শাশ্বত সনাতনস্বভূমি ও সমকাল

আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রের অচর্চিত হিন্দু মানস –

– শ্রী সৌগত বসু

“ডাঃ রায় বক্তৃতা করিবার জন্য উঠিলেন। সেই সময় এমন একটি দৃশ্যের সৃষ্টি হইল, যাহা ভুলিতে পারা যায় না। কয়েক মিনিট পর্যন্ত ডাঃ রায় কোন কথা বলিতে পারিলেন না। কেন না তাহাকে অভিনন্দন করিয়া চারিদিকে ঘন ঘন আনন্দোছ্বাস ও ‘বন্দে মাতরম’ ধ্বনিত হইতে লাগিল। ডাক্তার রায় আরম্ভে বলিলেন যে তাঁহাকে যে সভায় বক্তৃতা করিতে হইবে, ইহা তিনি পূর্বে কল্পনা করিতে পারেন নাই। তিনি মাত্র দর্শক হিসাবে আসিয়াছিলেন। বৈজ্ঞানিক গবেষণাগারেই তাঁহার কাজ। কিন্তু এমন সময় আসে, যখন বৈজ্ঞানিককেও – তাঁহার অবশিষ্ট কথাগুলি শ্রোতৃবর্গের আনন্দ-ধ্বনির মধ্যে বিলুপ্ত হইয়া গেল। ডাঃ রায় পুনরায় বলিলেন – ‘এমন সময় আসে যখন বৈজ্ঞানিককেও গবেষণা ছাড়িয়া দেশের আহ্বানে সাড়া দিতে হয়।’ আমাদের জাতীয় জীবনের উপর এমন বিপদ ঘনিয়ে আসিয়াছে যে ডাঃ পি সি রায় তাঁহার গবেষণাগার ছাড়িয়া এই ঘোর অনিষ্টকর আইনের প্রতিবাদ করার জন্য সভায় যোগ দিয়াছিলেন।”

১৯১৯-এর ফেব্রুয়ারীতে ঠিক এমনটাই ছেপেছিল ‘অমৃত বাজার পত্রিকা’। আর কোন এক প্রসঙ্গে সে কথার উল্লেখ ১৯৩৭-এর অক্টোবরে প্রকাশিত নিজের ‘আত্মচরিত’-এ করেছিলেন আচার্য্য ডাঃ প্রফুল চন্দ্র রায় স্বয়ং।

মোটামুটি গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের ঊনবিংশ শতকের মাঝামাঝির কিছু আগে রাজা রামমোহন রায়ের কর্মকান্ডের মধ্যে দিয়ে শুরু হয়ে বিংশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত যে সময়। আদতে সেটাই ছিল বাঙালীর স্বর্ণ যুগ। জ্ঞানে, বিজ্ঞানে, শিল্পে, ব্যবসায়, শিক্ষায়, সাহিত্যে, আধ্যাত্ম চর্চায় অর্থাৎ কোন জাতি, কোন সমাজ ঠিক কতখানি উন্নত তার মাপদণ্ডের প্রায় সবকটাতেই আক্ষরিক অর্থে বিশ্বমানের নানা কীর্তিতে সেই কালখন্ডেই বারে বারে বাঙালী উজ্জ্বল করেছিল বঙ্গজননী তথা ভারত মায়ের মুখ। বিবিধ ক্ষেত্রে অগ্রণী হতে পেরেছিল, নেতৃত্ব দিতে পেরেছিল গোটা ভারতবর্ষকে তো বটেই। কখনো কখনো গোটা পৃথিবীকে। সে সময়ে যাঁদের কর্মকান্ড প্রতক্ষ্য করে মহামতি গোপাল কৃষ্ণ গোখলে বলেছিলেন – আজ বাংলা যা চিন্তা করে গোটা ভারত সে কথা ভাবে আগামীকাল। তাঁদেরই মধ্যে এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক, সেই সময়ের প্রতিনিধি তিনি। আচার্য্য স্যার প্রফুল্ল চন্দ্র রায়।

প্রথিতযশা জগদ্বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক হয়েও বহুমুখী ক্ষেত্রে তাঁর সাবলীল বিচরণ। সমাজের প্রকৃত উত্তরণের জন্যে তাঁর অনবদ্য অবদানে। তাঁর কর্মকান্ডের সেই সোনায় মোড়া কালখন্ডে অজস্র নক্ষত্রের মধ্যে তিনি বিরলতম। ডাঃ পি সি রায়ের জীবন তাঁর হিমালয় সমান কর্মকান্ড নিয়ে লেখা হয়েছে অজস্র প্রবন্ধ, পুস্তক। কিন্তু অদ্ভুতভাবে তাঁর জীবনের বেশ কিছু গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় চিরকাল রয়ে গিয়েছে অন্ধকারে। এই প্রবন্ধ সেই অন্ধকার মোচনের অতি ক্ষুদ্র কিন্তু আপ্রাণ চেষ্টা।

