেষ্টা করেছি। আমরা সেটা বুঝবার চেষ্টা করছি এবং ওরাও বোঝেন। কিন্তু নিজের দলের কথা তো নিজেদের বলতে নেই কাজেই ওরা বলতে চাইছেন না।

সমস্ত পশ্চিমবাংলায় আজকে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি যে অবস্থায় দাঁড়িয়েছে, তাতে দেখছি, শোচনীয় লোডশেডিং হচ্ছে যেটা কলকাতার ইতিপূর্বে কখনও হয়নি। আমরা কংগ্রেস সরকারের বিদ্যুৎ মন্ত্রীর সমালোচনা করেছি, আপনারাও করেছেন, আমরা বার বার তাঁকে অভিযুক্ত করেছি, কারণ তিনি অভিযুক্ত হবার মতোই কাজ করেছেন। কিন্তু শক্তিমান জ্যোতিবাবুর সঙ্গে যদি তুলনামূলকভাবে বিচার করি, তাহলে দেখব—তদানীন্তন বিদ্যুৎ মন্ত্রী তাঁর চেয়ে বেশি দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। আজকে নিঃসন্দেহে এই কথাটা আপনাদের স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। মাননীয় অধ্যক্ষ মহাশয়, আমার ঐ পক্ষের বন্ধুরা সত্য কথা শুনলে সন্তুষ্ট হন না, কারণ তাঁদের সত্যের সাথে সম্পর্ক নেই, তাঁরা মিথ্যার বেসাতি করেন। আমাদের মুখ্যমন্ত্রী যিনি বিদ্যুৎ মন্ত্রীও বটে, তিনি বেঙ্গল চেম্বার অব কমার্সে বক্তৃতা করতে গিয়ে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ভয় নেই, এখন লোডশেডিং চলছে, অর্থাৎ শীতকালে লোডশেডিং হচ্ছে, কিন্তু আগামী গ্রীষ্মকালে লোডশেডিং হবে না, বিদ্যুৎ ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটবে। কিন্তু কেমন করে আগামী সেটা ঘটছে তাঁর বাজেট বক্তৃতার মধ্যে আমি তা দেখতে পাইনি। আমাদের একথা কি বিশ্বাস করতে হবে শীতকালে যখন বিদ্যুতের চাহিদা কম, তখন বিদ্যুৎ সরবরাহ করা গেল না, লোডশেডিং চলল দিনের পর দিন সমস্ত পশ্চিম বাংলা অন্ধকারে রয়ে গেল, আর গ্রীষ্মকালে যখন বিদ্যুতের চাহিদা স্বভাবতই বাড়বে তখন লোডশেডিং হবে না, সব আলো হয়ে যাবে, জ্যোতিবাবুর জ্যোতিতে সব আলোকিত হবে? উনি কি করে আমাদের বিশ্বাস করতে বলছেন? আজকে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ করছেন, কিন্তু ইদানিংকালে কেন্দ্রের কাছ থেকে ৮ কোটি টাকা এনে কাকে দিয়েছেন? দিয়েছেন একটি বিলাতি কোম্পানিকে, যে বিলাতি কোম্পানির বিরুদ্ধে নিন্দা একদিন জ্যোতিবাবুর কণ্ঠেও ধ্বনিত হয়েছিল, তাদের ৮ কোটি টাকা কেন্দ্রের কাছ থেকে এনে দিয়েছেন এবং বলেছেন তোমরা স্থায়ী হও শক্তিশালী হও, এই বিদেশি বিদ্যুৎ কোম্পানি, আমাদের দেশ লুণ্ঠন কর। অথচ আপনারা লক্ষ্য করে দেখুন এই বিদ্যুৎ কোম্পানি আজকে ডি.ভি.সি.-এর কাছ থেকে আট পয়সা ইউনিট কেনেন এবং কলকাতার মানুষকে অনেক বেশি পয়সায় সেই ইউনিট সরবরাহ করে। আশ্চর্যের ব্যাপার এই বিরাট কোম্পানিকে মুনাফা করবার জন্য সাহায্য করছেন এই সরকার।

মাননীয় অধ্যক্ষ মহাশয়, আপনি জানেন আগে বিদ্যুতের বিল আসত মিটার স্টাডি করে, কিন্তু আজকে আর মিটার স্টাডি হয়না। এর ফলে প্রতি মাসে মানুষকে বেশি করে বিলের টাকা দিতে হয় এবং কখনও উদ্ভট বিল গৃহস্থকে দিতে হয়। এক্ষেত্রে কমপ্লেন করবার কোনও উপায় নেই, কারণ সময়মতো টাকা না দিলে কোম্পানি লাইন কেটে দেবে। এই যে বেশি টাকা দিতে হচ্ছে, এটা কিন্তু কমপ্লেন করে বা মামলা করে উদ্ধার করা যায় না। স্যার আজকে আমাদের এই অবস্থা চলছে। সরকারি বন্ধুরা ব্যঙ্গ করছেন, কিন্তু রাইটারস্‌ বিল্ডিংস-এ তাদের বিদ্যুৎ বিভাগ কি করছে? আজকে রাইটারস্‌ বিল্ডিং থেকে বিবৃতি বেরুচ্ছে, সেখানে অব্যবস্থা চলছে, সেখানে বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্পূর্ণভাবে বিপর্যস্ত। তারা বলছে একটি যন্ত্রকে কোনও মতে চালু করা যায়, পরক্ষণে দেখা যায় পাঁচটি ইউনিট বিকল হয়ে গেল। এটা কেন হল সেটা কিন্তু রাইটারস্‌ বিল্ডিং-এর কর্মকর্তারা বুঝতে পারছেন না। মাঝে মাঝে জ্যোতিবাবুকে স্যাবোটেজের কথা বলতে হচ্ছে, পুলিশ পাঠাতে হচ্ছে। কিন্তু আসলে তিনি যোগ্যতার পরিচয় দিতে পারেননি। তিনি যোগ্য ব্যক্তি, শক্তিমান ব্যক্তি নিঃসন্দেহে। কিন্তু আমার মাঝে মাঝে মনে হয় মুখ্যমন্ত্রী একাধিক দপ্তর নিজের হাতে না রেখে, নিজেকে সমৃদ্ধ না করে, কিছু কিছু দপ্তর অন্যের হাতে বিলি করে অন্য ব্যবস্থা করে যদি দায়িত্ব মুক্ত হতেন তাহলেই ভাল করতেন।

