শাশ্বত সনাতনসংস্কৃতি

গীতার সমাজ দর্শন –

– উদয়ন চক্রবর্তী

 

বর্তমানকালে ভারতীয় হিন্দু সমাজকে যদি আমরা অবলোকন করি, তবে প্রাথমিক দৃষ্টিতে দুটি ভিন্ন আঙ্গিকের ব্যাখ্যার সম্মুখীন হই – সমাজের একটি অংশ দীর্ঘকালীন সামাজিক বঞ্চনার অভিযোগ করেন, অপরপক্ষীয়গণ সাংবিধানিক বঞ্চনার শিকার বলে নিজেদের মনে করেন। এই উভয় পক্ষের বিপরীত যুক্তি যদিও পরস্পরবিরোধী, কিন্তু তা একটি সামান্য সমস্যার দিকে অঙ্গুলীহেলন করে – তা হল বর্তমান হিন্দু সমাজে বিদ্যমান জাতিভেদ বা বর্ণভেদ প্রথা।

অতীতে ও বর্তমানে বহু তত্ত্বজ্ঞ পণ্ডিত ও  সমাজবিজ্ঞানীগণ এই সমস্যার উৎপত্তি বিশ্লেষণে নিজ নিজ দৃষ্টিভঙ্গী অনুযায়ী বহু ধাকারণের উল্লেখ করেছেন। তাই বর্তমান নিবন্ধে সেগুলির চর্বিত-চর্বণ নিষ্প্রয়োজন। আমরা যদি মুহুর্তের জন্য ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ঈশ্বরত্ব বিস্মৃত হয়ে তাঁকে একজন আদর্শবাদী মানব-মঙ্গলের পথপ্রদর্শক হিসাবে ধরে নেই, পরম-পুরুষকে যদি ক্ষণিকের তরে নিজের সমস্তঐশ্বর্য দূরে সরিয়ে রেখে একজন মাধুর্যমণ্ডিত রক্তমাংসের মানুষ ভাবার ভুল করি, তবে কি পাঠকের মনে এই প্রশ্ন জাগেনা, যে তাঁর প্রাণপ্রিয় পার্থসারথী কী ধরণের আদর্শ সমাজের স্বপ্ন দেখেছিলেন?

প্রকৃতি ত্রিগুণময়ী – সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ গুণের তিনটি ডোরে জগদীশ্বর সমস্ত জগতে পরিব্যাপ্ত হয়ে সমস্ত জগতকে আশ্রয় প্রদান করেছেন। ঈশাবাস্য উপনিষদের প্রথম মন্ত্রেও এই ভাবনা অভিব্যক্ত হয়েছে। বেদান্তীগণ জগতকে শুধু ঈশ্বরের আলয় রূপেই দেখেন না, অদ্বৈতবাদের দৃষ্টিতে এই সৃষ্টি অদ্বিতীয় ঈশ্বরীয় চেতনার বিবর্তন। তাই এই জগত – “চিদাশ্রিত, চিদ্বিবর্ত, চিন্ময় এবং চিদ্বিলাস!”

যদি এই জগতের “হর কঙ্কর মে শঙ্কর হ্যায়”, তাহলে আমরা এত ভেদ প্রত্যক্ষ করি কেন? সনাতন ধর্মে এর উত্তর ঈশ্বরের ‘চিদ্বিলাস’ বা লীলার জন্য! ত্রিগুণের ন্যুনাধিক্যজনিত তারতম্যের কারণে একই আত্মার এই পৃথগত্ব বোধ জন্মায়।  শ্রী ভগবান তাই গীতায় অভূতপূর্ব উদ্ঘোষণা করলেন –
“গুণ ও কর্মের বিভাগ অনুসারে আমি এই বর্ণচতুষ্টয় সৃষ্টি করিয়াছি!” (গীতা, অধ্যায় ৪, শ্লোকসংখ্যা ১৩)

