আঙিনা

দেশ – ১২

 

– ডঃ গৌতম মুখোপাধ্যায়

 

বিনোদন – সিনেমা ……

দেশের আশ পাশে কোনো সিনেমা হল ছিল না। দুটো সিনেমা হল ছিল। বনশ্রী আর হীরামহল। অনেক পরে স্টেশনের কাছে আর একটি সিনেমা হল তৈরী হয়, শ্রীমা। আশ পাশের স্টেশনের লোকেদের সুবিধার জন্য। এসি ছিলনা। পাখাও অল্প। বনশ্রীতে বাংলা বই দেখাত। একদম নতুন বই, যেগুলো কলকাতায় রিলিজড হত, সেগুলো এক দু মাস পর বনশ্রীতে দেখানো হত।
সাধারনত উত্তম সুচিত্রার পুরোনো বই গুলো দেখানো হত। হীরামহল এ পুরনো হিন্দী বই দেখানো হত। নতুন হিন্দী বই দেখিয়ে পয়সা তোলা যেত না। মেরা গাঁও মেরা দেশ ( মার দিয়ে যায়, ইয়া ছোড় দিয়া যায়, বোল তেরা সাথ ক্যা সালুক কিয়া যায়?)
ঠাকর জার্নেল সিং ইত্যাদি ডাকাতির বা মার-কাটারি টাইপের সিনেমা দেখানো হত।

বনগাঁ টাউনে আমার সেজমাসীমার বাড়ি ছিল। সেজমেশোমশাই ডাক্তার। ছয় ছেলে মেয়েদের মধ্যে ধীরা কনিষ্ঠতম ও আমার থেকে অল্প বড়, আমার প্রিয় বন্ধু। দেশে গেলে মা কয়েকদিনের জন্য দিদির বাড়ি যেতেন, আমি সঙ্গে যেতাম। মাসীমা বাড়িতে প্রচুর গল্পের বই ছিল। দেব সাহিত্য কুটিরের পূজাবার্ষিকী গুলো, অলকনন্দা, দেবদেউল, আগমনী, দেবালয় ইত্যাদি মনে পড়ে কারো? এছাড়া অনেক গল্পের বই, ডিটেকটিভ বই থাকত। আমি ওগুলো গোগ্রাসে গিলতাম। ধীরাদের জাঠতুতো ভাই বোনেরা বনগাঁতেই থাকত। ওরা সবাই দেখা করতে আসতো। ওদের মধ্যে চায়নার নাম মনে আছে। সমবয়সী। আমি ধীরা, চায়না একসাথে অনেক সিনেমা দেখেছি।

বনগাঁর দুটো হলেই টিকিটের দাম খুব কম ছিল। কলকাতার থেকে অনেক কম ছিল।আমি ৬০ দশকের কথা বলছি। ৭০ দশকে কলকাতায় আমাদের এলাকায় ইন্টালী হলে ফ্রন্ট রো এর টিকিটের দাম ছিল ৫০ পয়সা। নিউ এমপায়ার, লাইট হাউস , প্রাচীর দাম ছিল ৬৫ পয়সা। ক্লাস টেন এ পড়ার সময় নিউ এমপায়ার এ ৬৫ পয়সার লাইনে মারামারি করে ঢুকেছিলাম ব্রুস লীর ‘Enter The Dragon’ দেখতে। ২০-২৫ জন গেছিলাম পাড়া থেকে। সমীর দাস (বাবন) না থাকলে আমরা ঢুকতে পারতাম না। বাবন আর আমি ক্লাস ফোর এ এ্যানুয়াল পরীক্ষায় অঙ্কে ১০০য় ৯৮ পেয়েছিলাম। তারপর দুজনেই পড়াশুনো থেকে drifted away হচ্ছিলাম। ক্লাস নাইনে আমি পড়াশুনোয় ফিরে এসেছিলাম। বাবন ফেরেনি।