………….. মাননীয় অধ্যক্ষ মহাশয়, এই প্রসঙ্গে পরিবহন দপ্তর সম্পর্কে কিছু বক্তব্য রাখতে চাইব। কারণ মাননীয় পরিবহনমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় বলেছিলেন আজকের দিনে পরিবহন ব্যবস্থার তিনি অনেক উন্নতি করেছেন—অনেক বেশি বাস, ট্রাম তিনি রাস্তায় ছেড়েছেন, যানবাহনের ব্যবস্থা করেছেন, মানুষের দুর্গতি অনেক কমিয়েছেন। আর সেই কৃতিত্বের দাবি করে তিনি তার ব্যয় বরাদ্দের দাবির সময়ে বড় অঙ্কের দাবি রেখেছিলেন, আর অতিরিক্ত বাজেটের মধ্যেও তারজন্য কিছু অঙ্ক আছে। যেহেতু অনেক বাস, ট্রাম তৈরি করেছেন সেইহেতু এই অতিরিক্ত বাজেটের মধ্যে দেখছি বাসের জন্য তিনি গ্যারেজের কথা ভাবছেন। কারণ অনেক বাস যখন হয়েছে তখন গ্যারেজের প্রয়োজন। আমি মাননীয় পরিবহন মন্ত্রী মহোদয়কে কিংবা মাননীয় অধ্যক্ষ মহাশয়কে কিংবা সরকার পক্ষের যে কোন মাননীয় সদস্যকে অনুরোধ করব, দয়া করে শীততাপনিয়ন্ত্রিত কক্ষের বাইরে একটু বাসযাত্রী হয়ে দাঁড়াবেন এবং সেখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখবেন, বাস, ট্রাম কেমন চলছে। আমি অনুরোধ করব, অফিস টাইমে অন্তত হাওড়া স্টেশনে গিয়ে কোনও মাননীয় সদস্য দাঁড়িয়ে দেখবেন, বাস আছে কিনা, চলে কিনা, কতক্ষণ অন্তর অন্তর বাস চলে। স্যার এরা তো গরিবের কথা বলছেন, সাধারণ মানুষের কথা বলছেন—বাজেট বক্তৃতার সময় খুব গুরুগম্ভীর কণ্ঠে বলেছিলেন, তাদের বাজেটের উদ্দেশ্য সাধারণ মানুষের উন্নতি করা, তাদের সেবা করা, কল্যাণ করা। কিন্তু বাস যে কয়েকটা বাজারে চলে, রাস্তায় নামে তা কোন ধরনের বাস? আজকে একের পর এক ডিল্যুক্স বাসের আমদানি হচ্ছে। কিন্তু যেহেতু চেহারাটা ডিল্যুস্ক বাসের মতো নয় সেইজন্য নিজেরাই লজ্জা পেয়ে বর্তমানে তার নাম দিয়েছেন স্পেশাল। দামেও স্পেশাল এবং বাসগুলি সবদিক থেকেই স্পেশাল। সেখানে অনেক বেশি ভাড়া দিয়ে যাত্রীদের যেতে হয়। এখন আবার সিটের নতুন পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে দেখলাম। আগে দুজন দুজন করে ৪ জন বসত, এখন তিন জন আর দুজন করে সিটের ব্যবস্থা করে ৫ জনের বসবার ব্যবস্থা করা হয়েছে। মুনাফা বেশি হবে কিন্তু যাত্রীরা কি ভাবে যাবেন, ঐ অনেক বেশি ভাড়া দিয়ে বাসে কি করে তারা চলবেন তার কথা ওঁরা ভাবেন না। তারপর আজকে কলকাতা শহরে যত বাস চলে তার অধিকাংশই হচ্ছে ‘এল’ মার্কা বাস, যার ভাড়া কিছু বেশি। লিমিটেড স্টপ কিন্তু কার্যত আনিলিমিটেড স্টপ। সেখানে বেশি ভাড়া দিয়ে যাত্রীদের নিয়ে গিয়ে বেশি মুনাফা করবার জন্য আমাদের বামফ্রন্ট সরকারের মাননীয় পরিবহন মন্ত্রী শোষিত মেহনতি মানুষদের দরদে উদ্বেল হয়ে এই কাজ করেছেন। কাজেই ডিল্যুক্স চলবে, ‘এল’ মার্কা বাস চলবে কিন্তু সাধারণ বাস তা কোথাও পাওয়া যাবে না অথচ তিনি বলছেন, বাস অনেক বেশি দিয়েছেন এবং তার জন্য গ্যারেজ দরকার। কিন্তু সেখানে গ্যারেজগুলিতে একের পর এক কত চুরি, কত কেলেঙ্কারি হচ্ছে, সমস্ত পরিবহনের টাকা কি ভাবে নষ্ট হচ্ছে তা অতীতের মন্ত্রীরা দেখেন নি, আজকের মন্ত্রীরা দেখছেন এমন কোনও কথা তার বক্তব্যের মধ্যে দেখতে পাচ্ছি না। তিনি সেগুলি করার চেষ্টা করবেন। ইউনিয়নের শক্তির দ্বারা নিজেদের শক্তিকে বর্দ্ধিত করবার জন্য—এই ন্যায় নীতির পথটা পরিত্যাগ করলে আর যাই হোক নিজেদের সরকারকে কল্যাণ সরকার বলবার কোনও চেষ্টা করতে পারবেন না। কাজেই আশা করব, মাননীয় পরিবহন মন্ত্রী মহাশয় এই দিকে দৃষ্টি দেবার চেষ্টা করবেন।

আজকে বেকার ভাতা দিচ্ছেন। যখন বেকার ভাতার কথা বলেছিলেন তখন আমি আপনাদের স্বাগত জানিয়েছিলাম। আমি সেই দলের কথা বলি না, আমি সেই দলে নিশ্চয় ছিলাম না যারা আপনাদের সমালোচনা করেছেন যে আপনারা দলীয় কর্মীদের মুনাফা লুঠিয়ে দেবার জন্য, কিছু টাকা দিয়ে দলীয় কর্মীদের পোষণ করবার জন্য করেছেন আমি কিন্তু এই দাবি করি নি। আমি কিন্তু এই সমস্ত প্রস্তাবটিকেই স্বাগত জানিয়েছিলাম। হ্যাঁ, বেকারদের কিছু ভাতা আপনারা দিচ্ছেন তারজন্য নিঃসন্দেহে আপনারা প্রশংসার্হ—আপনাদের আমি প্রশংসা করি। যদি ন্যূনতম সাধারণ কৃতিত্বের স্বাক্ষর আপনারা রাখেন নি। আপনাদের পূর্বে মহারাষ্ট্র দিয়েছে, পাঞ্জাব দিয়েছে এবং তা আপনারা দেখেছেন। তবুও আপনারা দিয়েছেন আপনাদের কৃতিত্বকে ম্লান করতে চাই না তুলনামূলক আলোচনার সুযোগ দিয়ে। আমিও আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি। এতদিন বাদে হঠাৎ লক্ষ্য করলাম বেকারদের তালিকা তৈরি করার জন্য একটা কমিটি তৈরি করেছেন। হঠাৎ লক্ষ্য করলাম বেকারদের এমপ্লয়পেন্ট এক্সচেঞ্জ জোনে বিভক্ত করে প্রত্যেক এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ জোনের জন্য ৯ জনের একটি সিলেকসন কমিটি তৈরি করেছেন। সেই কমিটির মধ্যে ২ জন থাকবেন সরকারি প্রতিনিধি, আর ৫ জন থাকবেন আপনাদের প্রতিনিধি, আর ২ জন থাকবেন বিরোধী দলের প্রতিনিধি। ওখানে আরও লেখা আছে যদি কোন বিরোধী দলের কোনও এম.এল.এ. না থাকলেও ক্ষতি নেই। কিন্তু যেখানে যেখানে বিরোধী দলেরও নেই, সেখানে আমরা এই কমিটিতে স্থান পাব না। অর্থাৎ প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে আপনাদেরই ৯ জন হচ্ছে। আপনারাই বেকারদের সিলেকশন করবেন। আশা নয়, আশঙ্কা করা সঙ্গত যে সুবিচার আপনারা করবেন না। আপনাদের দলীয় বেকারদের সকলকে ভাতা দেবার ব্যবস্থা করবেন। অন্য দলের কর্মীদের বেকার জেনেও এই সুযোগ থেকে বঞ্চিত করবেন আমন আশঙ্কা করা অমূলক নয়। সঙ্গে সঙ্গে আর একটা কথা আপনাদের বলতে চাই। আপনারা অহেতুক টাকা দিতে চান না। আপনাদের বেকার ভাতার পরিকল্পনার মধ্যে ঘোষণা করেছিলেন যে কিছু কিছু কাজ করতে হবে। কিন্তু কি কাজ, কোনও ধরনের কাজ, কবে থেকে কাজ শুরু করবেন, সেই কাজের কোনও প্রকল্প নেই। কিন্তু কাজের বিনিময়ে তাদের টাকা দেবেন বলেছেন। আপনারা তালিকা প্রস্তুত করার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। এই তালিকার প্রতি অন্য দৃষ্টি দিয়ে যদি কোনও দুর্জন দেখতে চান তাহলে নিশ্চয়ই তাকে খুব দোষারোপ করা যাবে না। আর বেকারদের ভাতাটাই বড় কথা নয়। বেকার ভাতা একটা সাময়িক সাহায্য মাত্র। তাদের কর্মসংস্থানের প্রকল্প কোথায়? বেকার ভাতা দিয়ে ভিখিরিতে পরিণত করবেন বাংলা দেশের যুবক-যুবতীদের, এটা নিশ্চয়ই আপনাদের কাম্য নয়, আমাদেরও কাম্য নয়। কতকগুলি অক্ষম মানুষকে, নিষ্কর্ম বেকার ভাতা দিয়ে, দয়া করে দেশের যুব শক্তিকে নষ্ট করতে নিশ্চয়ই আপনারা চান না। আপনাদের নিশ্চয়ই তাদের ভবিষ্যতে কর্মসংস্থান দিয়ে সম্মানের সঙ্গে, পরিশ্রমের মাধ্যমে তাদের নিজেদের জীবিকা অর্জনের সুযোগ দেবেন। কিন্তু সেই পরিকল্পনা কোথায়? কোথায় সেই জব ওরিয়েন্টেড স্কীম—যে স্কীমের মধ্যে দিয়ে আপনারা নূতন নূতন কর্মসংস্থান তৈরি করবেন এবং তার মধ্যে দিয়ে এই বেকারদের পুরোপুরি চাকুরি দেবার ব্যবস্থা করবেন, তাদের উপার্জনের ব্যবস্থা করবেন? তেমন কোনও স্কীম মাননীয় অর্থমন্ত্রী মহাশয়ও দাখিল করতে পারেন নি এবং শ্রমমন্ত্রী মহাশয়ও দাখিল করতে পারেন নি। শুধু বেকার ভাতা দিচ্ছেন এবং সেই বেকার ভাতার যে কমিটি, সেই কমিটির মধ্যে দিয়ে আপনাদের দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির দ্বারা পরিচালিত হবেন, দলীয় কর্মীদের পোষণ করবেন—এই আশঙ্কা করার স্বাভাবিক ও সমীচীন।

