বিজ্ঞান

গণিত প্রকৃতির পাঠশালায়

–  শ্রী জয়দীপ চক্রবর্তী

 

আমরা সকলেই তো গোলাপ ফুলের সাথে পরিচিত বিভিন্ন উৎসবের সূত্র ধরে।  কিন্তু আমরা কোনদিন গুনে দেখি না একটি গোলাপের কতগুলি পাপড়ি থাকে। যদি দেখি, তাহলে দেখব – পাপড়ির সংখ্যা ১৩, ২১, ৩৪, ৫৫ কিংবা ৮৯।  ভাবছেন এতে অবাক হওয়ার কি আছে? অবাক হওয়ার মত বিষয় হল, উপরের সংখ্যাগুলি কোনটাই সম্পর্কবিহীন সংখ্যা নয়। সকলেই একটি নিয়মবদ্ধ সংখ্যা সারণির পদ বিশেষ। গণিতের পরিভাষায় যাকে বলে Members of Sequence.

তাহলে চলুন এই Sequence ব্যাপারটা একটু বোঝা যাক। কতগুলি ভগ্নাংশ যেমন ১/২, ২/৩, ৩/৪, ৪/৫…….এগুলি একটি sequence তৈরী করে অর্থাৎ এরা নির্দিষ্ট নিয়মের দ্বারা আবদ্ধ সংখ্যা, নিয়মটা হল প্রত্যেক ভগ্নাংশের হর গুলি লবের থেকে ১ বেশী। এই ভগ্নাংশগুলির সাধারণ আকার হল n/n+1 যেখানে n = 1, 2, 3 ……করে বসিয়ে গেলে আমরা উপরের ভগ্নাংশগুলি পাই।  তাই এই ভগ্নাংশগুলি একটি নিয়মবদ্ধ সংখ্যা সারণী অর্থাৎ sequence এর পদ members. ঠিক তেমনই শুরুতে যে সংখ্যাগুলি বলেছিলাম 13, 21, 34, 55, 89 এরাও একটি sequence তৈরী করে।  অর্থাৎ একটি নিয়মের মধ্যে আবদ্ধ।  নিয়মটি হল পর পর দুটি সংখ্যার যোগফল তৃতীয় সংখ্যা যেমন – 13 +21= 34, 21 + 34 = 55, 34 + 55 = 89. . . এই ধরণের sequence কে বলে ‘ফিবনক্কি sequence’.. প্রকৃতির পাঠশালায় অনেক কিছু এই  ‘ফিবনক্কি sequence’ মেনে চলে।

এবার কে এই ফিবনক্কি একটু জেনে নিই। পুরো নাম লিওনার্দো ফিবনক্কি । জন্ম ইতালিতে, ১১৭০ খ্রী: ছোট বেলায় পড়াশুনায় খারাপ result করার জন্য school থেকে বিতাড়িত হন। বিশেষ করে অঙ্ক আর বিজ্ঞানে তার নম্বর ছিল ০। একটু বড় হওয়ার পর তার বাবা তাকে পাঠিয়েছিলেন ব্যবসার কাজে।  কিন্তু ব্যবসার পাশাপাশি তিনি ইঁদুরের প্রজনন ব্যবস্থার এক অদ্ভুত নিয়ম লক্ষ্য করেন। ধরা যাক, দুটি ইঁদুর স্ত্রী ও পুরুষ একই সাথে জন্ম নেয়, এবং জন্মের এক মাসের পর সংগমে উপযুক্ত হয়। এবং আরও এক মাস পর একটি স্ত্রী ও পুরুষ ইঁদুরের জুড়ির জন্ম দেয়। তাহলে প্রথম মাসে স্ত্রী ও পুরুষ ইঁদুরের জুড়ির সংখ্যা ১, দ্বিতীয় মাসেও এই জুড়ির সংখ্যা ১, তৃতীয় মাসে প্রজননের পর জুড়ির সংখ্যা ২, চতুর্থ মাসে আবার পুরনো জুড়ির দ্বারা নতুন প্রজননে জুড়ির সংখ্যা ৩, পঞ্চম মাসে পুরোনো ও নতুন দুই জুড়ির দ্বারাই একটি করে জুড়ির জন্ম হয় এবং একটি জুড়ির সংখ্যা ৫। এইভাবে পরপর মাসগুলিতে জুড়ির সংখ্যা পেলাম 1, 1, 2, 3, 5, 8…অর্থাৎ একটি sequence পেলাম যেখানে পরপর দুটি সংখ্যার যোগফল হল তৃতীয় সংখ্যাটি।  এই sequence – এর নাম ‘ফিবনক্কি sequence’…..

