আঙিনা

বোধনের বাদ্যি (ছোটগল্প)

নয়নতারা বসে আছে। অনেকক্ষণ ধরে। কী করা উচিৎ ছিল তার?  অবশ্য কদিন ধরেই ভাবনাটা আসছে। ঠিক কী করা উচিৎ এই মেয়েকে!!! আর সেই লোকটাকে? ওইরকম দুবলা পাতলা মেয়েটাকে যে মেরে কালশিটে ফেলে দেয়!!! ঠান্ডা মাথায় বোঝানো নাকি পুলিশে খবর দেওয়া! তার মতো নিপাট গৃহবধূর পক্ষে কতোটাই বা সম্ভব। রোজ সকালে যখন কাজে আসে ওর ওই পূর্ণিমার চাঁদের মত গোল মুখটা দেখলে মনে হয় ঠিক নামটাই রাখা হয়েছিল, পুনিয়া। হয়তোবা পূর্ণিমাই ছিল, দেহাতি অপভ্রংশে পুনিয়ায় ঠেকেছে। তাতে মাধুর্য নষ্ট হয়নি এক ফোঁটাও। না রূপে, না স্বভাবে। তাই নয়নতারার ছোট্ট মেয়েটা যখন ঘুরঘুর করে ওর পেছন পেছন তখন বারণ করতে পারে না। শাশুড়ির খুব আপত্তি। বাড়ির কাজের লোকের সঙ্গে এত ভাব কিসের। ঠাকুমার বেশ ন্যাওটা হলেও মায়ের প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয়ে সে ঘোরে পুনিয়ার সঙ্গে। দুজনকে মানায় বেশ। কথাটা মনে করেই হাসি ফোটে নয়নতারার মুখে। ছোটখাটো চেহারার ফিটফাট সাজ পুনিয়ার। কপালে একটা লাল টিপ, দুহাত ভর্তি রঙবেরঙের কাঁচের চুড়ি রিণরিণ করে আর মুখে অজস্র বুলি। বাংলা হিন্দি মেশানো এক বুলি, বড় মিঠে লাগে শুনতে।  আর ওর সঙ্গে ঘোরে মেয়ে, বছর চারেকের, ধবধবে সাদা তুলোর মতো পলকা। মুখে কথা নেই, কারণ মুখে সবসময় বুড়ো আঙুলটি ঢোকানো। অনেক বুঝিয়েছে, ভয়ও দেখিয়েছে, কাজ হয়নি। এমনিতে অসভ্য নয়, অবাধ্য নয়, জেদিও নয়, এই একটা ব্যাপারে অনড়। রিটায়ারমেন্টের প্রান্তে থাকা রাশভারী শ্বশুর মশাই, আধা দজ্জাল শাশুড়ি, চাকুরে স্বামী আর দুরন্ত কিশোর ছেলেকে সামলে মেয়েটাকে খুব সময় দিতে পারেনা। কিন্তু তাতে কোন সমস্যা নেই। ঠাকুমার সঙ্গে পাড়া বেড়িয়ে এসে দাদুর হাতে দুধ রুটি মাখা দিব্যি খেয়ে নেয়। আবার দাদার সঙ্গে খেলতে গিয়ে এই একগাল হাসি তো দাদাকে মায়ের কাছে বকুনি খেতে দেখে দুচোখ ভরা জল। এতকিছুর বেশির ভাগটাই ভাবে ভঙ্গিতে। এই যে পুনিয়াকে এত ভালোবাসে সে তো শুধু দিনে দু একবার পুচকি মাইজী ডাকে বোঝা যায়।

আবার চিন্তার সমে ফেরে নয়নতারা। পুনিয়ার কথায়। বিয়ে হয়েছে পাঁচ বছর। এখনও কুড়ি পেরোয়নি। ছেলেপিলে হয়নি বলে উঠতে বসতে শাশুড়ির খোঁটা আর ভয় দেখানো চলে যে বাঁজা বৌকে তাড়িয়ে ‘লড়কার’ ফিরে ‘শাদি’ দেবে। পুনিয়া দুঃখ করে বলে, ” বুঝলেন মাইজী, আমার দুখ লাগে যে আপনার ‘দামাদ’ কুছু বলে না। ওদিকে রোজ রাতের বেলা বলে যে হামি তুকে ভালোবাসি! ” এই ‘দামাদ’ সম্পর্কে খুব উচ্চ ধারণা নেই নয়নতারার। মাঝেমধ্যেই বোঝে দু’চারটে চড় থাপ্পড় পড়ে পুনিয়ার ওপর। জিগ্যেস করলে বলে, ” ও কুছু না, ধাক্কা খেয়েছি।”