মাননীয় অধ্যক্ষ মহাশয়, এতক্ষণে এদের বোঝা যাচ্ছে, এদের প্রতিক্রিয়া দেখে। এরা দলবাজি কথাটা বললেই আতঙ্কিত, ক্রদ্ধ এবং সমালোচনায় মুখর হয়ে উঠেন। দলবাজি কথাটা শুনলেই মাঝে মাঝে কোনও কোনও বন্ধু এমন নিরীহ মুখভার করেন যে এদের এই বিস্মিত বিহ্বল মুখভাব দেখে মনে হয় এরা বিস্মিত হয়ে কোন নূতন তাজমহল দেখছেন। দলবাজি এমন কাজ তো আমরা করি না। কিন্তু এরা করেন কি না তার প্রমাণ দেবার জন্য সরকারের কিছু কিছু ঘোষণা পত্র, দলিল উত্থাপন করতে চাইছি। মাননীয় অধ্যক্ষ মহাশয়, আমি আপনার কাছে বলতে চাই যে, এরা কেবলমাত্র বেকার ভাতা কমিটির মাধ্যমে এই কাজ করেন নি, তারা আজকে সমস্ত স্থানে এই দলবাজির নির্লজ্জ দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চাচ্ছেন। আমি তার জন্য আপনার কাছে কতকগুলি দলিল উত্থাপন করতে চাচ্ছি।

মেদিনীপুর জেলার শিক্ষা উপদেষ্টা কমিটি গঠিত হয়েছে, আপনি জানেন স্কুল বোর্ডে সুপারসিডেড—মাননীয় পার্থবাবু আছেন, তিনি একাবারে মহাভারতের পার্থ ধনুর্ধরের মতো মাঝে মাঝে মরণ বাণ ছুঁড়ে এক একটা প্রতিষ্ঠানকে শেষ করে দিচ্ছেন—সেই পার্থবাবু অ্যাডভাইসারি বোর্ড তৈরি করেছেন। আমি আপনার কাছে এখানে কেবলমাত্র মেদিনীপুর জেলার শিক্ষা উপদেষ্টা কমিটির চিত্রটা দেখাতে চাইছি, তার মধ্যে আছেন ২১ জন সদস্য এবং সেই ২১ জন সদস্যের মধ্যে একজন মাত্র জনতা পার্টির সদস্য। অথচ তাদের বক্তব্য দলবাজির ঘটনা এখানে কোথায়। কোথায় দলবাজি? একদিকে বলবেন জনতা বন্ধু, আবেদন করবেন জনতার কাছে, অপর দিকে বলবেন জনতার সমালোচনা চাই, আবার অন্য দিকে বলবেন যে, আপনারা দলবাজি করেন না। একটি জেলায় শিক্ষা কমিটি করবেন যেখানে ৩০ জন এম.এল.-এর মধ্যে ১৭ জন জনতা পার্টির, আর আপনাদের ১৩ জন, আপনারা মাইনোরিটি। তবু সেখানে কমিটিতে জনতা পার্টির একজন প্রতিনিধিকে নিয়েছেন, আর আপনাদের বেশি নিয়েছেন। এর পরও বলবেন দলবাজি নেই, দলবাজি করছেন না? এই রকম বহু স্থানে করেছেন। মাননীয় উচ্চ শিক্ষামন্ত্রী শম্ভুবাবু এখানে উপস্থিত নেই, তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় অধিগ্রহণ করেছেন এবং তার যে কমিটি করেছেন তাতে এক জন জনতার লোক রেখেছেন। আর ক-জন তাঁদের লোক রেখেছেন? দলবাজি করেননি? দলবাজি করেছেন। মাননীয় প্রশান্তবাবু এখানে নেই, তবুও তাঁর কাছে আমার বলবার কথা হচ্ছে তিনি কলকাতা কর্পোরেশনের সমস্ত ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে উপদেষ্টা কমিটি করেছেন, ওয়ার্ড কমিটি, সেই ওয়ার্ড কমিটিতে জনতার মাত্র দু’জনকে নিয়েছেন, বাকি সব তাঁদের দলের। কিন্তু প্রশ্নটা তাঁর কাছে আবার আমি রাখছি যে ওঁরা তো বলেন ওঁরা দলবাজি করেন না, তাহলে এটা কি হচ্ছে? ………

…………… এখানে ওঁরা যাদের বিরুদ্ধে বারবার বিষোদগার করেন সেই জনতা পার্টির কেন্দ্রীয় সরকার কি ভাবে কমিটি গঠন করেন, তার চিত্র তুলে ধরবার চেষ্টা করছি। মাননীয় অধ্যক্ষ মহাশয়, সরকারের সেই কমিটির মধ্যে ৭০ জন সদস্য আছেন এবং তারমধ্যে ৪০—জনেরও বেশি আপনারা আছেন। লোকসভায়, রাজ্যসভায় আমাদের সি.পি.এম.-এর স্থান কি, তা আপনারা জানেন।। তবুও তাঁদের ৭জন কে ৭ জন সি.পি.এম. সদস্যকে সেখানে সদস্য করা হয়েছে, এ’ সামান্য শক্তি সত্বেও। কিন্তু জনতার সেখানে মাত্র ৩০ জন সদস্য রাখা হয়েছে। এই কমিটির লিস্ট যদি চান তাহলে সেটাও আমি দিতে পারি দেখে নিতে পারেন, ছাপানো লিস্ট আছে। তাঁরা দলের ঊর্দ্ধে উঠে কমিটি তৈরি করেন, দলের ঊর্দ্ধে উঠে জাতীয়তাবাদী দৃষ্টি দিয়ে বলেন, সকলের প্রতি সমান বিচার করেন। ভারতবর্ষের স্বাধীনতা এবং গণতন্ত্র রক্ষার জন্য জনতা পার্টি যে সংগ্রাম করেছে, সেই সংগ্রামের ফলশ্রুতি রূপে আজ যে স্বাধীনতা, ব্যক্তি স্বাধীনতা আমরা পেয়েছি তার মর্যাদা, সমস্ত দলের সমান মর্যাদার দৃষ্টিভঙ্গিকে জনতা পার্টি তার কমিটি ফরমেশনের মধ্যে দিয়ে প্রতিফলিত করেছে। আর আপনারা দলবাজি কথাটা শুনলেই চমকে উঠছেন ক্রুদ্ধ হচ্ছেন, আমাদের কণ্ঠ রুদ্ধ করার চেষ্টা করছেন।