যশোহর-খুলনার ইতিহাস ও ডঃ পি সি রায় :

১৮৭০ থেকে ১৮৭৪ এই চার বছর ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকার সম্পাদনা করেছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। স্বাভাবিক ভাবেই সেই সময়ে বঙ্গদর্শনের জন্যে তিনি কলম ধরেছিলেন। বঙ্কিমসুলভ অনবদ্য সেই প্রবন্ধগুলির মধ্যে বেশ কয়েকটি ছিল বাংলার ইতিহাস সম্বন্ধে। যার মধ্যে একটির শীর্ষক ছিল – ‘বাংলার ইতিহাস সম্বন্ধে কয়েকটি কথা’। সেই প্রবন্ধে সাহিত্য সম্রাট লিখেছিলেন – “বাংলার ইতিহাস নাই, যাহা আছে তাহা ইতিহাস নয়, তাহা কতক উপন্যাস, কতক বাংলার বিদেশী অসার পরপীড়কদিগের জীবনচরিত মাত্র। বাংলার ইতিহাস চাই, নহিলে বাংলার ভরসা নাই।কে লিখিবে? তুমি লিখিবে, আমি লিখিব, সকলেই লিখিবে। যে বাঙ্গালী তাহাকেই লিখিতে হইবে। মা যদি মরিয়া যায়, তবে মার গল্প করিতে কত আনন্দ। আর এই আমাদিগের সর্বসাধারণের মা জন্মভূমি বাঙ্গলাদেশ, ইহার গল্প করিতে কি আমাদিগের আনন্দ নাই ? ” আর সেই সাথে আহ্বান করলেন – “আইস, আমরা সকলে মিলিয়া বাঙ্গালা ইতিহাসের অনুসন্ধান করি। যাহার যতদূর সাধ্য, সে ততদূর করুক, ক্ষুদ্র কীট যোজনব্যাপী দ্বীপ নির্মাণ করে। একের কাজ নয় সকলে মিলিয়া করিতে হইবে।”

প্রশ্নাতীতভাবে বঙ্কিমের কলম যে ভাবে সদা-সর্বদা উদ্বুদ্ধ করেছে, চালনা করেছে তাঁর পাঠকদের – বিশেষ করে যারা সমাজকে, জাতিকে, দেশকে বিভিন্ন সময়ে যারা পথ দেখিয়েছেন, নেতৃত্ব দিয়েছেন, উত্তরণে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছেন তাদের – সেভাবে হয়তো আর কারো কলম কখনো করে নি। বঙ্কিমের এই প্রবন্ধের প্রভাবে সেই সময়ে বাংলার বিভিন্ন জেলাতে বেশ কিছু মানুষ কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন তাদের নিজের নিজের অঞ্চলের, জেলার ইতিহাস সংকলনের কাজ। তাদেরই একজন ছিলেন খুলনা শহরের উপকণ্ঠে দৌলতপুর কলেজের ইতিহাসের অধ্যাপক সতীশচন্দ্র মিত্র। কিন্তু অচিরেই বুঝতে পেরেছিলেন অধ্যাপকের চাকরীতে সেই সময়ে সামান্য যা মাস মাইনে তার ভরসায় গবেষণাধর্মী গুরুতর এমন একটা কাজ তাঁর একার চেষ্টায় চালিয়ে নিয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব। প্রতাপাদিত্য আর সীতারাম রায়ের জীবনকাহিনী সংকলিত করবেন বলে আগেই কিছু তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন। সব মিলিয়ে যা কিছু সামান্য গবেষণালব্ধ তথ্য, উপকরণ তাঁর কাছে ছিল তাই সম্বল করে কয়েকটা স্কুল পাঠ্য আর ‘উচ্ছ্বাস’ নামে একখানা ছোট বই লিখে তা ছাপিয়ে নিজের গবেষণার কাজে ইতি টানবেন বলে ঠিক করে নিয়েছিলেন হতোদ্যম সতীশচন্দ্র। ‘উচ্ছ্বাস’-এর এক খানা কপি উপহার পাঠিয়েছিলেন তাঁর বয়োজ্যেষ্ঠ, তাঁর খুলনা জেলারই এক কৃতি সন্তান ডঃ পি সি রায়কে। সতীশচন্দ্রের অবস্থা খুব ভালোই জানতেন ডঃ রায়। কয়েকদিনের মধ্যেই ১৯১০-এর ১৮ই সেপ্টেম্বর ইংরেজীতে লেখা স্যার পি সি রায়ের একখানা ছোট্ট চিঠি এসে পৌঁছলো দৌলতপুরে সতীশচন্দ্রের কাছে। সেই চিঠিতে ডঃ পি সি রায় লিখেছিলেন – দেবী সরস্বতী তাঁর স্বপ্নে এসেছিলেন। স্বপ্নে দেবী তাঁকে বলেছেন এমন আবেগ বা ‘উচ্ছ্বাস’-এর পিছনে বৃথাই শক্তিক্ষয়। যথেষ্ট হয়েছে। আর নয়। গত ২০০০ বছর হিন্দু জাতি মগ্ন রয়েছে নিরর্থক দিবাস্বপ্নে। আর গা ভাসিয়েছে এমনই ‘উচ্ছ্বাস’-এ। তোমার জন্যে অপেক্ষা করে আছে অনেক মহৎ কাজ। দিবানিদ্রায়, অসার স্বপ্নে বৃথা সময় নষ্ট না করে সেই মহৎ কাজে ব্রতী হও। নিজেকে সমর্পন কর যশোর – খুলনার ইতিহাস সংকলিত করার পবিত্র কাজে। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সে জন্যেই স্মরণ করবে তোমার নাম। ওঠো – জাগো।