জন্মের সময় প্রতিটি শিশু কিছু অন্তর্নিহিত সম্ভাবনা ও প্রবণতা নিয়ে জন্মায়। আর জন্মসূত্রে প্রতিটি শিশুই অন্য শিশুদের চাইতে আলাদা। সমাজের চাহিদা মেটাতে গিয়ে যদি শিশুর এই ব্যক্তিগত প্রবণতাকে বিকশিত হওয়ার সুযোগ দেওয়া না হয়, তবে সে পরবর্তী জীবনে একজন দুর্বল মানুষে পরিণত হবে। আর অসফল মানুষের সমষ্টি হিসাবে সমাজও হবে সৃজনী শক্তিহীন। বর্তমানকালের বাজার অর্থনীতি আর শিক্ষাব্যবস্থা যেন তাই অসফল মানুষ গড়ার কারখানা; আর অভিভাবককুল এই দক্ষযজ্ঞের যজমান, আর বিদ্যার্থী কুল যেন আহুতিপ্রদানের সমিধ!

একটি সমাজে প্রতিটি মানুষের পৃথক পৃথক চাহিদা অনুযায়ী পরিপোষণের জন্য প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো গড়ে তোলা বাস্তবে অসম্ভব। তাই শ্রীভগবান বিধান দিলেন–“গুণ” অনুযায়ী শ্রেণীবদ্ধকরণের এবং “কর্ম” অনুযায়ী সামাজিক অবস্থান নির্ণয়ের। যে ব্যক্তির মধ্যে সাত্ত্বিক প্রবণতা বেশি সেই ব্যক্তি ব্রাহ্মণ, যার মধ্যে রাজসিক প্রবণতা বিদ্যমান সে হল ক্ষত্রিয়, যার ভেতর রাজসিক ও তামসিক মিশ্র স্বভাব উপস্থিত সে বৈশ্য, আর যে মানুষ নিতান্ত জড় প্রকৃতির, সর্বদা আলস্যভাব যার মধ্যে, সেই তমোগুণাশ্রিত মানুষ হল শুদ্র। এখানে উল্লেখ্য যে এই শ্রেণি নির্ণয়ের ব্যাপারে জন্ম বা বংশপরিচয়ের কোন ভূমিকা নেই।

গীতা-প্রদর্শিত সমাজব্যবস্থায় প্রত্যেক ব্যক্তি তার অন্তর্নিহিত স্বাভাবিক প্রবণতা অনুযায়ী সমাজে নিজের অবস্থান সম্পর্কে সচেতন হয়ে নিজেকে সেইরূপ সমাজোপযোগী কর্মে নিয়োজিত করলেই সমাজের মঙ্গলএবংব্যক্তি জীবনে সফলতার প্রাদুর্ভাব হবে।আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় গীতার দর্শন আগাগোড়া ‘সমাজতান্ত্রিক’, কেননা এতে প্রতিটি মানুষের ‘কর্মের অধিকার’ (Right to Work) স্বীকৃত হয়েছে। আবার অন্যদিকে গীতার দর্শন ‘ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদী’, কারণ এই সমাজদর্শনে ব্যক্তির অধিকারেরও নিজস্ব ইচ্ছা ও প্রবণতার স্বাধীনতা প্রদান করা হয়েছে।  দুই বিপরীতমুখী আদর্শের সামঞ্জস্যবিধান করতে গিয়ে দার্শনিক শ্রীকৃষ্ণ দুইটি মূলনীতির আশ্রয় গ্রহণ করেছেন –
১ম নীতি–সমাজ ব্যক্তিকে তার জন্মগত গুণ ও কর্মপ্রবণতার প্রতি লক্ষ্য না রেখে যে কোন কর্মে প্রবৃত্ত করতে পারবে না; এবং,
২য় নীতি – ব্যক্তি নিজের জন্মগতগুণ ও কর্মপ্রবণতার বিকাশ না ঘটিয়ে মর্জিমাফিক সমাজে যে কোন বৃত্তি(Social Role) গ্রহণ করতে পারবে না।