আপনারা ৩০ জন এম.এল.এ.-র মধ্যে যেখানে আপনাদের ১৩ জন, আর জনতা পার্টির ১৭ জন সেখানে তাঁদের একজনকে নিয়েছেন, বাকি সব নিজেদের দল দিয়ে ভর্তি করে রেখেছেন। কাঁথি লোকসভা কেন্দ্রের মধ্যে ৮টি বিধানসভা আসন এবং সেই ৮টি আসনই জনতা পার্টি লাভ করেছে। কিন্তু সেই কাঁথি থেকে এই স্কুল কমিটিতে যখন প্রতিনিধি নিয়েছেন তখন কিন্তু তাঁদের একজনকেও নেননি, অন্য দলের লোকেদের নিয়েছেন। আটটি আসনের আট জন এম.এল.এ. তবুও তাঁদের মধ্যে থেকে প্রতিনিধি নেবার আবশ্যকতা আপনাদের প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে স্থান পাননি। সুতরাং আপনারা কি দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির দ্বারা পরিচালিত হচ্ছেন না? শিক্ষা সম্পর্কে আমি দু-একটি কথা বলবার চেষ্টা করব। আপনারা একের পর এক পরিচালন সমিতি অবৈধ ঘোষণা করে অ্যাডমিনিস্ট্রেটর বসিয়ে দিয়েছেন। অবশ্য আমি একথা বলছি না যে আপনারা অ্যাডমিনিস্ট্রেটর বসাতে পারেন না, আমি একথা বলছি না সব কমিটিই সঙ্গত এবং বৈধ। আপনারা দলবাজি যে চূড়ান্ত করেছেন সেই প্রসঙ্গে কয়েকটি দৃষ্টান্ত রাখব। মধ্য কলকাতা বালিকা বিদ্যালয়ে নির্বাচন হয়েছে। সেই নির্বাচনে আমাদের বামপন্থী বন্ধুরা, সি.পি.এমের বন্ধুরা অংশ গ্রহণ করেছেন, নির্বাচনী লড়াই করেছেন যেন একটা গোটা রাজ্যে নির্বাচন হচ্ছে এইরকম ঠমকে ঠমকে করেছেন। ফল বেরুলো যখন তখন দেখা গেল সি.পি.এমের কোনও প্রার্থী জয়ী হননি। মধ্য কলকাতা বালিকা বিদ্যালয়ের নির্বাচনে যখন সমস্ত সি.পি.এম. প্রার্থীরা পরাজিত হলেন—নির্বাচনের আগে কিছুই বোঝেন নি—পরাজিত হবার পর মুহূর্তেই আবিষ্কার করলেন যে তাতে মেম্বারস ঠিক ছিল না, ভোটার তালিকা ঠিক ছিল না অতএব কমিটি বাতিল, অ্যাডমিনিস্ট্রেটর বসিয়ে দিলেন পার্থবাবু। মৃত্যবাণ বর্ষিত হল। বসল কমিটি। এইভাবে একের পর এক এই জিনিস ঘটছে। বলতে পারেন এর দ্বারা কি দেশে সুস্থ রাজনীতির পরিবেশ প্রস্তুত করবেন? শিক্ষা ক্ষেত্রে আপনারা দলবাজি করছেন না?

উদ্বাস্তু সমস্যা নিয়ে কিছু বক্তব্য রাখব। কারণ এখানে সরকার পক্ষের মাননীয় সদস্য লোকসভার জনতা সরকারের পুনর্বাসন মন্ত্রীর একটা বক্তব্য নিয়ে বিষোদগার করবার চেষ্টা করেছেন এবং কেউ কেউ মন্তব্য ছুঁড়ে দিয়েছেন যে আপনারা উদ্বাস্তুর কথা বলেন নি, কেন আপনারা চুপ করে আছেন? কিন্তু আমি বলব যে আমরা চুপ করে নেই। প্রয়োজন হলে কেন্দ্রের উদ্বাস্তু সমস্যা সমাধানের যিনি মন্ত্রী আছেন—তিনি জনতা দলের মন্ত্রী হলেও তার অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার মতো সাহস আমাদের আছে। এটা আপনারা দয়া করে দেখবেন। কিন্তু আপনারা কি করেছেন? এখানে যখন পুনর্বাসন দপ্তরের আলোচনা প্রসঙ্গ, ব্যয় বরাদ্দ প্রসঙ্গে দণ্ডকারণ্য সম্বন্ধে, উদ্বাস্তু সম্বন্ধে, হাসনাবাদের হাজার হাজার দুর্গত মানুষের সম্বন্ধে আমি বক্তব্য রেখেছিলাম তখন আমার বন্ধু মাননীয় মন্ত্রী শ্রীরাধিকারঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয় আমার অনুপস্থিতিতে বলেছিলেন যে আমি নাকি অসত্য ভাষণ দিয়েছি এবং আমার মতো বর্ষীয়ান ব্যক্তির অসত্য ভাষণে উনি স্তম্ভিত। কিন্তু আমি ততোধিক স্তম্ভিত তাঁর অসত্য ভাষণ শুনে। কারণ হাসনাবাদে মন্ত্রী দেখেন নি, আমরা যে সংখ্যক উদ্বাস্তু দেখেছিলাম তার চেয়ে অনেক বেশি সংখ্যক উদ্বাস্তু সেখানে অমানুষের মতো জীবন-যাপন করছে।

আমি এই বিষয়ে বলছিলাম, উনি বলেছেন ভারত সেবাশ্রম সংঘের সন্ন্যাসীকে আমি বলিনি, ভারত সেবাশ্রমের সন্ন্যাসী স্বামী বিজয়ানন্দকে মাননীয় অধ্যক্ষ মহাশয়, আপনি টেলিফোন করতে পারেন, যে কোনও মন্ত্রীই টেলিফোন করতে পারেন, আমি তাঁকে অনুরোধ করেছিলাম কি না ওদের সাহায্য পাঠাইবার জন্য? ঘটনাটা সত্য না মিথ্যা এবং মাননীয় মন্ত্রী মহাশয় সত্য কথা বলেছেন না মন্ত্রীত্বের মর্যাদা লঙ্ঘন করেছেন এটা আমি বলতে চাই। এক বন্ধু প্রশ্ন করলেন ওরা এল কেন? সে কথার জবাবদিহি করবেন জনতা-ওঁরা করবেন না? ওদের অনুপ্রাণিত করেছেন মনে নেই, মন্ত্রীর গদিতে বসলেই পূর্বেকার কথাগুলি বিস্মৃত হতে হয়? আপনারাই তো একদা উদ্বাস্তুদের সামনে গিয়ে তাদের চোখে রঙিন স্বপ্ন তুলে ধরেছিলেন। তখন কংগ্রেস সরকার ছিলেন, তখন ওঁরা বিরোধীদলে বসে কথা বলতেন, আজকে সরকারি দলে বসছেন তাই কথা বলবেন না। গুলজারিলাল নন্দ তখন হোম মনিস্টার, সীমান্ত গোলাযোগের ব্যাপারে একবার তিনি এসেছিলেন। কথা প্রসঙ্গে আলোচনার সময়ে বলেছিলেন “আপনি হরিপদবাবু ভুলে যাবেন না আমিও একজন উদ্বাস্তু, পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ভিটেমাটি ছেড়ে দিল্লিতে এসেছি।” আমি তাঁকে বলেছিলাম আপনি কুটির ছেড়ে দিল্লিতে প্রাসাদ লাভ করেছেন। আমি কিন্তু তাদের কথা বলছি যারা প্রাসাদ ছেড়ে আজকে কুটির লাভ করেছেন। আপনি মন্ত্রিত্ব পেয়েছেন আর যারা কিছুই পায়নি, আমি তাদের কথা বলছি।