সে চিঠির কোন উত্তর না দিয়ে খুলনা থেকে এক্কেবারে সশরীরে সতীশচন্দ্র হাজির হলেন কলকাতায়। ডঃ রায়ের কাছে। আর মুক্তি পেলেন যাবতীয় দুশ্চিন্তা থেকে। মুহূর্তে কেটে গেল সমস্ত বাঁধা। গবেষণার যাবতীয় খরচ সমেত সতীশ্চন্দ্রের সমস্ত ব্যায়ভার নিজের কাঁধে তুলে নিলেন আচার্য্য। আর দিনরাত এক করে ইতিহাস অন্বেষণের কাজে অক্লান্ত পরিশ্রম শুরু করলেন সতীশচন্দ্র। ঠিক চার বছর পরে ১৯১৪তে কলকাতার বিখ্যাত প্রকাশনা সংস্থা ‘চক্রবর্তী, চ্যাটার্জী অ‍্যান্ড কোম্পানী’ থেকে প্রকাশিত হলো সতীশচন্দ্র মিত্রের ‘যশোর-খুলনার ইতিহাস’-এর প্রথম খন্ড। সে যুগে যার দাম ছিল ৩ টাকা। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা দরকার। বাণিজ্য জগতের বাইরের আর কোন কৃতি বাঙালী যা পারেন নি। তা বারে বারে সাফল্যের সাথে করে দেখিয়েছিলেন আচার্য্য প্রফুলচন্দ্র রায়। সৃষ্টি করেছিলেন ব্যবসা বিমুখ বাঙালীকে বাণিজ্যে উৎসাহিত করে সাফল্যের মুখ দেখানোর অজস্র উদাহরণ। তেমনই একটি উদাহরণ এই প্রকাশনা সংস্থা, ‘চক্রবর্তী, চ্যাটার্জী অ্যান্ড কোম্পানী। আচার্য্য রায়ের উৎসাহে, অর্থে তাঁর ছাত্রদের সেই প্রতিষ্ঠানের মালিকানা পরে হস্তান্তরিত হলেও শহর কলকাতার রাজপথ আলো করে ১৫ নং কলেজ স্ট্রীট ঠিকানায় যা এখনো মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। যশোর-খুলনার ইতিহাসের প্রথম খন্ড সতীশচন্দ্র উৎসর্গ করেছিলেন আচার্য্যকেই। বইয়ের শুরুতেই উৎসর্গপত্রে লিখেছিলেন –

যিনি বিজ্ঞান-চর্চ্চায় ও পান্ডিত্য-গৌরবে সমগ্র সভ্য জগতে
যশোভূষিত হইয়াছেন;
যিনি বিদ‍্যোৎসাহিতায় দানশৌন্ডিকতায় বঙ্গদেশে
দ্বিতীয় দয়ার সাগর বিদ্যাসাগর
বলিয়া বরণীয় হইয়াছেন;
যাহার বালসুলভ সরল প্রকৃতি, বীরোচিত মনস্বিতা
দরিদ্রতুল্য সামান্য জীবিকা এবং ঋষিতুল্য উচ্চ চিন্তা
ভারতের প্রাচীন উচ্চ আদর্শের জীবন্ত দৃষ্টান্তস্থল হইয়াছে,
সেই চিরকুমার, তাপসব্রত, স্বজাতিকুলতিলক
যশোহর-খুলনার অকৃত্রিম বন্ধু, খুলনার অধিবাসী
শ্রীযুক্ত প্রফুলচন্দ্র রায় D.Sc., Ph.D, C.I.E, F.C.S
মহোদয়ের শ্রীকরকমলে,
তাঁরই যত্নে, অর্থে, চেষ্টায় ও উৎসাহে কল্পিত, সংগৃহিত ও রচিত
যশোহর-খুলনার ইতিহাস
সাদরে ভক্তিভরে উৎসর্গ করিলাম।

দীন গ্রন্থকার।

 