আধুনিক সমাজ ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর পরিপ্রেক্ষিতে এই দুটি সাধারণ নিয়মের নির্যাস রূপে আমরা আরো কতকগুলি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় নীতিমালা পেতে পারি –
১. প্রতিটি ব্যক্তির জন্মগত গুণ ও কর্মপ্রবণতার পরিপূর্ণ বিকাশ সাধন প্রতিটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব; একেই ‘রাজধর্ম’ বলা হয়েছে;
২. প্রত্যেক নাগরিকের কর্তব্য রাষ্ট্রের কল্যাণের জন্য নিজের অন্তর্নিহিত সামর্থ্যকে পরিপূর্ণরূপে নিয়োগ করা;
৩. প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক যাতে নিজের বিকশিত সামর্থ্যকে কর্মে প্রযুক্ত করে রাষ্ট্রের কল্যাণ করতে পারে, সেইজন্য যথোপযুক্ত এবং যথেষ্ট সংখ্যক বৃত্তির(Social Roles)  সৃষ্টি করা এবং সমাজের প্রতিটি বৃত্তির জন্য উপযুক্ত দক্ষ কর্মযোগী ব্যক্তির বিকাশ সাধন করা বিধেয়;
৪. নাগরিকের নিজের অন্তর্নিহিত গুণ ও কর্মপ্রবণতার বিরুদ্ধ অনুপযোগী বৃত্তি গ্রহণের মাধ্যমে সমাজের সৃজনশীলতা ও উৎপাদন ক্ষমতার অপচয় রোধ করা প্রয়োজন।
সমাজ ও ব্যক্তির বিপরীতমুখী চাহিদা ও স্বার্থের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করে সমাজের ভারসাম্য রক্ষার যে প্রচেষ্টা তারই নাম ‘ধর্ম’। এই ধর্ম যখন বিঘ্নিত হয়, অর্থাৎ ব্যক্তি ও সমাজের স্বার্থের মধ্যে যখন ভারসাম্যের হানি ঘটে তখনই সমাজে এক শ্রেণির মানুষ সমাজের বাকি অংশের চেয়ে অধিক ক্ষমতাশালী হয়ে সমাজজীবনের ধারাপ্রবাহ কে বিপন্ন করে। আর তখনই সমাজপুরুষের অবতরণের প্রয়োজন হয়।

ব্যক্তির অন্তর্নিহিত গুণ ও কর্মপ্রবণতাকে ভাগ করার পর শ্রীভগবান সমাজের বৃত্তি সমূহকেও(Social Roles) চার ভাগে বিভক্ত করলেন –
১. তমোগুণ প্রধান মানুষগণ সাধারণতঃ জড়তাসম্পন্ন এবং বিলাসপ্রিয় হন। তাই সমাজের অন্যান্য বর্ণের মানুষদের কর্মে সহযোগিতার মাধ্যমে তাঁদের মধ্যে ও অন্য সকল বর্ণের মানুষদের অনুরূপ প্রবৃত্তিগুলি জেগে উঠবে। আবার তাঁরা কল্পনাপ্রবণ। তাই তাঁদের যদি শিল্পকলার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় তবে তাঁদের হাতে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শিল্পকর্ম সমূহ গড়ে উঠতে পারে।
২. তমোগুণ ও রজোগুণ যাঁদের মিশ্র স্বভাব তাঁরা কল্পনাপ্রবণ হওয়ার পাশাপাশি উদ্যমী হন। তাই তাঁদের জন্য দেশের আর্থিক সমৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত আধুনিক কৃষি, পশুপালন, ব্যবসাবাণিজ্য প্রভৃতি বৃত্তি উপযুক্ত।

এই উভয় বর্ণই হল গ্রিক দার্শনিক প্লেটোর ভাষায় Producers.