আমার বক্তব্য এই নয় যে সমস্ত উদ্বাস্তুদের নিয়ে এসে পশ্চিমবাংলায় পুনর্বাসন দেবেন—আমি একথা বলিনি। একথা বলেছি কিনা মাননীয় মন্ত্রী মহাশয় টেপ রেকর্ড পরীক্ষা করে দেখতে পারেন। আমি একথা বলিনি। এ প্রসঙ্গে আমি বলেছি সরকারি বিভাগের মানবতার মন্ত্র উচ্চারণ করে –এই সমস্ত উদ্বাস্তুকে পুনর্বাসন দিতে পারবেন কি পারবেন না অন্য কথা, বাইরে পাঠাবেন কি পাঠাবেন না ভিন্ন কথা, কিন্তু দুঃখের ভিতর দাঁড়িয়ে হাজার হাজার মানুষ এতটুকু ওষুধ পাচ্ছে না, জল পাচ্ছে না, খাদ্য পাচ্ছে না, অসুখ হলে হাসপাতালে স্থান পাচ্ছে না, বিনা চিকিৎসায় মরছে দিনের পর দিন, এই অবস্থা চলছে। আপনারা দেখছেন, কিছু বলছেন না। আপনারা ছুটে গেছেন দণ্ডকারণ্যে, ওদের বোঝাতে যে তোমরা এসোনা, আর সব দায়িত্ব কেন্দ্রের? কেন্দ্রের দায়িত্ব আছে কিন্তু আপনারা কিছুই করবেন না? এতগুলি মানুষ মরে যাচ্ছে—জল দিতে পারি কিনা, ওষুধ দিতে পারি কিনা, নিরাপত্তার কিছু ব্যবস্থা করতে পারি কিনা এসব কোনও দায়িত্বই কি আপনাদের নেই, এই দায়িত্ব পালন না করে অপরের উপর বিষোদ্‌গার করছেন? আমি মাননীয় মন্ত্রী মহাশয়কে বলেছি ইতিহাসের চাকা ঘোরে, উপরে থাকলে চিরকাল উপরে থাকা যায় না। আবার হয়ত একদিন বিরোধীদলে বসে ওদের কথা বলতে হবে, তখন আপনাদের গলার সুর যেন বেসুরো না ঠেকে এই কথাই আমি বলছি।

আপনাদের কাছে আমার শেষ বক্তব্য পুলিশ বিভাগ সম্বন্ধে। পুলিশ বিভাগের মাননীয় পুলিশ মন্ত্রী তথা মুখ্যমন্ত্রী মহাশয়ের বাজেটকে দেখছি অন্যভাবে—তিনি কিছু বেশি অর্থ বরাদ্দ করেছেন। পুলিশকে সুযোগ-সুবিধা দেবার কথা ভেবেছেন, তাদের চাকরির উন্নতির কথা ভেবেছেন, আমি তাতে বাধা সৃষ্টি করব না, প্রতিবাদ করব না, তারাও দেশের মানুষ। তাদের মধ্যেও দেশভক্ত মানুষ আছে। তাদের চাকরির উন্নতি হবে, তারাও দৃঢ়তা, দক্ষতার এই দেশের মানুষের সেবা করতে পারেন। বাজেট বরাদ্দে বেশি দেখে প্রতিবাদ করছি, করছি এই জন্য যে মুখ্যমন্ত্রী মহাশয় আমাদের কাছে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন দুর্নীতি দূর করবেন, পুলিশের মধ্যে প্রশাসনিক নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনবেন। তিনি বলেছিলেন সন্ত্রাসের রাজত্বের অবসান ঘটাবেন। আমিও আজকে পুলিশের দক্ষতা, নিরাপত্তা ও প্রশাসন সম্বন্ধে মানবিক দৃষ্টান্ত তুলে ধরব তাহলে আপনারা দেখতে পাবেন—আমি কিছু বলব না। প্রথম ঘটনা আমার এলাকা জোড়াবাগানের ঘটনা।

আপনি জানেন জীবনের কথা নয়, মরণের পর দাহ করবার জন্য নিমতলা শ্মশান আছে। সেখানে যারা দাহ করতে যায় তারা কিভাবে সমাজ বিরোধীদের দ্বারা দিনের দিনের পর দিন লাঞ্ছিত হন, নারীর সম্মান ভূলুণ্ঠিত হয় এটা জানবার চেষ্টা করবেন। আমি পুলিশকে জানিয়েছি। দেখব বলে তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, কিন্তু কার্যত অবস্থার পরিবর্তন হয়নি। আজকে জোড়াবাগানে আবার সন্ত্রাসের রাজত্ব মাঝে মাঝে আত্মপ্রকাশ করছে। সেখানে একটা হরিজন বস্তি আছে তার উপর প্রতিদিন সমাজ বিরোধীরা হাঙ্গামা করছে। ওরা বলেন রাজনৈতিক দলের কর্মী, আমি বলব না কারণ আমার জানা নেই। সেই অত্যাচারিরা কোনও রাজনৈতিক দলের কর্মী কি না জানি না। কিন্তু আমি বলেছি তারা সমাজ বিরোধী। তাদের সম্বন্ধে ডি.সি. নর্থ, পুলিশ কমিশনার এবং জোড়াবাগান থানার ও.সি.-কেও বলেছি কিন্তু তাঁরা সকলেই নীরব। কেউ কিছু করে না। গ্রেপ্তার করা হচ্ছে যারা নিরীহ তাদের এবং যারা অসাধু তাদের গ্রপ্তার করা হচ্ছে না। যদিও হয় সঙ্গে সঙ্গে জামিনে মুক্তি পেয়ে যাচ্ছে। বালির কথা বলব। এটা পতিতপাবন পাঠকের এলাকা তিনি এবং আমার ভগ্নী ফরোয়ার্ড ব্লকের তারা জানেন। তাদের কাছে এসেছেন প্রতিকারের জন্য নয়, আপনাদের কর্ণে প্রবেশ করাবার জন্য যে এই আপনাদের কীর্তি।

পালাঘাটে একটা উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়-এর দশম শ্রেণীর ছাত্রী শিখা চ্যাটার্জী ১৫ জানুয়ারি বিকাল থেকে উধাও। তারই ক্লাশের সহপাঠিনী মলি ভট্টাচার্য তাকে ডেকে নিয়ে গিয়েছিল, কিন্তু তারপর থেকে আজ পর্যন্ত নিরুদ্দেশ।এর পিতা সমরেন্দ্র চ্যাটার্জী মুখ্যমন্ত্রীর কাছে সমস্ত পুলিশ অফিসারের কাছে, হাওড়া ডি.এমের কাছে পুলিশ সুপারের কাছে এবং হোম ডিপার্টমেন্টের সমস্ত কর্মীদের কাছে তার ব্যাখ্যা নিবেদন করেছেন। কিন্তু আজ পর্যন্ত সেই মেয়ের কোনও সন্ধান নেই। সে কোথায় আছে, তার বাবা জানে না। শেষ করব আর একটি করুণ কাহিনী দিয়ে। আমার কাছে একটা চিঠি আছে যে, চিঠির মাধ্যমে মাননীয় মুখ্যমন্ত্রীর কাছে তারা আবেদন জানিয়েছে।

২১ নং পটল ডাঙ্গা স্ট্রিটে নকশাল কর্মী বলে পরিচিত হৃষিকেশ মুখার্জির মা শ্রীমতী পারুল মুখার্জি জ্যোতিবাবুকে লিখেছেন এবং টেলিগ্রামও করেছেন। তার পুত্র নকশাল ছিল—জেলে ছিল এবং যথাসময়ে অন্যান্য নকশালদের সঙ্গে সেও মুক্তি লাভ করে। কিন্তু মুক্তিলাভ করলেও মুক্তি হয় না। পুলিশ তাকে আবার ডাকাতি এবং বোমা পড়ার মামলায় ধরে নিয়ে গিয়ে লালবাজার লকআপে রেখে দিনের পর দিন অনাচার করছে। আগে যখন সে নকশাল ছিল তখন তার উপর অমানুষিক অত্যাচার হয়েছিল। তার সমস্ত শরীর পঙ্গুপ্রাপ্ত। তার হজম শক্তি নষ্ট হয়ে গেছে এবং তার আন্ত্রিক গোলাযোগ দেখা দিয়েছে—তার উপর আবার এরূপ অত্যাচার হচ্ছে। ঐ নকশালরূপী পরিবারকে সরকার যে ভাতা দিয়েছিলেন সেই ভাতা আমহার্স্ট স্ট্রিট পোস্ট অফিসে যেদিন তার বাড়ি পৌছে দেয়, সে দিন সে নোটের তাড়া থেকে ১০ টাকার নোট না দিয়ে ৫০টাকার নোটে ট্রান্সফার করে দিয়ে পুলিশ অফিসার প্রমাণ করতে পারল যে ডাকাতির দায়ে সে ধরা পড়েছে। আমি নকশালদের মতের ও পথের শরিক নই। কিন্তু সরকার যেভাবে কাজ করছেন তা বলতে চাই। আপনারা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন নকশালদের ছেড়ে দেবার, কিন্তু তার পরেও এরকম ভাবে অত্যাচার জুলুম করছেন, মিথ্যা মামলা সাজিয়ে কারারুদ্ধ করবার চেষ্টা করছেন। তখন সেটা নিশ্চয়ই নিরপেক্ষ, সৎ, দক্ষ পুলিশ প্রশাসনের দৃষ্টান্ত নয়। আজকে সেই হৃষিকেশ মুখার্জির মা চোখের জলে এ পত্র লিখেছেন মুখ্যমন্ত্রীর কাছে।” ………… শ্রী দীপক সেনগুপ্ত কর্তৃক বাধা বিষয়টি সাবজুডিস কেউ হাউসে মধ্যে বলা যায় কি না……