 এইভাবেই চলছিল রোজকার জীবন। এরমধ্যে পুনিয়া বাজার থেকে দাদিজীর প্রিয় বকফুল এনে দিয়েছে। এমনিতে ওর হাতের ছোঁয়া জল না খেলেও বক ফুলের বড়া দাদিজী খেয়েছেন বেশ রসিয়েই। পুনিয়া ‘মুন্নির’ গা’টা গরম হওয়াতে দুদিন ধরে তাকে কোলে নিয়েই বাড়ির সব কাজ সেরেছে। নয়নতারার ছেলে ওকে খুব একটা পাত্তা দেয়না কারণ বয়েসের ক’বছর তফাৎ থাকলেও পুনিয়ার অপুষ্টিজনিত চেহারা ওর মধ্যে কোনরকম ভারিক্কিভাব আনতে পারেনি। ফলে ‘মুন্না'( পুনিয়ার ভাষায়)  ওকে সমবয়সী বলেই মনে করে। তবে নয়নতারা যখন ছেলের দুরন্তপনায় অতিষ্ট হয়ে মাঝে মাঝে মারতে ছোটে তখন ওকে বুক দিয়ে আগলায় এই পুনিয়াই।

কদিন আগে বেশ বড় রকমের নাড়া খেল নয়নতারা। সকাল বেলা দরজা খুলেই পুনিয়ার যে চেহারা চোখে পড়ল একেবারে আঁতকে উঠলো। রক্তবর্ণ দুটো চোখ। বোঝা যাচ্ছে সারারাত ধরে কেঁদেছে। মাথায় কালশিটে, গালে আঙুলের দাগ, গলায় আঁচড়। মেয়েটা ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে । মাথা ঝন্ করে উঠলো নয়ন তারার। শরীরের সমস্ত রক্ত চড়্ চড়্ করে উঠে যাচ্ছে মাথায়। ” কী হয়েছে তোমার! কে এমন অবস্থা করেছে! ” তীব্র ভাবে বলে সে। অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে পুনিয়া জানায় যে, কাল ওর ‘মরদ’ দারু খেয়ে অনেক রাতে বাড়ি ফেরার পর ‘সাঁস ডাইন’ পুনিয়ার নামে যা নয় তাই ওর কাছে বলেছে। সন্তানহীনতা থেকে শুরু করে ওর এই সেজেগুজে’ফিটফাট’ থাকার দিকে কুৎসিত ইঙ্গিত করেছে। আর সঙ্গে সঙ্গে সেই ” মাতাল আদমীর গুস্সা চড়্ গয়্যে আসমান ” আর ওর সারা শরীর জুড়ে পড়েছে চোরের মার। নয়নতারা সঙ্গে সঙ্গে ঘর থেকে মলম আর ব্যথা কমার ওষুধ আনতে যায়। ফিরে এসে দেখে তার ছোট্ট মেয়েটা ফোঁপাচ্ছে আর পুনিয়ার গায়ে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে, মুখে কোন কথা নেই।

 চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে নয়ন তারার, “চল থানায়!  তোমার বরের নামে আমি রিপোর্ট করব!  এতবড় সাহস! “। হাউমাউ করে তার পা জড়িয়ে ধরে পুনিয়া, ” না মাইজি! পুলিস মে যাইব না! তবে আমাকে আর ঘরে লিবে না! আমার মা- বাপ কেউ নাই, কঁহা যাব আমি! আপনি দাওয়াই দেন, কমে যাবে! মেয়েছেলেদের এমনি কপাল আদমীর মার খাবে অওর পড়ে ভী থাকবে! ” তাই তো রেল কোম্পানির দু’কামরার বাড়িতে ছ’জনের পর পুনিয়াকে জায়গা দেওয়ার ‘অধিকার’ কি নয়নতারারই আছে। ” তবে ওকে তুমি আসতে বলবে, আমি কথা বলব ওর সঙ্গে। ওকে ভয় দেখাতে হবে, আবার যদি তোমার গায়ে হাত তোলে তবে আমি ওর কী অবস্থা করি” পুনিয়ার কাছ থেকে নিজেকে সরাতে সরাতে বলে নয়নতারা। চোখের জল মুছে পুনিয়া একটু একটু করে কাজে লাগল। শুধু নয়ন তারার মেয়ে তার ‘পুচকি মাইজি’কে একটুও চোখের আড়াল করলো না।