গ্রামে ফিরি –

১৯৫৯ সালে তৈরী হয়েছিল ‘নীল আকাশের নীচে’ সিনেমা। এর একটি গান ‘ও নদীরে , একটি কথাই শুধাই শুধু তোমারে,’
বাংলার গ্রাম গঞ্জের প্রান্তরে প্রান্তরে রণিত হত। তখন বেশীরভাগ বাংলা সিনেমা গ্রামের পটভূমিকায় তৈরী হত। ১৯৫৫ য় তৈরী ‘পথের পাঁচালী’ তো বাংলা তথা ভারতীয় সিনেমার নতুন দিক নির্দেশক রূপে চিহ্নিত হল। ১৯৫৫ তে তৈরী আর একটি ছবি ‘রাইকমল’ বাংলা মাতিয়েছিল। এতে কাবেরী বসু যে সাবলীল অভিনয়ের যে নিদর্শন রেখেছেন তা আর কেউ অতিক্রম করতে পারেননি। সুচিত্রা সেন কে মাথায় রেখে বলছি।

১৯৬৩ তে তৈরী পলাতক ও তার গান বাংলা ভাসিযেছিল। এই সব সময়ে বাংলা গানে গ্রাম্য কথ্য ভাষা অনায়াসে ঢুকে পড়ত। যেমন ১৯৬৩ তে ভারত বিখ্যাত শিল্পী আশা ভোঁষলে গাইলেন ‘থুইলাম এ মন পদ্মপাতায়’। এই থুইলাম শব্দটি একদম গ্রামীন।
১৯৬০ এর আশপাশে গঙ্গা সিনেমার গান ‘ইসসা করে ও পরাণডারে গামছা দিয়া বান্ধি’ গেয়েছিলেন পঙ্কজ মিত্র, সলিল চৌধুরীর সুরে। এ গানে মাটির প্রলেপ স্পস্ট অনুভব করা যায়। পলাতক সিনেমায় পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, বীরভূম, ঝাড়খন্ড, ময়ুরভঞ্জের বিখ্যাত ঝুমুর নাচ চলচ্চিত্রায়িত হয়েছিল। সেইসঙ্গে হেমন্ত মুখার্জী অপূর্ব সৃস্টি করেছিলেন ঝুমুর অঙ্গের গান
‘মন যে আমার কেমন কেমন করে’ এবং ‘চিনিতে পারিনি সখী তোমার এই আঙিনা/তাই দেরী হল যে তোমার কাছে আসিতে’
কোচবিহার বা উত্তরবঙ্গের ভাওয়াইয়া অঙ্গের গান ‘আহারে বিধিরে তোর লীলা বোঝা দায়/যে উড়ে যায় কেন তারে বাঁধিস খাঁচায়/সে যে উড়ে যায় উড়ে যায়’ এছাড়া মেঠো সুরে তৈরী ‘জীবনপুরের পথিক রে ভাই/কোনো দেশে সাকিন নাই’ বা ‘দোষ দিওনা আমায় বন্ধু/আমার কোনো যে দোষ নাই’ গান গুলো এখনো শুনলে বুকের রক্তের মধ্যে বৈঠা বাওয়ার ছলাৎ ছলাৎ আওয়াজ পাই।

১৯৬৬ তে মনিহার সিনেমার গান বাংলার যে কোনো বিয়ের বাসরে গীত হত। ১৯৬৬ এ নির্মিত উত্তম অঞ্জনার রাজদ্রোহী সিনেমা বাংলায় কংগ্রেস রাজত্বের পতনের ইঙ্গিত দিয়েছিল বা বলা যায় সূচনা ঘোষনা করেছিল।