এর আট বছর পরে ১৯২২-এ প্রকাশিত হয়েছিল সতীশচন্দ্র মিত্রের ‘যশোহর-খুলনার ইতিহাস’-এর দ্বিতীয় খন্ড। যার ভূমিকায় গ্রন্থকার লিখলেন – শ্রীভগবানের অপার করুনা এবং আচার্য্য প্রফুলচন্দ্রের দানশীলতাই এ পুস্তক প্রকাশের একমাত্র সহায়। গবেষণা আর গ্রন্থনার কাজ চলাকালীন সতীশচন্দ্র একবার এমনই ভয়ঙ্কর অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন যে তার মৃত্যুসংবাদ পর্যন্ত্য রটে গিয়েছিল। তাই ভূমিকাতে লিখলেন – ইষ্টকৃপা ব্যাতিত তার জীবনের আশা ছিল না; আচার্য্যদেবের কৃপা ব্যাতিত পুস্তক ছাপিয়ে বাহির করিবার ভরসা ছিল না। আর দ্বিতীয় খন্ডের উৎসর্গপত্রের শুরুতে ডঃ রায়কে ‘আচার্য্যদেব’ সম্বোধন করে তাঁর উদ্দেশ্যে সতীশচন্দ্র লিখলেন – প্রথম খন্ডের মতনই দ্বিতীয় খন্ড প্রকাশের সমস্ত ব্যবস্থা তিনিই করেছেন আর তাই গঙ্গাজলে গঙ্গাপুজো করার মতন এই খন্ডটিও তিনি ডঃ রায়-এর ‘করপল্লবে’ উৎসর্গ করছেন। ছত্রে ছত্রে নিজের কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ডঃ রায়ের উদ্দেশ্যে সতীশচন্দ্র লিখেছিলেন –

“আপনি যশোহর-খুলনার গৌরব স্তম্ভ। খুলনা আপনার জন্মগৌরবে পবিত্র; যশোহর আপনার বংশগৌরবে সুরভিত; সমগ্র বঙ্গ আপনার কর্মগৌরবে সমুন্নত ; ভারতবর্ষ আপনার কীর্ত্তি-কথায় মুখরিত; আর বিশ্বমানব আপনার জ্ঞান-গৌরবে উদ্ভাসিত… আপনি অর্থ আয় করেন ত্যাগের জন্য, ভোগের জন্যে নহে ; সে অর্থ নিত্য বঙ্গীয় যুবকের শিক্ষাদীক্ষায় এবং বিদ্যাপীঠের সাহায্য-কল্পে অবিরত ব্যায়িত হয়। শুধু তাহাই নহে; বঙ্গের অঙ্গ যেখানে ক্ষতবিক্ষত, যেখানে রোগগ্রস্থ, সেখানে তাহার চিকিৎসার জন্য এ দেশের আবালবৃদ্ধবনিতার চির-পরিচিত ‘ডাক্তার রায়’ অবতীর্ন; আজ দুর্ভিক্ষে; কাল প্লাবনে; আজ নৈতিক সংস্কারে; কাল অন্ন বা বস্ত্র সমস্যার সমাধানে; এখানে বিদ্যামন্দিরের সংগঠনে; সেখানে শিল্পশালার উদ্বোধনে; যেখানে যখন দুর্দ্দৈব; যেখানে যখন প্রয়োজন, সেখানে আপনি কান্ডারী। আপনি দীনবাসপরিহিত, জীর্ন-তনু লইয়া চির-কুমার তাপস-মূর্ত্তিতে বুক পাতিয়া দাঁড়াইলে, সমস্ত ভারতের ভক্তি বিশ্বাসের চাক্ষুষ নিদর্শন স্বরূপ আপনার নামে অজস্র অর্থ বৃষ্টি হয় এবং আপনার আবদ্ধ কার্য্যকে লক্ষীযুক্ত, জয়যুক্ত করিয়া দেয়। পরোপচিকীর্ষাই আপনার ধর্ম্ম, উহাই আপনার যাবতীয় মতামত ও কর্ম্মকান্ডের ভিত্তি।”

বোধকরি বইয়ের পাতায় ছাপার অক্ষরে এমন উৎসর্গপত্র বিরল। কৃতজ্ঞতা স্বীকারের ভাষায় তো বটেই। আচার্য্য রায়ের মতন জীবনের বিবিধ ক্ষেত্রে বেঁচে থাকতেই কিংবদন্তীতে পরিণত, এ যুগে না হলেও প্রকৃত বিদ্যাচর্চার, পান্ডিত্যের উৎকর্ষতার সে যুগে সর্বজন শ্রদ্ধেয়, একজন ঋষিতুল্য বৈজ্ঞানিকের বিবরণ দিতে প্রয়োজনীয় শব্দ চয়নেও অনন্য।