দুদিনের মধ্যে সে লোকটি আসেনি। পুনিয়া বললো, ” বুঝেছে যে আপনি কুছ ভালা বুরা বলবেন তাই আসছে না”। নয়নতারা বুঝলো সোজা আঙুলে ঘি উঠবে না, ” ওকে বলো যদি ভালো চায় তো বাবুজীর সঙ্গে দেখা করুক, নাহলে কপালে দুঃখ আছে ” । আসলে একজন মহিলা তাকে ধমকাবে এটা বোধহয় পুনিয়ার মরদের ‘পৌরুষে’ লাগছে। বাবুর কথায় কাজ হল। পরদিন সকালেই পুনিয়া জানালো আজ ‘তিনি’ আসবেন। রাগে জ্বলতে জ্বলতে নয়নতারা লোকটির জন্য পুরী, হালুয়া আর বুটের ডাল করে রেখেছে। কারণ শুধুমাত্র শাসিয়ে ছেড়ে দিলে মেয়েটার  নিরাপত্তা বিপদের মুখে পড়বে। তাই পুরো ব্যাপারটা করতে হবে নরমে গরমে।

 ” মাঈজি!  মাঈজি! ওহ্ আ রহা হ্যায়! ” পুনিয়ার উত্তেজিত গলায় বোঝা গেল ‘বীরপুঙ্গব’ আসছেন। একটা পাগল করা রাগ আসছে নয়নতারার মনে, সামলাতে হবে। সে প্রস্তুত করছে নিজেকে। পুনিয়া উত্তেজিত, ” মাঈজি! জ্যাদা কুছ্ বলবেন না। আমাকে এমনিতে ভালোবাসে, সেদিন একটু বাড়াবাড়ি করেছিল। অন্যদিন এত মারে না” পুনিয়ার কথা শুনতে শুনতে নয়নতারা ভাবে ভয় আর ভালোবাসায় মাখামাখি হয়ে আছে মেয়েটা। কিন্তু প্রতীক্ষা যে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর। সে কোথায়? দোতলা বাড়ির জানলা দিয়ে রাস্তায় যেখানে পুনিয়া ওর বরকে দেখেছে সেখান থেকে তো এত সময় লাগার কথা নয়। ” যাও তো নীচে গিয়ে দেখে এসো তোমার বরকে! আচ্ছা, সত্যি করে বলো তো তুমি ওকে বলেছিলে আমার কথা, বাবুজীর কথা! ” নয়নতারার কথায় ক্ষোভের সুর। ” হাঁ মাজি! রামজীর কিরিয়া! হামি বলেছি! প্রথমে গড়বড় করছিল, ফির বাবুজীর কথা বলতে মেনে গেল, আপনি বিস্ওয়াস্ করেন মাঈজি! ” পুনিয়া রীতিমতো বিব্রত। আবার তাড়া দিতে ও নীচে যায়। একটু পরে হতাশ হয়ে ফিরে আসে, ” না মাঈজি, কোথাও নাই, বিলকুল ফাঁকা রাস্তা। ” ” তবে তুমি ভুল দেখেছ, নয়তো ইচ্ছে করেই ভুল বলেছ! ” তিতকুটে হয় নয়নতারা। পুনিয়া তখন আর কথা বাড়ায় না। সামনে থেকে চলে যায় কাপড় কাচার কাজে। বাথরুমের দরজার বাইরে একটা ছোট্ট বেতের মোড়ায় বসে আছে নয়নতারার মেয়ে আর ওকে সাক্ষী রেখে বকবক করে চলেছে কাজের মেয়েটি, “এত্তো বড়ো  বেইমানি করল মানুসটা ! আরে তুমি বুরবক আদমী! এলে তো মাঈজীর হাতের পুরী হালওয়া খেতে পারতিস্! দেখতিস্ এই বাড়িতে আমার কত্তো ইজ্জত”! নয়নতারা বোঝে সবটাই ওকে ভোলানোর জন্য। ওর ক্ষোভ বাড়ে। ওদিকে তখনও একটা নির্বাক নিষ্পাপ কচি মেয়ের কাছে চলছে বাক্যস্রোত, ” তাও একটা ভাল কি মুন্নি, বাবুজী আর দাদাজি দুজনেই আপিসে গেল আর দাদির গেল পাড়া ঘুরতে! ওরা থাকলে বেপারটা অওর ভি খরাব  লাগত “। নয়নতারা আর পারে না, চেঁচিয়ে উঠে মেয়েকে বলে, ” কী করছ ওখানে বসে বসে ! সারাক্ষণ মুখে আঙুল!  এসো এখানে! তেল মাখাব, স্নান করাব!  এইসব ফালতু ব্যাপারে তোমাকে থাকতে হবে না! ” অতি বাধ্য মেয়ে মোড়াটা নিয়ে মায়ের কাছে চলে আসে। পুনিয়া বোঝে আজ আর মাঈজীর মেজাজ ঠিক হবে না। কাজকর্ম সেরে ও বেরিয়ে যায় প্রতি দিনের মতো ” মাঈজি আসছি” না বলেই।