৩. সমাজে যাঁদের মধ্যে রাজসিক ভাব প্রবল, তাঁদের শাসক ও যোদ্ধার সামাজিক ভূমিকায় (Social Role) নিজেকে নিযুক্ত করা। কারণ – “পরাক্রম, তেজ, ধৈর্য, কর্মকুশলতা, যুদ্ধেঅপরাঙ্মুখতা, দানে মুক্তহস্ততা, অপরদের শাসন করার ক্ষমতা – এগুলি এঁদের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি।” (অধ্যায় ১৮, শ্লোকসংখ্যা ৪৩)……

প্লেটোর বর্ণনায় এঁদেরই নামAuxiliaries.

৪. এছাড়া সমাজে যারা সাত্ত্বিক গুণাবলীসম্পন্ন, তাঁরা হবে Civil Society বা সুশীলসমাজের অঙ্গ। এঁরা শাসনক্ষমতাকে পরোক্ষভাবে নিয়ন্ত্রণ করবে এবং রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে সুরক্ষিত রাখবে। এই শ্রেণিকেই শ্রীভগবান ব্রাহ্মণ বলে চিহ্নিত করেন, এবংগ্রিস দেশের মহান পণ্ডিত প্লেটো এঁদেরকে বলেন The Guardian Class.
প্লেটো বলছেন, মানব আত্মার তিনটি ভাগ – Appetite, Spirit, এবং Reason. ঠিক যেন আমাদের সনাতন ধর্মের তমঃ, রজঃ ও সত্ত্বগুণের মতো। এই তিনটি ভাগের প্রাবল্য অনুযায়ী সমাজের সকল মানুষকে প্লেটো যথাক্রমে Producers, Auxiliaries, এবংThe Guardian Class – এই তিন শ্রেণিতে ভাগ করেছেন। এই তিন শ্রেণি ও আমাদের সনাতন ধর্মে শ্রীভগবান প্রণীত ‘বৈশ্য-শূদ্র’, ‘ক্ষত্রিয়’ এবং ‘ব্রাহ্মণ’ – এই বর্ণব্যবস্থার অনুরূপ।

গীতায় শ্রীভগবান ক্ষত্রিয়াদি তিনটি বর্ণের স্বভাব নির্ণয়ের পাশাপাশি ব্রাহ্মণদের সংজ্ঞানিরূপণের প্রয়োজন কেন বোধ করলেন? মহাভারতের সময়কালে বর্ণাশ্রম ব্যবস্থা গুণানুক্রমিক হওয়ার পরিবর্তে ক্রমশঃ বংশানুক্রমিক হয়ে পড়ে। বৈদিক কালে ক্ষত্রিয় রাজা বিশ্বামিত্র নিজ তপস্যাবলে ব্রাহ্মণত্ব অর্জন করেছিলেন। ব্রাহ্মণ সন্তানেরা যদি পিতার মতো সাত্ত্বিক প্রবৃত্তি জীবনে লালন নাকরত, তবে তাদেরও নিম্নকুলে অধঃপতন হত।

তাই বৈদিক কালের ব্রাহ্মণ ঋষিগণ নিজেদের সামাজিক মর্যাদা বাঁচিয়ে রাখতে কঠোর তপশ্চর্যাপূর্ণ জীবন অতিবাহিত করতেন। স্মৃতিকারগণও সমাজে ব্রাহ্মণগণের জন্য সর্বাধিক নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগ করেছেন। ব্রাহ্মণগণের সম্মতি ব্যাতীত কোনো ক্ষত্রিয়রাজ-সিংহাসনে অভিষিক্ত হতে পারতেন না।  এরই একটি আনুষ্ঠানিক রূপ ছিল ‘রাজ্যাভিষেক’, যাতে ব্রাহ্মণ পুরোহিতগণ যজুর্বেদ হতে মন্ত্র উচ্চারণ করতেন – “সোমোহস্মাকংব্রাহ্মণানাম্ রাজা” (যজুঃ/১০/১৮) অর্থাৎ – হে রাজন, তুমি সিংহাসনে আসীন হয়ে প্র জাপ্রতিপালন কর। কিন্তু আমাদের শাসন করতে যেও না! কারণ আমাদের রাজা শুধুমাত্র ‘সোম’ নামধারী ঈশ্বর।

