অতীত যা লেখেনিরাজনীতি

নব যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল রোধিবে কে?

“… দুর্বলেরে রক্ষা করো, দুর্জনেরে হানো,
নিজেরে দীন নিঃসহায় যেন কভু না জানো…”

 

আজ ৮ই অক্টোবর। ১৯৫০ সালে আজকের দিনেই ভারতবর্ষে চিরদিনের জন্য পদার্পণ করেন Constituent Assembly of Pakistan র ৯৬জন প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের অন্যতম ও পাকিস্তানের প্রথম Labour & Law Minister শ্রী যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল ওরফে যোগেন্দ্রনাথ আলী (তৎকালীন জাতীয়তাবাদী প্রেস অনুযায়ী) । এবং পরবর্তী দিন, ৯ই অক্টোবর, তাঁর একদা সুহৃদ ও পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জনাব লিয়াকত আলীকে পশ্চিমবঙ্গ থেকে তাঁর পদত্যাগপত্র প্রেরণ করেন। প্রেক্ষাপট – হিন্দু গণহত্যা, পূর্ব পাকিস্তান – ১৯৫০। যদিও এর আগেও এই বিষয় নিয়ে তাঁর সাথে লিয়াকত আলীর পত্রালাপ হয়েছিল এবং প্রত্যুত্তরে পাকিস্তানী প্রধানমন্ত্রী veiled threat/অবগুন্ঠিত ভীতিপ্রদর্শন/নিঃশব্দ হুমকি দিয়েছিলেন। উচ্চবর্ণীয় হিন্দুর বিরুদ্ধে সংগ্রামী, নিম্নবর্ণীয় (তৎকালীন হিন্দু সমাজ ব্যবস্থা অনুসারে) হিন্দুদের – ‘৪৭ পরবর্তী পাকিস্তানে রয়ে যাওয়ার প্রধানতম guaranteer যোগেনবাবু “যঃ পলায়েতে স জীবতি” মন্ত্রোচ্চারণ করে পলায়ন করে শেষ আশ্রয় নেন ব্রাহ্মণাধিপত্যের ভারতবর্ষে। কথিত আছে, শেষ যাত্রার আগে তিনি বরিশালের অবিসংবাদী ও সর্বজনশ্রদ্ধেয় শ্রী সতীন সেনের পা ধরে অঝোরে কেঁদেছিলেন। সতীনবাবু বিরক্ত হয়ে পা সরিয়ে আসন ত্যাগ করেন।

যদি যোগেনবাবু কিঞ্চিৎ অন্যমার্গীয় হতেন তাহলে ১৯৫০র ভয়াবহতার সম্যক প্রতিক্রিয়া ও প্রতিরোধ শুধু এ বঙ্গেই নয়, ও বঙ্গেও হত। এবং বাঙ্গালী হিন্দু জাতিগতভাবে সেই নৃশংসতার জের কাটিয়ে উঠতে পারেনি এখনও – কি রাজনৈতিক, কি অর্থনৈতিক, কি সাংস্কৃতিক – প্রত্যেক অর্থেই।

গত প্রায় ৮ দশক ধরে বাঙ্গালীর গৃহে গৃহে যোগেন্দ্রনাথবাবুর মুন্ডপাত ও শ্রাদ্ধকৃত্য হয়েছে, হবেও। স্বাভাবিক এবং উচিৎও। কিন্তু – এর বিকল্প কি? অতীতের ব্যর্থতার চর্বিতচর্বণ আর আলাপ, প্রলাপ, বিলাপ নতুবা নব দিগন্তের সন্ধান?

এইস্থানেই প্রশ্ন – যোগেন্দ্রনাথবাবুর উত্থান আকস্মিক হয়নি, কোন অবতার দ্বারা হঠাৎ তাঁর সামাজিক প্রতিষ্ঠাও হয়নি। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, তাঁর উত্থান শহর কলকাতা ও গ্রাম বাংলার প্রতি শহর কলকাতার বঞ্চনা থেকে। ‘৩০র দশকের (অসামান্য যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও) শ্রী বীরেন্দ্রনাথ শাসমলের প্রতি কলকাতা-সংলগ্ন কংগ্রেসের বিগ ফাইভের অবজ্ঞা ও বঞ্চনা মফস্বল ও গ্রাম বাংলায় যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল তার মধ্য দিয়েই উত্থান যোগেন্দ্রনাথবাবুর। নিম্নবর্ণের হিন্দুর প্রত্যাশা ও তা নিয়ে রাজনীতি সেই প্রতিক্রিয়ার এক political tool মাত্র।