শ্রীহরিপদ ভারতী বলে চলেন “আমি এটুকু বলতে চাই যে মামলায় এর বিচার হোক এবং বিচারাধীন মামলা সম্পর্কে, বিচারালয় সম্পর্কে কোনও মন্তব্য করা সমীচীন নয়, এটা আমি বুঝি এবং এজন্য আমি কিছু বলিনি। আমি শুধু অত্যাচারের কথা বলেছি। লোক আপে মারপিটের কথা বলেছি। আমি এটা বলতাম না, কারণ সেই অশ্রুসজল মাতার আবেদনের কপি আমার কাছে আছে। এই বক্তব্য রেখে সমস্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে অতিরিক্ত ব্যয় বরাদ্দের দাবির প্রতিবাদ করে আমি শেষ করছি।”

এর পরের দিনই বিধানসভায় হইহট্টগোল শুরু হয় বারাসাত স্টেশনে দণ্ডকারণ্য ফেরত উদ্বাস্তুদের সাথে পুলিশের সংঘর্ষ নিয়ে। খবরের কাগজের সেই ঘটনার বিবরণ প্রকাশিত হলে সরকার পক্ষের সাথে বিরোধীদের তুমূল বাদানুবাদ হয়। তখন ২৯শে মার্চ বিধানসভায় তদানীন্তন স্পীকার নিম্নলিখিত বিষয়গুলির ওপর নোটিশ পেয়েছেন বলে উল্লেখ করেন –যার পঞ্চম বিষয়টি ছিল বারাসাত স্টেশনে উদ্বাস্তু ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষ। শ্রী হাবিবুর রহমান, শ্রী সামসুদ্দিন আহমেদ, শ্রী কৃষ্ণদাস রায়, শ্রীহাজি সাজ্জাদ হোসেন। সেদিন মাননীয় স্পীকার মহাশয় শ্রী হাবিবুর রহমান, শ্রী সামসুদ্দিন আহমেদ, শ্রী কৃষ্ণদাস রায়, শ্রীহাজি সাজ্জাদ হোসেন কর্তৃক আনীত নোটিশের বিষয়ের ওপর মাননীয় মন্ত্রী মহোদয়ের বিবৃতি দিতে পারেন অথবা বিবৃতি প্রদানের জন্য একটি দিন দিতে পারেন। মাননীয় মন্ত্রী শ্রীবিনয়কৃষ্ণ চৌধুরি মহাশয় হাউজে একটি লিখিত বিবৃতি পাঠ করেন। (ওয়েস্ট বেঙ্গল লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলি প্রসেডিংস – ২৯ মার্চ, ১৯৭৮, পৃষ্ঠা ১৯৬-১৯৮।)

“স্টেটমেন্ট অন কলিং অ্যাটেনশন শ্রী বিনয়কৃষ্ণ চৌধুরী বিধানসভায় একটি বিবৃতি দিচ্ছি —সেটি ইংরেজিতে –

Government instructions had been issued to the District Officers, 24-parganas, and IG of police to ensure that deserters from Dandakaranya are not allowed to proceed to Hasnabad from Barasat and other railway stations in view of the already over-crowding and consequent difficulty at Hasnabad. Accordingly, the Addl. District Magistrate and the Addl. S.. Barasat, 24-Parganas, arranged interception of deserters halting at Barasat Railway Station platform from proceeding to Hasnabad on and from 27.3.78 evening. No deserters could board train on that day. On 28.03.78 there were about three thousand deserters at Barasat Railway Station. By persuasion it was possible to intercept the deserters from boarding Hasnabad locals which left Barasat at 08-30 and 13-10 hrs. When the Hasnabad-bound trains arrived at Barasat Raiway Station at 16-00 hrs. some deserters started shouting slogans asking all to board this train due to leave at 17-30 hrs. Police tried to intercept the deserters. With instigation from some agitators who came from Hasnabad and some local rowdies, all of a sudden the deserters with others started pelting stones at police from all directions. Some of them took lathis and other weapons whichever came handy and attacked the police party. The police did not resort to lathi charge as this would have injured women and children in the congested railway platform. The police force was kept under restraint in spite of grave provocative attack. Shri A.B. Banejee, DSP.. SI-Mahendra, Constable Gurudas Mali had to be admitted to Barasat Subdivisional Hospital. The injuries of Shri Banerjee are serious. SDPO, Barasat , with nine others received minor injuries and had first-aid from Barasat Subdivisional Hospital. Two refugee deserters received injuries in the melee and were admitted in Basasat Hospital. Most of the others left by the other train for Hasnabad.

Over the incident a complaint has been lodged at Bongaon GRPS under sections 147/148/149/325/353/337/307/IPC.

The report appearing in a section of the press alleging lathi charge by the police is not correct. However, as per Government instructions interpretation of the refugee deserters from Dandakaranya at Barasat will continue.

Pursuant to the above, the following actions are proposed :

Transit camps will be opened at places other than Hasnabad where the refugees who have already arrived will be shifted as far as possible. In these camps the refugees will be provided with relief against work as far as practicable. The scale of relief will be two kgs. of wheat and one rupee per adult. Milk distributions should be arranged for the children. Necessary expenditure for this purpose should be met from the budget of the Relief Department.

An Additional SDO will be posted at Hasnabad to maintain law and order and for coordinating health, water supply and other measures. Officers and staff to the extent necessary should be provided at the Transit Camps.

Relief in the Transit Camps will be arranged by the Relief Department, while the movement etc. to these camps will be arranged by the Rehabilitation Department. Health Department will arrange the sinking of tube-wells and necessary public health and medical measures.

A sum of Rupees Five lakhs per transit camp may be placed at the disposal of District Magistrate concerned for contingent expenditure.

Instruction will be issued to the local police to stop all attempts by the refugees to move to the Sundarbans.

মাননীয় মন্ত্রীর সভায় বিবৃতি দানের পরই বিধানসভার সদস্য শ্রীসন্দীপ দাস মহাশয় বলেন “আমি মাননীয় মন্ত্রী বিনয় কৃষ্ণ চৌধুরি মহাশয়কে ধন্যবাদ জানাচ্ছি তিনি এই ব্যাপারে একটা বিবৃতি দিয়েছেন। কিন্তু সংবাদপত্রে যে বিবরণ প্রকাশিত হয়েছে তার পরে মন্ত্রী মহাশয় যে বিবৃতি দিলেন তাতে কিন্তু আমাদের দুশ্চিন্তার নিরসন হয়নি। প্রথমত দেখছি যে পুলিশ এবং উদ্বাস্তুদের মধ্যে সংঘর্ষে ৫০ জন লোক আহত হয়েছে। তাদের কি অবস্থা, সেটা আমরা বুঝতে পারছি না। এতবড় একটা ঘটনা ঘটল, কিন্তু সরকারি তরফে ব্যবস্থা পর্যাপ্ত আছে বলে মনে হচ্ছে না। দ্বিতীয়ত সংবাদপত্রে যেভাবে খবর বেরিয়েছে। আজকে দেখা যাচ্ছে একজন মন্ত্রীর সঙ্গে মুখ্য সচিবের মত বিরোধ দেখা দিয়েছে ব্যাপারটা অত্যন্ত গুরুতর। এর পর স্পীকার এই নিয়ে সেদিনের সভায় কোন আলোচনার অনুমতি দেননি।