এই ছিল প্রাচীন ভারতে গণতন্ত্রের আদিস্বরূপ, যেখানে শাসকবর্গের উপর সিভিল সোসাইটি বা ত্যাগী ব্রাহ্মণদের পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ চলত। কিন্তু বিজ্ঞানের নিয়মানুযায়ী কোন সুন্দর বস্তুই চিরকাল স্থায়ী হয় না। ধীরে ধীরে গুণানুক্রমিক বর্ণধর্ম যখন বংশানুক্রমিক রূপ নেয়, সমাজে ব্যক্তির গুণ ও কর্মপ্রবণতার ভিত্তিতে সামাজিক স্তরে উন্নয়ন বা অধঃপতন যখন বন্ধ হয়ে যায়, তখন সমাজও গতিহীন হয়ে পড়ে।

লর্ড এক্টন সাহেবের উক্তিটি এক্ষেত্রে প্রণিধানযোগ্য – Power tends to corrupt, and absolute power corrupts absolutely. অধঃপতনের ভয় দূরীভূত হলে অতিমাত্রায় ক্ষমতা কেন্দ্রিকরণের ফলে তৎকালীন বোদ্ধা সমাজেরও তাই হয়েছিল। ধৃতরাষ্ট্রের মতো অপদার্থ নেতা আর পুরোহিত কৃপাচার্য ও গুরু দ্রোণাচার্যের চোখের সামনে ক্ষমতালোভী দুর্যোধনের উত্থান এই সামাজিক অবক্ষয়কেই চিহ্নিত করে।

তাঁরা শুধুমাত্র নিজের নিজের ক্ষমতার কেন্দ্রটিকে সুরক্ষিত রাখতে দুর্যোধনকে প্রশ্রয় দিয়ে সাহায্য করেছেন। দ্রোণাচার্যের ভিক্ষুক ব্রাহ্মণ হতে হস্তিনাপুরের ক্ষমতার অলিন্দে উত্থান আর পাঞ্চাল-নরেশ দ্রুপদের প্রতি দীর্ঘলালিত প্রতিহিংসার অনল তাঁকে বাধ্য করেছে ধর্মাশ্রয়ী পাণ্ডবদের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলতে।

গুণ ও কর্মপ্রবণতাভিত্তিক যে আদর্শ সমাজের চিত্র দার্শনিক শ্রীকৃষ্ণ কল্পনা করেছিলেন, তা সফল করার জন্য প্রয়োজন ছিল এক যুগান্তকারী বিপ্লবের। তাই কুরুক্ষেত্রের প্রান্তরে যে যুদ্ধ হয়েছিল, তা শুধু কৌরব বনাম পাণ্ডবদের ক্ষমতা দখলের লড়াই ছিল না; এটা ছিল এক অবক্ষয়িত সমাজব্যবস্থার মূলোৎপাটন করে এক সম্পূর্ণ নতুন সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল ‘ব্রাহ্মণ’ শব্দটির পুনর্মূল্যায়ণ করার। আর সমাজপুরুষ শ্রীকৃষ্ণ ব্রাহ্মণের নতুন সংজ্ঞা নিরূপণ করলেন এইভাবে – “যাঁর মধ্যে মনের নিয়ন্ত্রণ, ইন্দ্রিয়সংযম, তপস্যা, শুচিতা, ক্ষমা, বিদ্যা, বিবেক, সরলতা এবং ঈশ্বরে সমর্পিতবুদ্ধি – এই নয়টি লক্ষণ থাকবে, তিনিই ব্রাহ্মণ!” (অধ্যায় ১৮, শ্লোকসংখ্যা৪২)