বাঁশ বাগানের মাথার ওপর চাঁদ উঠেছে ওই
ওমা আমার শোলোক বলা কাজলা দিদি কই

দেশে প্রচুর বাঁশ ঝাড় দেখতাম। আমাদের নিজেদের বেশ কয়েকটা ঝাড় ছিল। বাঁশ ঝাড় কার্পেটের মতো শিকড় মাটি আঁকড়ে ধরে থাকে। একইভাবে বাঁশ পাহাড় ধরে রাখে। আর বাঁশ নেই বলেই পাহাড়ধ্বস হচ্ছে। উদ্ভিদবিজ্ঞানীরা বলেন, বাঁশ দ্রুত বর্ধনশীল। চারা লাগানোর পর একটি বাঁশঝাড় পাঁচ বছরেই পূর্ণাঙ্গ ঝাড়ে পরিণত হয়। পাঁচ বছর পর একটি ঝাড় থেকে বছরে পাঁচটি বাঁশ কাটা যায়। একমাত্র মুলি বাঁশই ঝাড় ছাড়া জন্মায়। বাঁশের নানা রকমফের আছে। মুলি, তল্লা, বরাক, ভুদুম, বাইজ্জা, বেথুয়া, ফারুয়া, ওরা, লতা মিরতিঙ্গাসহ প্রভৃতি।চিরহরিৎ উদ্ভিদ বাঁশ আসলে ঘাস পরিবারের সদস্য। ঘাস পরিবারের এরা বৃহত্তম সদস্য। বাঁশ গাছ সাধারণত একত্রে ঝাড় হিসেবে জন্মায়।

বছর দশেক আগে বাঁশ কে আইন করে বৃক্ষ বলা হয়েছিল। বৃক্ষ হলে তাকে কাটা বা ব্যাবসা করা খুব কঠিন। তাহলে কাগজের কলগুলির কাঁচামাল বা অন্যান্য কাজে ব্যবহৃত বাঁশ আসবে কোথা থেকে? চায়না থেকে আনা হত। কারন কংগ্রেস পার্টির ফান্ডে কয়েকশো কোটি টাকা দান করেছিল চায়না। প্রতিদান হিসেবে ওই আইনটি করা হয়েছিল।

মুলি বাঁশে খাদ্যগুণের কথা মাথা রেখে ত্রিপুরায় তৈরি হয়েছে বাঁশের কুকিজ বা বিস্কুট। বিশ্ব বাঁশ দিবস উপলক্ষ্যেই সেই বাঁশের তৈরি বিস্কুট লঞ্চ করেছিলেন ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব দেব। শুধু বিস্কুট নয় বাঁশের তৈরি জল রাখার পাত্রও চালু করা হয়। যা ইতিমধ্যেই মন কেড়ে নিয়েছে প্রকৃতি প্রেমীদের। এছাড়া বেড়া দিতে , ঝুড়ি বানাতে, ঘরের চাল ছাইতেও বাঁশ ব্যাবহার করা হয়।

বর্তমানে মানুষ পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন হওয়ায় বাঁশের তৈরি বোতল, চিরুনি বা ব্রাশের মত জিনিসের চাহিদা ধীরে ধীরে বাড়ছে। আর সেই বিষয়টিকেই গুরুত্ব দিচ্ছে ত্রিপুরার বর্তমান সরকার। কারণ ত্রিপুরায় বাঁশ শিল্পের চাহিদা রয়েছে। বহু মানুষেরই অন্নসংস্থান হয় এই শিল্পের মাধ্যমে। আর সেই কারণেই মানুষের কর্মসংস্থানের কথা মাথায় রেখেই এই উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