আমি এই ঘটনার সূত্র ধরেই তুলে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য। ওয়েস্ট বেঙ্গল অ্যাসেমব্লি প্রসিডিংস-এর ১৯৭৯ সালের ৭০তম অধিবেশনে ২৩ মার্চ (পৃষ্ঠা ৭-৮) পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় এক মূলতবী প্রস্তাব এনে মাননীয় শ্রীহরিপদ ভারতী দণ্ডকারণ্য ফেরত উদ্বাস্তুদের ওপর বামফ্রন্ট সরকারের পুলিশ-ক্যাডার বাহিনীর নির্যাতন সম্পর্কে মাননীয় অধ্যক্ষের দৃষ্ট আপর্ষণ করেন –“মাননীয় অধ্যক্ষ মহাশয়, আমি যে বিষয়ে আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি সেটা ব্যক্তি স্বাধীনতা, গণতান্ত্রিক অধিকার সংক্রান্ত প্রশ্ন। আমরা এখানে বারে বারে গণতন্ত্রের কথা বলি, ব্যক্তি স্বাধীনতার কথা বলি এবং মাঝে মাঝে এই সভাতে গর্ব বোধ করেছি যে আমাদের দেশে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি অত্যন্ত নিরাপদ। কিন্তু আমাদের গণতান্ত্রিক অধিকার সম্বন্ধে কি দেখি, আমি সেই প্রসঙ্গে আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করে একটি কথা বলতে চাই।

গতকাল আপনি জানেন যে সংসদের তিনজন প্রতিনিধি পর্যবেক্ষক দল হিসাবে মরিচঝাঁপির অবস্থা দেখবার জন্য এসেছিলেন। আমি আপনার কাছে মরিচঝাঁপি সম্বন্ধে আলোচনা করতে চাই না। আমার প্রশ্ন হচ্ছে ব্যক্তিগত অধিকার, নাগরিক অধিকারের বিষয়ে। আপনি নিশ্চয়ই জানেন আমরা জনতা পার্টির পক্ষ থেকে কিছু মানুষ যে এলাকা নিষিদ্ধ নয়, বেআইনি নয়, বনাঞ্চল সংরক্ষিত এলাকা নয়, সেই পর্যন্ত আমরা যেতে চেয়েছিলাম আমাদের এই প্রতিনিধি দলের সঙ্গে এবং তা স্পষ্ট ভাবে জেলা মেজিস্ট্রেট এবং ডিএসপি ২৪ পরগনা, সমস্ত জানতেন যে আমরা কোন পর্যন্ত যাব। আমরা কুমিরমারিতে নেমে পড়ব,তারা নিজেরা যাবেন। এই ব্যাপারে এস পি জানতেন, সমস্ত কথা জানবার পর যখন আমরা পরের দিন ৬টার সময় রওনা হই, সমস্ত পুলিশ বিভাগ, ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট, ডিআইজি, এসপি সকলে এসে উপস্থিত হয়েছিলেন। এরা স্পষ্টভাবে জানতেন যে এই থ্রি মেম্বার কমিটি শুধু মরিচঝাঁপি যাবেন, জনতা পার্টির লেকেরা কেবল মাত্র কুমিরমারি পর্যন্ত যাবেন, ওখানে যাবেন না। এই স্পষ্ট সিধান্ত অনুসারে আমরা গিয়েছিলাম। কিন্তু আমরা দেখলাম কিছুদূর যাবার পর যে এলাকা নিষিধ এলাকা নয়, রিজার্ভ ফরেস্ট এলাকা নয়, যেখানে কোনও পাশ নেবার প্রশ্ন ওঠে না, সেখানে হঠাৎ ৬টি পুলিশের লঞ্চ আমাদের ঘিরে ধরে এবং আমাদের লঞ্চটাকে দুটো লঞ্চ এসে দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলে। তারা এসে প্রশ্ন করে আপনাদের যাবার অধিকার আছে কি? আমরা উত্তর দিই। আমরা তো মরিচঝাঁপি যাচ্ছি না, এই ব্যাপারে তো ডিএম জানেন। আমরা যে এলাকা দিয়ে চলেছি সেটা তো বেআইনি এলাকা নয়। সংসদ সদস্যরা বললেন যে আমরা তো স্পষ্টভাবে এই কথা জানিয়েছি যে আমাদের বন্ধু কুমিরমারিতে নেমে যাবেন, আমরা কেবল মাত্র মরিচঝাঁপি যাবো। তারপর তারা অনেক শুনে কোথাও ওয়ারলেস পাননি, মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করবার আবশ্যকতা ইত্যাদি বলবার পর তারা আমাদের ছেড়ে দিলেন। কিছু দূর যাবার পর বৈধ এলাকার মধ্যে তারা আমাদের লঞ্চ আটক করেন। তারপর কুমিরমারিতে আমরা যখন নামি আমরা আমাদের পূর্ব সিন্ধান্ত অনুসারে, সেখানে এক লঞ্চ ভর্তি পুলিশ কুমিরমারিতে তারা আমাদের ঘেরাও করে পাহারা দেয়। আমরা যখন চায়ের দোকানে যাই চা খেতে সেখানেও পুলিশ বসে আছে, একটা প্রাইমারি স্কুলে আমরা গেছি সেখানেও তারা আমাদের পাহারা দিচ্ছে এবং আমাদের কথাবার্তা সমস্ত শুনছে, তারপর যারা মরিচঝাঁপিতে যাবার তারা গেলেন আমরা ফিরে আসছি আমাদের পূর্ব সিদ্ধান্ত অনুসারে।

আমি প্রশ্ন করছি আমাদের এই নাগরিক অধিকার আছে কিনা? যে এলাকা নিষিদ্ধ নয়, যে এলাকায় প্রতিদিন ফেরি লঞ্চ চলছে যাত্রী আসা যাওয়া করছে সেই এলাকায় আমাদের যাবার অধিকার কি নেই? যে নদী দিয়ে আমরা যাচ্ছি সেই নদী, সেই এলাকা অবৈধ হলে হয়তো ওই নদীর এমন একটা স্থানে গিয়ে হাজির হয়েছে সেখানে সরকারের দূষিত রক্তক্ষরণ হচ্ছে কিন্তু তারপর বিধিবদ্ধ এলাকায় আমাদের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করবার অধিকার কি আছে, জানিনা, তাহলে আমাদের ব্যক্তিগত অধিকার কি নেই, অথচ প্রতিদিন এই বিধানসভায় যেখানে নামাবলি টেনে টেনে গণতন্ত্রের সংকীর্তন চলছে সেখানে এই কথার অর্থ কি আমি জানতে চাই? মুখ্যমন্ত্রী প্রায়ই বলেন মরিচঝাঁপি সংক্রান্ত স্মস্ত ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী তাঁর সঙ্গে একমত এবং তাঁর সঙ্গে আলোচনা করেন, কিন্তু আমি জানতে চাই আমাদের ব্যক্তিগত অধিকারে হস্তক্ষেপ করার ব্যাপারে সেটা কি প্রধানমন্ত্রী মুখ্যমন্ত্রীকে বলে দিয়েছেন? এই প্রসঙ্গে একটা কথা বলতে চাই যার জবাব মুখ্যমন্ত্রী দেবেন, ১৯৬৪ সালের একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করতে চাই। মমতা পাল নামে একটি উদ্বাস্তু মেয়ের উপর পুলিশের অত্যাচারকে কেন্দ্র করে ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউটে যে সভা হয়েছিল তাতে আমরা প্রতিবাদ করেছিলাম, সেই সভায় আমাদের সঙ্গে জ্যোতিবাবুও উপস্থিত ছিলেন। পরবর্তীকালে এই নিয়ে অনেক আন্দোলন হয়েছিল, যার জন্য পশ্চিমবাংলার মানুষ সেদিন তাঁকে শ্রদ্ধা জানিয়েছিল। আজকে সংসদ সদস্যরা ফিরে এসেছেন অনেক করুণ কাহিনী শুনে, অনেক মেয়ের উপর সেখানে অত্যাচার হয়েছে,আমি আশা করব মুখ্যমন্ত্রী এর জবাব দেবেন।” ………স্পীকার বাধা দিয়ে ঘটনার বাইরে অন্য কথা বলতে নিষেধ করেন।

শ্রী হরিপদ ভারতী পরিশেষ প্রশ্ন করেন, “আমি মুখ্যমন্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করছি, তিনি বলেছিলেন এই টিমের সঙ্গে কোনও সাংবাদিক যেতে পারবে না। কিন্তু আমাদের সংবাদ যে পুলিশ লঞ্চে একটি বিশেষ পত্রিকার সাংবাদিক বন্ধু মরিচঝাঁপিতে গিয়েছিলেন কি করে?”