এই মাপকাঠিতে বিচার করলে দ্রোণ-কৃপ প্রমুখের তুলনায় মহাত্মা বিদূর অধিকার্থে ব্রাহ্মণ। তাই সমাজপুরুষ শ্রীকৃষ্ণ ব্রাহ্মণত্বের এই নতুন সংজ্ঞা নিরূপণের মাধ্যমে প্রকারান্তরে ক্ষমতাশীল দ্রোণাচার্য, কৃপাচার্য প্রমুখের ব্রাহ্মণত্ব খারিজ করলেন; যা ছিল গতানুগতিক সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক প্রত্যক্ষ বিদ্রোহ! সেই অর্থে শ্রীকৃষ্ণ একজন আদর্শ বিপ্লবী!

আমরা পূর্বেই আলোচনা করেছি, সমাজ ও ব্যক্তির বিপরীতমুখী চাহিদা ও স্বার্থের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করে সমাজের ভারসাম্য রক্ষার যে প্রচেষ্টা তারই নাম ‘ধর্ম’। এই ধর্ম যখন বিঘ্নিত হয়, অর্থাৎ ব্যক্তি ও সমাজের স্বার্থের মধ্যে যখন ভারসাম্যের হানি ঘটে তখনই সমাজে এক শ্রেণির মানুষ সমাজের বাকি অংশের চেয়ে অধিক ক্ষমতাশালী হয়ে সমাজজীবনের ধারাপ্রবাহকে বিপন্ন করে। আর তখনই সমাজপুরুষের অবতরণের প্রয়োজন হয়।

আর এই সমাজপুরুষ শুধুমাত্র একজন ব্যক্তিবিশেষ নন, তিনি সমগ্র সমাজের সকল শ্রেণির মনুষ্যকুলের প্রতিনিধিত্বকারী! কুরুক্ষেত্রের রণাঙ্গনে অর্জুন তাই বাসুদেব শ্রীকৃষ্ণের মধ্যে সমগ্র সমাজের সম্মিলিত বৈপ্লবিক শক্তিকে অবলোকন করেন –
“অনেকবাহূদরবক্ত্রনেত্রংপশ্যামিত্বাংসর্ব্বতোহনন্তরূপম্।
নান্তং ন মধ্যং ন পুনস্তবাদিংপশ্যামিবিশ্বেশ্বরবিশ্বরূপ।।” (বিশ্বরূপদর্শনযোগ, শ্লোকসংখ্যা ১৬)
অর্জুনের এই প্রত্যক্ষদর্শনের পর দেবকীপুত্র শ্রীকৃষ্ণ আর সসীম মানব মাত্র থাকেন না, তিনি হয়ে ওঠেন অসীম ঈশ্বর! তখন আর তিনি বসুদেবের পুত্র বাসুদেব নন, তিনি সর্বভূতে বাস করেন বলেই তিনি বাসুদেব!

বর্তমান সময়কালে আমাদের মনন যখন বিবিধ নিত্য নতুন সামাজিক দর্শন ও প্রয়োগের দ্বন্দ্বে সংশয়ান্বিত, আসুন আমরাও অর্জুনের মত শ্রীভগবানের চরণকমলে আত্মনিবেদন করি “শিষ্যস্তেহহংশাধিমাংত্বাংপ্রপন্নম্।।” হে ভগবান, তুমিই আমাদের শ্রেয় মার্গের পথ প্রদর্শন করো! কারণ, তুমি কথা দিয়েছো, যখন যখন ধর্মের হানি ও অধর্মের উত্থান ঘটবে, তখন তখন দুষ্কৃতিদের বিনাশ ও সাধুব্যক্তিগণের পরিত্রাণের জন্য এবং ধর্মের পুনরভ্যুদয়ের নিমিত্ত, তুমি আসবে! “তুমি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ!”

।।ওঁ তৎ সৎ।।

 

(লেখক পরিচিতি: ত্রিপুরা রাজ্যের তেলিয়ামুড়া শহর নিবাসী। ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর, বর্তমানে ইন্দিরা গান্ধী জাতীয় মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস পাঠরত।)

Leave a Reply