এ তো ছিল গতকালের ঘটনা। সারাদিন একটা অস্বস্তিতে কাটিয়েছে নয়নতারা। কাউকে সেভাবে কিছু বলতেও পারেনি। বললে যদি শুনতে হয়, ” ছোটলোকদের ব্যাপারে তোমার এত মাথাব্যথা কীসের! ” যদি কেউ বলে, ” তোমার কাজ হওয়া নিয়ে কথা, কাজের লোক মারা খেল কি মরে গেল তাতে তোমার কী! ” না, এমন ধরনের কথা কেউ বলেনা এ বাড়িতে। অন্য বাড়িতে শুনেছে। কিন্তু এটাও তো ঠিক যে এমন উত্তেজনা নয়নতারাও এর আগে দেখায়নি। আজ সকাল থেকে অপেক্ষায় ছিল পুনিয়ার। ও এলেই জানা যাবে ওর বরের গতকালের ওই বদমাইশির কারণ। পুনিয়া এল। ওকে কিছু জিজ্ঞাসা করতে হয় নি, নিজেই বলে গেল হাউমাউ করে, ” মাঈজি! মাঈজি! কাল কী হল একবার সুনেন!  আমার মরদ তো আসতেছিল! সিড়ি দিয়ে উঠতে দেখে মুন্নি দাঁড়িয়ে আছে। ও তো এদের জন্যে জিলাবি আর লাড্ডু নিয়ে আসলো! মুন্নিকে দেখে যেই দিতে গেছে, মুন্নি ওইসব হাতে না নিয়ে বললো কি, ‘তুমি আমার পুচকি মাঈজিকে মেরেছ কেন! তুমি একটা পচা লোক!  আর কোনদিন তুমি আমাদের বাড়ি আসবে না! “

শুনতে শুনতে বিভোর হয়ে যাচ্ছিল নয়নতারা। তার ওই অতটুকু, পলকা, নিশ্চুপ মেয়েটা!! এইটুকু প্রাণে এতটা জোর!!! আর ভাবতে পারেনা, কানে আসছে পুনিয়ার গলা, ” মাঈজি!!! হামি ভাবতে পারছি না হমারা মুন্নি একা একা নেমে গিয়ে এত্ত বড় কান্ড করে আসলো!!! ওত্তোবড় মানুষটাকে…! আসলে মাঈজি, মুন্নির কাছে ধমক খেয়ে আমার মরদের এতো লাজ আসলো যে ও আর আপনার কাছে আসলো নাই!” বাকরুদ্ধ নয়নতারা কে দেখে পুনিয়ার মনে হলো ও বোধহয় এসব কিছুই বিশ্বাস করছে না। তাই আরো জোরের সঙ্গে বলতে থাকে, ” হাঁ মাঈজি হাঁ! ও হমাকে নিজে বলেছে! ওইরকম ডাকুর মাফিক আদমীকে লাজ লাগালো! ভয় পাইয়ে দিল হমার মুন্নি!! বাপ রে বাপ রে বাপ! “

নয়নতারা ধাতস্থ হচ্ছে, সে বুঝতে পারছে সারাক্ষণের সঙ্গী পুচকি মাঈজির কষ্টটা ছোট্ট প্রাণটার ভেতরের আগুনকে জ্বালিয়ে দিয়েছে। আস্তে আস্তে ঘাড় ফিরিয়ে খোঁজে মেয়েকে। একটু দূরে মা আর পুচকি মাঈজির মাঝখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে, মুখে আঙুল, ঠিক বুঝতে পারছে না কী করা উচিৎ। নয়নতারা দুহাত বাড়িয়ে দেয়, ছোট্ট একটা লাফেই পৌঁছে যায় মায়ের কোলে, মুখটা গুঁজে দেয় মায়ের বুকে। মেয়ের হৃদস্পন্দনে মা অনুভব করে দুগ্গামায়ের বোধনের বাদ্যি।

Comments (1)

  1. খুব ভালো লাগলো দিদি।শুভেচ্ছা।

Leave a Reply