এরপর মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী শ্রীজ্যোতি বসু বিধানসভায় যে উত্তর দিয়েছিলেন, তার অধিকাংশ বক্তব্যে শ্রী ভারতীর করা প্রশ্নের কোন উত্তর ছিল না। আমরা পরবর্তী পর্যায়ে এই নিয়ে মরিচঝাঁপি সংক্রান্ত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)দলের বক্তব্যের উপরও আলোচনা করব, তারা কতখানি বনাঞ্চল আইন রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন। যেখানে হাজার হাজার লক্ষ মানুষের জীবন-জীবিকা বেঁচে থাকার নূন্যতম লড়াই-এর প্রশ্ন; সেইখানে মুখ্যমন্ত্রী ও তাঁর দল মরিচঝাঁপিতে যে উদ্বাস্তুদের উপর আক্রমণ,খুন ও অত্যাচারের যে ঘটনা ঘটিয়েছিলেন সে বিষয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর সাথে মাননীয় মুখ্যমন্ত্রীর মতামতের সম্মতির ভিত্তিতেই হয়েছে বলে দাবি করেন।

২৩শে মার্চ ১৯৭৯ সালে বিধানসভায় দাঁড়িয়ে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী যে বিবৃতি দিয়েছিলেন তার প্রয়োজনীয় অংশটুকু এখানে তুলে ধরা হল। “………… কারণ মরিচঝাঁপি সম্বন্ধে এটা জানা কথা যে বিরোধী দলের সদস্যের সঙ্গে আমরা একমত নই, কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে একমত। প্রধানমন্ত্রীও বলেছেন যে ওদের ফেরত যেতে হবে। মূল কথা হচ্ছে সেটা কিভাবে করা হবে যেটা নিয়ে অসুবিধা হচ্ছে। ওখানে বনজঙ্গল রক্ষা করতে হবে। ওরা নিজেরা সরকার গঠন করবে এটা কি করে হতে পারে? আমাদের সংসদ থেকে যারা এসেছিলেন তাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর আলোচনার পর যদি কাল হয় ভাল, কাল না হলে আবার সময় নিয়ে আলোচনা করতে হবে, তখন সেই বিষয়ে আমি আলোচনা করব। ৩১শে মার্চের মধ্যে ওঁদের যাবার কথা ওখানে আছে। আমি সেকান্দার বখতকে জানিয়েছিলাম যে আপনার দল বাধা সৃষ্টি করছে, কাজেই একটু সময় লাগতে পারে, সময় দেবেন। তিনি বলেছেন সময় দিতে পারি, কিন্তু জুলাই-এর আগে যদি না হয় তাহলে চাষ-বাস হবে কি করে, এটা শেষ চিঠি তিনি আমাকে লিখেছেন। এই হচ্ছে আমার বক্তব্য।”

শ্রী প্রোবধ চন্দ্র সিন্‌হা Under Rule 226 of the Rules of Procedure and conduct of business in the West Bengal Legislative Assembly I give notice of my intention to raise a question of privilege arising out of the facts mentioned below — ১৯৭৯ সালের ২৬ মার্চ পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় বিশেষ প্রাধিকার প্রশ্নের মাধ্যমে হাউজের সামনে ইংরেজীতে শ্রী প্রবোধ চন্দ্র সিনি্‌হা লিখিতভাবে নোটিশটি আনেন –- “Shri Kashi Kanta Moitra, Shri Haripada Bharati, MLA Shri Rabisankar Pande, MLA and myself were obstructed by some West Bengal Government officials on 22.3.79 from discharging our duties as Members of the West Bengal Assembly. On that day we, four members of the WB Legislative Assembly accompanied the Janata Parliamentary Team deputed by the Prime Minister of India in a launch hired by Janata Party up to Kumirmari where after our disembarkation the said launch (Ma-Batala) proceeded with the Parliamentary Team with several Government and police vessels following it to Marichhjhapi Island. This arrangement was notified to the State Government through District Magistrate, 24-parganas by the by the Leader of the Janata Parliamentary Team, Shri Prasanta Bhai Mehta, M.P. and the state Government accepted the Position as would be apparent from the fact that high ranking government officials including a top Police officer of D.I.G. Bank followed the whole party by car from M.P.’s Hostel (Nizam Palace) to Canning on 22.3.79 and a Police Launch carrying those officials followed our Launch (Ma-Battala) which was carrying three M.P.’s, four M.L.A.s and others all through from Canning. When our launch was about to approach Chotto-Mollakhali it was suddenly intercepted by six police launches and its movement was obstructed. The Police ties our launch in the front and rear by ropes with the police launches carrying Mr. J.J. Thorial, I.P.S. Additional Superintendent of Police, 24 Parganas (North), Shri Kalyan Chakravorti, Director, Project Tiger, Government of West Bengal, and one Additional District Magistrate, 24-Parganas. The officers mentioned above displayed arrogant and insolent behavior towards us and we were disgusted and felt very much harassed and a lot of time was lost. After 20 minutes of harassment and obstruction our launch was allowed to move. But the police launches followed our launch from a very close distance on all sides. When we were about to reach Kumarimari market our launch was again intercepted by two police launches from both the sides and the movement of our launch was stopped again and after much harassment we were allowed to proceed.

The illegal, unwarranted, motivated and arbitrary stoppage of movement of our vessel and its patently unauthorized detention in the midst of the river twice before our disembarkation at Kumarimari market is a clear breach of privilege and guaranteed freedom of movement particularly because the area, a region of river where such detention has taken place is not a prohibitory area where movement is restricted or regulated by permit. This is a serious encroachment on guaranteed freedom. At Kumarimari we along with some journalists and others were kept under constant police surveillance by armed police personnel and high ranking police officials who without authority of law shadowed us and kept vigil on our movement. This is illegal, motivated and amounted to clear violation of freedom of movement and personal freedom.

A member of the Legislative Assembly has the fundamental right to move freely throughout the territory of West Bengal and to proceed to any part of the State which is not otherwise prohibited under law. These rights are fundamental to the discharge of their parliamentary duties and guaranteed by arts. 19(1) (b) and (d) of the Constitution of India.

We, as citizens, not to speak of as Legislators, have guaranteed right to move under law to move to Kumarimari and accompany our M.P. from Delhi up to that place. Which is not at all a prohibited area. Further, we considered it our parliamentary duty to know how the people of Kumarimari who might be called the neighbors of Marchjanpi people think about the problem of Marichjanpi. It was made patently clear to the District Magistrate of 24 Parganas in the night of 21.3.79 by Shri P.B. Mehta, Leader of The Team, that M.L.A.s will travel with the team only up to Kumarimari. This is a matter of great importance, and I feel that the above mentioned Government officials have deliberately sought to impede proper functioning of members as elected representative of the people and committed breach of privilege. I enclose herewith a photograph published in the Amrita Bazar Patrika and Jugantar dtd. 24.3.79 and news published in Ananda Bazar Patrika (1st page col. 2 & 3) in support of my contention.

মাননীয় অধ্যক্ষ মহাশয়, আপনার কাছে আমার একটা সাবমিশন আছে। সেটা হচ্ছে, আমার এই প্রিভিলেজ মোশনটা আমি হাউসে আনলাম, আপনি এটা প্রিভিলেজ কমিটিতে দিয়ে দেবেন।

 

Leave a Reply