কিন্তু সব থেকে অদ্ভুত। সব থেকে আশ্চর্যের যে বিষয়টি, তা হলো সতীশচন্দ্র মিত্রের ‘যশোহর-খুলনার ইতিহাস’-এর প্রথম খন্ডটি ১৯১৪ সালে আর দ্বিতীয় খন্ডটি তার ৮ বছর পরে ১৯২২ সালে যখন প্রথমবার আত্মপ্রকাশ করে তখন পুস্তকের ভূমিকায়, উৎসর্গ পত্রে ডঃ রায়ের প্রতি গ্রন্থকারের শ্রদ্ধার্জ্ঞ ছাপা হয়েছিল তার প্রাপ্য গুরুত্ব দিয়েই। কিন্তু পরবর্তীতে যখন ঐ দুটি খন্ডেরই পুনরায় মুদ্রণ করা হয়। আর ইদানিং বাজারে বই দুটির যে সংস্করণ পাওয়া যায় সেখানে বর্তমান প্রকাশক স্যার পি সি রায়ের প্রতি সতীশচন্দ্রের কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের কথা ছাপানোর প্রয়োজন আর বোধ করেন নি।

রাজনৈতিক সংগ্রাম :

১৯২৫এর ১১ আর ১২ই এপ্রিল অখিল ভারত হিন্দু মহাসভার ৮ম অধিবেশন বসেছিল কলকাতার হ্যালিডে স্ট্রীটের (পরবর্তীতে যে রাস্তার নাম হয় সেন্ট্রাল এভেন্যু আর এখন চিত্তরঞ্জন এভেন্যু) পাশেই অধুনা লুপ্ত হ্যালিডে পার্কে। উপস্থিত ছিলেন সেই সময়ে অখিল ভারত হিন্দু মহাসভার সভাপতি লালা লাজপত রায় আর গোটা দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা হিন্দু মহাসভার পদাধিকারী আর প্রতিনিধিরা। কলকাতার মানুষের উপস্থিতিতে এক বিশাল জনসমাগমে উদ্বোধনী ভাষণ দিতে গিয়ে হিন্দু ব্যক্তিপরিচয় দেওয়ার অধিকার তৎকালীন সমাজে ভয়ঙ্কর ভাবে খর্ব করা হচ্ছে বলে তীব্র প্রতিবাদ করলেন সেই অধিবেশনের অভ্যর্থনা কমিটির প্রধান। আর কেউ নন, তিনি আচার্য্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়। রীতিমতো তথ্য আর পরিসংখ্যান পেশ করে ঘন্টা খানেকের বেশি সময়ের উদ্বোধনী ভাষণে তিনি জানালেন অত্যাচার, আক্রমণ, বলপূর্বক ধর্মান্তরকরণ ইত্যাদির কারণে কিভাবে হিন্দুরা সংখ্যালঘুতে পরিণত হচ্ছে। বিশেষ করে বাংলায় হিন্দুরা কি ভাবে সংখ্যালঘু থেকে আরো সংখ্যালঘুতে পরিণত হচ্ছে। আর সে কথা দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি। তুলে ধরেছিলেন সেই কারণে হিন্দু সমাজের চরম দুর্ভোগের কথা। সেই অধিবেশনেই উঠে এসেছিল হিন্দু সমাজের প্রত্যেক মানুষের কর্তব্য হিসেবে হিন্দু সমাজের তথাকথিত অচ্ছুৎ, দলিত সম্প্রদায়ের মানুষদের শিক্ষার ব্যবস্থা সুনিশ্চিত করার সাথে বিভিন্ন স্কুল কলেজে বাকি সকলের সঙ্গে তাদের শিক্ষার ব্যবস্থা প্রচলিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা। তীব্র নিন্দা করা হয়েছিল হিন্দু সমাজে পণ প্রথার মতন কুপ্রথার। প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছিল, অসহায় বালিকা আর মহিলাদের স্বার্থে তাদের জন্য অনাথ আশ্রম আর প্রসূতি চিকিৎসা কেন্দ্র গড়ে তোলার কথার মতন আরো অনেক ধরণের সমাজ সংস্কারের লক্ষ্যে।