বাঙ্গালী হিন্দুর সার্বিক ধ্বংসের জন্য ব্রিটিশের ভারত রক্ষা আইন-১৯৩৫ ও তার সার্বিক প্রণয়ন ১৯৩৭ সালে, ঐসলামিক মৌলবাদের সহিংস রাজনীতি, বাঙ্গালী হিন্দুর প্রতি সর্বভারতীয় কংগ্রেসের চরম বিশ্বাসঘাতকতা – ১৯৩৭র নির্বাচনে বিজয়ী হওয়া সত্ত্বেও সর্বভারতীয় নীতি রূপায়ণের জন্য বঙ্গে সরকার গড়তে অনীহা, ফলতঃ ফজলুল হকের প্রজা কৃষক পার্টির সরকার গঠন মুসলিম লীগের সাথে এই অসহনীয় অবস্থায় ঘৃতাহুতি দেয়। বিনা ক্ষতিপূরণে জমিদারী প্রথার বিলোপ অর্থাৎ বিনা বাক্যব্যয়ে হিন্দুর জমি হস্তগত করার ঐসলামিক প্রচেষ্টা ও তার বিরুদ্ধে রাজ্য কংগ্রেস-হিন্দু মহাসভার একযোগে desperate struggle, শ্রী নীরোদ চৌধুরী দ্বারা বর্ণিত – ‘বাঙ্গালী হিন্দুর দেখার কিছু থাকলো, করার কিছু থাকলোনা’ – হিন্দুর অবর্ণনীয় সামাজিক অবস্থার দিকই নির্দেশ করে। এই অবস্থায় যোগেন্দ্রনাথবাবুর রাজনীতি মুসলিম লীগের সাথে যে অসহনীয় অবস্থার সৃষ্টি করে তা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়নি আজও। যদিও শ্রী প্রমথ রঞ্জন ঠাকুরের নেতৃত্বে নমঃশুদ্র গোষ্ঠীর এক বিশাল অংশের utter pragmatism র স্বার্থে ভারতের পক্ষেই থাকা এক অসামান্য ঐতিহাসিক সাফল্য।

মূল সমস্যা হল – বাঙ্গালী হিন্দুর একান্ত স্বার্থবাহী – তার ধর্ম, ভাষা ও অর্থনৈতিক স্বাতন্ত্র – সংক্রান্ত চিন্তাধারা কখনো স্থান পায়নি। কেন পায়নি? এর মূল কারণ, প্রত্যেকেই তার নিজস্ব জমিকেই মাতৃভূমি সাব্যস্ত করে বাঁচতে চেয়েছে। তাই এখনও ময়মনসিংহ, মেদিনীপুর, বীরভূম বা বরাপেটা বাঙ্গালী হিন্দু চরমতমভাবে নির্যাতিত হলেও বাকি জনসংখ্যা থাকে নির্বিকার। বিহার-ঝাড়খণ্ডে নির্বিচারে বাংলা-মাধ্যম বিদ্যালয় বন্ধ হলেও বাঙ্গালী থাকে নির্বিকার। গত প্রায় ৭৫ বছরে পশ্চিমবঙ্গে যে সামান্য অর্থনৈতিক প্রগতি হয়েছে তাও মূলত কলকাতা ও কলকাতা-সংলগ্ন। শহর কলকাতার পাশে অন্য স্বনির্ভর অর্থনৈতিক ক্ষেত্র তুলে ধরার প্রয়োজন বোধ করেনি কোন রাজ্য সরকার। ফলতঃ আজ গোর্খাল্যান্ডের রণবাদ্য শোনা যায়। বিশ্বাস, সীমানা ক্ষুদ্র হলেই অধিকতর মনোযোগ পাওয়া যায়। কিন্তু honest intent কোথাও নেই। তাহলে? আরও ভাগ? দৃষ্টান্তমূলক ভাবে, সমগ্র উত্তরবঙ্গ জুড়ে বঞ্চনার যে ভয়াবহ গাথা আছে আর তার প্রতি যে ন্যায়সঙ্গত, পুঞ্জীভুত ক্ষোভ রয়েছে স্থানীয় জনসাধারণের মধ্যে এবং পশ্চিমবঙ্গের অন্যত্র তাতে আরোও অন্তত ১০০জন যোগেন্দ্রনাথবাবুর মাথা চাড়া দেওয়া বিভিন্ন সূত্রে সময়ের অপেক্ষা মাত্র। যে কোন সময়ে সেই বিস্ফোরণ হতে পারে।

সেই যুগের বাঙ্গালী নির্লিপ্ত ছিলেন তাই দেশভাগের ভয়াবহতা, ঐসলামিক মৌলবাদের অকথ্য অত্যাচার আছড়ে পড়েছিল, যোগেন্দ্রনাথ মন্ডলের ঐতিহাসিক ভ্রান্তি তাকে শক্তিশালী করেছিল। এ যুগের বাঙ্গালীকে স্পষ্ট (outspoken) হতে হবে তার ইচ্ছা, অনিচ্ছা ও do’s and don’ts কে কেন্দ্র করে। তারপরেই আসবে বহু চর্চিত শব্দ regimentation, iron discipline ইত্যাদি ইত্যাদি।

১৯৩৭এ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘শ্রী-পদ্ম’ চিহ্ন বিলোপের পরেই সেই যে শ্রী অন্তর্হিত হয়েছে বাঙ্গালী হিন্দু সমাজ থেকে তা আর ফিরে আসেনি। আর যোগেন্দ্রনাথ মন্ডলও আমরা চাই না। তাই সচেষ্ট হতে হবে আমাদের। আর এই বিশ্বাস নিয়ে – নগর পুড়লে দেবালয় রক্ষা পায় না, একা বাঁচা যায়না। আপনার ধর্ম-ভাষা সমন্বিত জাতির বিনাশ অন্যত্র হলে আপনার সর্বনাশ অবশ্যম্ভাবী। 

Leave a Reply