৬০-এর দশকে একটা গোটা বাঁশের দাম ছিল ৪ /- টাকা। এখন এক একটা বাঁশের দাম ২৫০ থেকে ৫০০ টাকা। উত্তরবঙ্গের প্রকৃতির দুর্যোগ প্রতিরোধক ও পরিবেশের পরমবন্ধু বাঁশঝাড় হারিয়ে যাচ্ছে। বাঁশের অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্য কুঠির শিল্পও। গ্রামীণ জনপদে একসময় বাঁশঝাড় ছিল না এমনটা কল্পনাও করা যেতো না। যেখানে গ্রাম সেখানে বাঁশঝাড় এমনটিই ছিল স্বাভাবিক। বাড়ির পাশে বাঁশঝাড়ের ঐতিহ্য গ্রাম বাংলার চিরায়ত রূপ। দেশের বিশেষ করে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর নিকট বাঁশের গুরুত্ব অপরিসীম। গৃহ নির্মাণ, মঞ্চ নির্মাণ, মই, মাদুর, ঝুড়ি, ফাঁদ, হস্তশিল্পসহ নিত্যদিনের ব্যবহার্য বিভিন্ন জিনিসপত্র তৈরির কাজে বাঁশের রয়েছে বহুল ব্যবহার।

মূলত বাঙালির জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত বাঁশ প্রয়োজন। বাঁশসহ অন্যান্য বৃক্ষ নিধনের ফলে দৈনন্দিন জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হচ্ছে। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলা বাঁশ অতুলনীয়। বাঁশ গাছ অন্য যেকোন গাছের তুলনায় দ্রুত গতিতে ক্ষতিকর কার্বন গ্যাস শুষে নিতে সক্ষম এবং এর শিকড় মাটি ক্ষয়ে যাওয়া রোধ করতে পারে। জেলার জনজীবন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্যবাহী বাঁশ শিল্প। এক সময় এ গ্রামীণ জনপদে তৈরি হতো হাজারো বাঁশের পণ্য সামগ্রী। ঘরের কাছের ঝাড় থেকে তরতাজা বাঁশ কেটে গৃহিনীরা তৈরি করতেন হরেক রকম জিনিস। অনেকে এ দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। কিন্তু বাঁশের অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামগঞ্জের ঐতিহ্য কুটির শিল্প।

দিনাজপুর শহরের উপকন্ঠ কসবা আদিবাসীপাড়া এবং সদর উপজেলার জামালপুর এলাকা সরজমিনে ঘুরে দেখা যায়, সেখানকার বাঁশ শিল্পীদের করুণচিত্র। অনেকে পেটের তাগিদে বাপ-দাদার এই ব্যবসা ছেড়ে এখন অন্য পেশায় নিয়োজিত হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে বাঁশ শিল্পের স্থান অনেকটাই প্লস্টিক সামগ্রী দখল করে নিয়েছে। ফলে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে।
বাঁশের শেকড় অবিশ্বাস্য রকম দৃঢ় যা মাটির ক্ষয়রোধে ভূমিকা রাখে। বাঁশের শেকড় মাটির নিচে অনেকদূর পর্যন্ত প্রসারিত হয়। কোনো ক্ষেত্রে ১০০ মিটার পর্যন্তও যায়। প্রকৃতি ও জীবন রক্ষায় বাঁশ চাষ, তার সম্প্রসারণ ও বিকাশের জন্য গড়ে তুলতে হবে বাঁশ নার্সারি। টিস্যু কালচারের মাধ্যমে উন্নতমানের দ্রুত বর্ধনশীল বাঁশের আবাদ করতে হবে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় এই বাঁশঝাড় টিকিয়ে রাখার তাগিদ দিচ্ছেন পরিবেশবিদ ও প্রকৃতি প্রেমিরা।

 

(লেখক পরিচিতি – অবসরপ্রাপ্ত পেট্রফিসসিস্ট: ব্যাঙ্গালোরের প্রেসিডেন্সী বিশ্ববিদ্যালয়ে পেট্রোলিয়াম বিভাগের প্রাক্তন ফ্যাকাল্টি)

 

ছবিঃ – ১৯৫৫ সালে প্রকাশিত ‘রাইকমল’ চলচ্চিত্রে শ্রীমতী কাবেরী বসু।

 

(ক্রমশঃ)

Comment here