হিন্দু বিধবা বিবাহের আইনগত স্বীকৃতি আদায়ের কথা উঠলেই প্রথমেই যাঁর নাম মনের মনিকোঠায় ভেসে ওঠে তিনি প্রাতঃস্মরণীয় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। বিদ্যাসাগরের নেতৃত্বে হিন্দু বিধবা বিবাহ আইনগত স্বীকৃতি পেলেও তৎকালীন হিন্দু সমাজ সে প্রথাভাঙা নতুন প্রথা কতটা গ্রহণ করেছিল তা নিয়ে যথেষ্ট বিতর্কের অবকাশ আছে। বিদ্যাসাগরের সেই আন্দোলনের মুলে ছিল হিন্দু নারীর মানবাধিকার রক্ষা করার মতন গুরুতর বিষয়। কিন্তু কালের অন্ধকারে হারিয়ে গেছে হিন্দু সমাজের সুরক্ষা নিশ্চিত করার মতন আরেক গুরুতর উদ্দেশ্যে হিন্দু বিধবা বিবাহ সমাজে গ্রহণযোগ্য করে তোলার আরেক আন্দোলনের কথা। যার নেতৃত্বে ছিলেন আচার্য্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, কৃষ্ণকুমার মিত্র, রামানন্দ চ্যাটার্জীর মতন প্রতিথযশা পন্ডিত মানুষজন। যারা প্রায় সকলেই ছিলেন অবিভক্ত বাংলার হিন্দুমহাসভার নেতৃত্বে। যে আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য আচার্য্য রায় ব্যাখ্যা করেছিলেন ১৯২৫-এর এপ্রিলে তাঁর হ্যালিডে পার্কার ভাষণেও। লিখিত কোনকিছুর সাহায্য ছাড়াই জনগণনার তথ্যপরিসংখ্যান স্মৃতি থেকে নির্ভুলভাবে তুলে ধরে – তার বিশ্লেষণ করে – দেখিয়েছিলেন সন্তান ধারণ করার উপযুক্ত বয়সে বিধবা হওয়া হিন্দু নারীর পুনরায় বিবাহ দেওয়া না হলে আর বিধবা মুসলমান নারীর পুনর্বিবাহের চালু থাকা প্রথার কারণে কিভাবে অতি দ্রুত মুসলমান জনসংখ্যার কাছে নতজানু হতে বাধ্য হবে বাংলার হিন্দুরা।

এমনকি ১৯২৫-এর এপ্রিল মাসে হ্যালিডে পার্কে হওয়া অখিল ভারত হিন্দুমহাসভার সেই অধিবেশনের খবর গুরুত্ব দিয়ে ছেপেছিল কলকাতা থেকেও প্রকাশিত মূলতঃ ইউরোপীয়ানদের মধ্যে জনপ্রিয় সেকালের বিখ্যাত ইংরেজী দৈনিক ‘দ্য ইংলিশম্যান’।

বঙ্গীয় প্রাদেশিক হিন্দু মহাসভার খুলনা অধিবেশনে সভাপতির ভাষণে আচার্য্য প্রফুল চন্দ্র রায় বলেছিলেন হিন্দু সমাজের তথাকথিত নিম্নশ্রেণীকে অনাচারীদের অবজ্ঞা থেকে মুক্ত করার কথা। তাদের ‘জলচল’ করার কথা। বলেছিলেন যদি সাহসে না কুলায় তাহলে বুঝতে হবে দেশজুড়ে সব রাজনৈতিক নেতৃবর্গের সমস্ত বক্তৃতা আর আস্ফালন ফাঁকা আওয়াজ মাত্র।

১৯৩১এর সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া দ্বিতীয় গোল টেবিল বৈঠকে অবিভক্ত ভারতের হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশগুলোতে মুসলমানদের জনপ্রতিনিধিত্বের ভারসাম্য বজায় রাখার তাগিদে যেমন তাদের জন্য আসন সংরক্ষণ করার প্রস্তাব রাখা হলো, তেমনি আবার অবিভক্ত বাংলা, পঞ্জাবের মতন প্রদেশগুলোতে মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও সেই সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের জন্যই আলাদা করে আসন সংরক্ষণ করার পক্ষে জোরালো সওয়াল করলো মুসলিম লীগ। এরই মধ্যে বর্ণ হিন্দু আর হিন্দু অনগ্রসর দলিত শ্রেণীর জন্য প্রস্তাবিত পৃথক নির্বাচনী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে যৌথ নির্বাচনী ব্যবস্থার দাবিতে আমরণ অনশন শুরু করলেন পুনের ইয়েরাওয়াড়া কারাগারে বন্দি গান্ধীজী। গান্ধীজীর জীবন রক্ষার্থে এ বিষয়ে তাঁর সাথে আলোচনা করতে পুনে পৌঁছলেন হিন্দু সমাজের দলিত শ্রেণীর সর্বজনগ্রাহ্য তথা অগ্রণী নেতা ডঃ ভীমরাও বাবাসাহেব আম্বেদকর। গান্ধীজীর শর্ত অনুযায়ী ১৯৩২এর ২৫শে সেপ্টেম্বর স্বাক্ষরিত হলো পুনে চুক্তি। ব্রিটিশ সরকারও সেই চুক্তির মান্যতা দিতে কোনো রকম বিলম্ব করলো না। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ব্যক্তিগত ভাবে গান্ধীজীকে চিঠি লিখে পুনে চুক্তির বিরোধিতা করলেন। নিজের চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, পুনে চুক্তি পুনর্বিবেচনা করে সংশোধন না করা হলে তা যে অবিভক্ত বাংলায় ধারাবাহিক আর দীর্ঘস্থায়ী সাম্প্রদায়িক ক্ষত সৃষ্টি করবে সে বিষয়ে তিনি সম্পূর্ণ নিশ্চিত। বিশ্বকবির এমন প্রতিবাদেও কোনো কাজ হলো না। ১৯৩৭এর নির্বাচনের ঠিক আগের বছর মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশ অবিভক্ত বাংলায় মুসলমানদের জন্য বিশাল সংখ্যায় আলাদা করে আসন সংরক্ষণের ব্যবস্থা রদ করার মরিয়া চেষ্টা করলো প্রদেশের হিন্দু সমাজ। বৃটিশ সরকারের কাছে পেশ করা হলো দাবী পত্র। সেই দাবীপত্রে সাক্ষর করেছিলেন সেই সময়ে অবিভক্ত বাংলার লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের সমস্ত হিন্দু সদস্য, ২৩টা পৌরসভার প্রধান, বিভিন্ন জেলা পরিষদের ৮ জন প্রধান, ৩৬ জন বিশিষ্ট হিন্দু নেতা, শহর কলকাতার মেয়র, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য্যের মতন বিশিষ্ট মানুষজন। এই বিভেদমূলক হিন্দু বিরোধী আইনের প্রতিবাদে সক্রিয় আর সোচ্চার হলেন আচার্য্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় সাথে কথা সাহিত্যিক শরৎ চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রামানন্দ চ্যাটার্জী, ডাঃ নীলরতন সরকার, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, স্যার ব্রজেন্দ্র নাথ শীলের মতন প্রবাদপ্রতিম মানুষেরাও।