প্রকৃতির নিজস্ব নিয়মে এই sequence-এর প্রয়োগ দেখা যায়। আনারসের একটি সারিতে চোখের সংখ্যা 8 বা 13 অর্থাৎ ফিবনক্কি sequence-এর একটি সংখ্যা। কতগুলি ব্যতিক্রম ছাড়া ফুলের পাপড়ির সংখ্যা এই ফিবনক্কি sequence মেনে চলে। আরও একটি আশ্চর্যের বিষয় হল, এই sequence এ 3 থেকে শুরু করে পরবর্তী সংখ্যাগুলির ক্ষেত্রে যদি পরেরটিকে আগেরটা দিয়ে ভাগ করি সব ক্ষেত্রেই ভাগফল 1:6 যেমন 5/3 = 8/5 = 13/8 = 1.6. এই 1.6 কে বলে সোনালী অনুপাত বা golden ratio . মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গে এই golden ratio দেখা যায়। অর্থাৎ একটি অঙ্গের দৈর্ঘকে 1.6 দিয়ে গুণ করলে আর একটি অঙ্গের দৈর্ঘ পাওয়া যায়।

আকাশে ওড়া পাখির ঝাঁকে পাখির সংখ্যাও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ফিবনক্কি sequence মেনে চলে। কেউ যদি এই ঝাঁকের একটি পাখিকে মেরে ফেলে তাহলে বাকি পাখিগুলি আবার ফিবনক্কি সংখ্যা মেনেই নতুন ঝাঁক তৈরী করে।

হিন্দু ধর্মের ক্ষেত্রে এই ফিবনক্কি সংখ্যার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। হিন্দু ধর্মে এই ফিবনক্কি সংখ্যাকে বলা হয় ঈশ্বরের হাত। হিন্দু ধর্মের যে কোন পূজার্চ্চনায় ভোগ দেওয়া হয়। 1, 3  অথবা 5 তিনটিই ফিবনক্কি সংখ্যা। বেলুড় মঠে কালীপূজায় মাছ ভোগ দেওয়া হয়  13  রকম,  13 একটি ফিবনক্কি  সংখ্যা। আবার দেবতার মূর্তি তৈরী হয় অষ্টধাতুর, অর্থাৎ 8 একটি ফিবনক্কি সংখ্যা। বৈদিক যুগ থেকে পঞ্চব্যঞ্জন বা 55 ভোগের যে চল আছে , সেক্ষেত্রে 5  ও  55  উভয়ই ফিবনক্কি সংখ্যা। হিন্দু ধর্মে  108  সংখ্যাটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মহামায়ার 108  নাম বা  108  জবার  মালা অথবা  108 বার নাম জপ এগুলি আমরা প্রায়সই করে থাকি, এই  108  সংখ্যাটির গুরুত্ব না বুঝে।  108 তথা অষ্টোত্তর শত হল পূর্ণতার প্রতীক। এই পূর্ণতার উপর থাকে 8 অর্থাৎ ফিবনক্কি সংখ্যা অর্থাৎ ঈশ্বরের হাত।

আশ্চর্যের বিষয় হল, যখন আমাদের দেশে অন্ধকার যুগের সূত্রপাত; যখন নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগার জ্বালিয়ে দিয়ে ভারতবর্ষে বিদ্যাচর্চার ঐতিহ্যকে ভস্মীভূত করা হয়েছে সেই সময় ইউরোপের মানুষরা চর্চা করছেন ফিবনক্কি সংখ্যা নিয়ে। আবার এই ফিবনক্কি  সংখ্যা সম্পর্কে বৈদিক যুগে মুনি ঋষিরাও অবহিত ছিলেন। সেইজন্য সনাতন ধর্মে পূজার্চ্চনার ক্ষেত্রে ফিবনক্কি  সংখ্যার প্রয়োগ দেখা যায়। কিন্তু ইতিহাস লিপিবদ্ধ না রাখার জন্য আমরা বৈদিক যুগের অনেক কিছুই হারিয়ে ফেলেছি যেগুলি পরবর্তীকালে ইউরোপের বিজ্ঞানীরা নিজেদের নামে বের করেছে। ফিবনক্কি sequence তার অন্যতম উদাহরণ।

লেখক পরিচিতি – গণিতের অধ্যাপক, নগর কলেজ -কান্দি।

Leave a Reply