বাংলা ভাষায় সংস্কৃতের প্রভাব খুব বেশী। সে কারণে বড্ড বেশী হিন্দু-গন্ধী। তাই হয় বাংলা ভাষার গুরুত্ব, প্রভাব সব খর্ব করতে হবে। না হয় ভাষার চরিত্রটাই বদলে দিতে হবে। হাতে গোনা যায় এমন দু’এক জন বিরল ব্যতিক্রম বাদ দিলে – গত শতাব্দীর শুরু থেকে এই নিয়ে যারপরনাই ক্ষুব্ধ ছিল অবিভক্ত বাংলার মুসলমান সমাজ। আর সেই জোরে কয়েক বছর পর থেকে একই লক্ষ্য নিয়ে সলতে পাকাতে শুরু করেছিল মুসলিম লীগ। আরো কয়েক বছর পরে – তখন ১৯৪০। মাত্র বছর তিনেক আগে – খানিকটা কংগ্রেসের বদান্যতায় আর বাকিটা কংগ্রেসেরই খামখেয়ালিপনায় – প্রথম বার অবিভক্ত বাংলার মসনদে চড়ে বসার সুযোগ তখন পেয়ে গিয়েছে মুসলিম লীগ। তাই অবিভক্ত ভারতের মধ্যে একমাত্র ‘মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ’ অবিভক্ত বাংলাতেই তখন ক্ষমতার অলিন্দে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে তারা। ১৯৩৭-এ অবিভক্ত বাংলার মসনদে বসা ইস্তক এক এক করে প্রদেশের ইসলামীকরণের অ‍্যাজেন্ডা সম্পূর্ণ করতে শুরু করেছিল মুসলিম লীগ। প্রদেশের আইনসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে অবিভক্ত বাংলার ইসলামীকরণের লক্ষ্যে পাশ করিয়ে নিতে শুরু করেছিল হিন্দুদের প্রতি চরম বিদ্বেষমূলক একের পর এক আগ্রাসী আইন। সেই তালিকায় একদম উপরের দিকে ছিল মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ অবিভক্ত বাংলার হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজধানী কলকাতার হিন্দুদের সর্বনাশকারী আইন – ক্যালকাটা মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন অ‍্যামেন্ডমেন্ট অ‍্যাক্ট। বেঙ্গল সেকেন্ডারী এডুকেশন বিল ছিল গোটা অবিভক্ত বাংলার হিন্দু সমাজের প্রতি মুসলিম লীগের ইসলামী অ‍্যাজেন্ডার আরেক আগ্রাসী পদক্ষেপ। মাধ্যমিক শিক্ষাক্রম থেকে সংস্কৃতের প্রভাবে হিন্দু-গন্ধী বাংলার গুরুত্ব খর্ব করে উর্দুর মতন কোনও ইসলামী ভাষার প্রভাব বৃদ্ধি করতে গেলে শিক্ষাক্রমের পরিবর্তন করা আবশ্যিক। প্রধানমন্ত্রী ফজলুল হকের হাতেই ছিল শিক্ষা দপ্তর। তাই ১৯৪০-এর ২১শে অগাস্ট তিনিই অবিভক্ত বাংলার অ্যাসেম্বলীতে পেশ করেছিলেন ‘বেঙ্গল সেকেন্ডারী এডুকেশন বিল’। আড়াআড়ি বিভাজন হয়ে গেল বাংলার রাজনীতির সাথে সমাজেরও। দলমত নির্বিশেষে হিন্দুরা এই সাম্প্রদায়িক ‘বেঙ্গল সেকেন্ডারী এডুকেশন বিল’-এর বিরুদ্ধে। আর ঠিক তেমন করেই উল্টো দিকে স্কুল শিক্ষায় উর্দু ভাষাকে আবশ্যিক করার এই প্রস্তাবিত আইনের সমর্থনে অবিভক্ত বাংলার গোটা মুসলমান সমাজ আর তাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব। আগের সমস্ত রাজনৈতিক বিরোধিতাকে সরিয়ে রেখে অ্যাসেম্বলীর ভিতরে আর বাইরে তীব্র প্রতিবাদে ফেটে পড়ল অবিভক্ত বাংলার ঐক্যবদ্ধ হিন্দু সমাজ। নেতৃত্বে তখন সদ্য হিন্দু মহাসভায় যোগ দেওয়া আর নির্দল প্রার্থী হিসেবে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্যে সংরক্ষিত আসন থেকে ১৯৩৭-এর নির্বাচন জিতে বিধানসভার সদস্য হওয়া ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। গোটা বাংলা সফর করে জনমত সংগঠিত করলেন ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। প্রতিটা জনসভায় উপচে পড়তে লাগলো মানুষের ভিড়। শ্রদ্ধানন্দ পার্কে এমনই এক জনসভা থেকে শ্যামাপ্রসাদ ঘোষণা করলেন এই সাম্প্রদায়িক বিল প্রত্যাহার করা না হলে তারা মধ্য শিক্ষা নিয়ন্ত্রণ আর পরিচালনার জন্যে পৃথক পর্ষদ স্থাপন করে হিন্দুদের জন্যে আলাদা শিক্ষা ব্যবস্থা প্রণয়ন করবেন। সেই সভা থেকে আর অন্য সভা থেকে একই ঘোষণা করলেন শরৎ চন্দ্র বসু। এই আন্দোলনে যোগ দিলেন এ বি টি এ, ক্যালকাটা টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন-এর মতন বিভিন্ন শিক্ষক সংগঠন। তাদের উদ্যোগেও ধারবাহিক ভাবে সংগঠিত হতে লাগলো প্রতিবাদ। সমস্ত সভাগুলোতেই সক্রিয় যোগদান করলেন কংগ্রেস আর হিন্দু মহাসভার নেতৃত্ব। মুসলিম লীগের সাম্প্রদায়িক অ্যাজেন্ডার বিরুদ্ধে অবিভক্ত বাংলার হিন্দুদের এই সংগঠিত প্রতিবাদ আন্দোলনে সামিল হয়ে সক্রিয় হলেন শুধু নয় একেবারে রাস্তায় নেমে নেতৃত্ব দিলেন – ধারাবাহিক ভাবে বিভিন্ন সভা সমিতিতে বক্তৃতা করলেন – সেই সময়ে দেশের অন্যতম সম্মানিত ব্যক্তিত্ব, বিশ্ববরেণ্য বিজ্ঞান সাধক আচার্য্য স্যার প্রফুল্ল চন্দ্র রায়। সাথে একই রকম ভাবে সক্রিয় হলেন ডাঃ নীলরতন সরকার, হীরেন্দ্রনাথ দত্ত, ডঃ মেঘনাদ সাহা, ডঃ সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণন, আচার্য্য স্যার যদুনাথ সরকার, ডঃ সুনীতি চট্টোপাধ্যায়, জাস্টিস স্যার মন্মথনাথ মুখোপাধ্যায় প্রমুখের মতন বিভিন্ন ক্ষেত্রের প্রবাদ প্রতিম মানুষেরা। বার্ধক্য আর অসুস্থতার কারণে সশরীরে উপস্থিত থাকতে না পারলেও বিভিন্ন সভায় লিখিত প্রতিবাদ পাঠালেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

গবেষণাগার ছেড়ে দেশ, সমাজ, স্বজাতির দুর্দিনে কখনও সহায় হয়ে, কখনও প্রতিবাদের প্রতিভূ হয়ে বারে বারে লড়াইয়ের ময়দানে একেবারে সামনের সারিতে সক্রিয় হয়েছেন যে বিজ্ঞান তাপস ১৮৬১-এর ২রা অগাস্ট অর্থাৎ আজকের দিনেই জন্ম হয়েছিল তাঁর। এ সমাজ বহু মানুষকে মাথায় তুলে রেখেছে। উদযাপন করেছে প্রাণ ভরে। আজও সেই উৎসব পালনে কোন খামতি নেই। সেই উদ্যোগের সিকিভাগও যদি সেই স্বদেশপ্রেমিক ঋষিতুল্য বিজ্ঞান সাধকের জীবন আদর্শকে পাথেয় করার জন্যে বরাদ্দ করতে পারত তবে হয়ত কালের অন্ধকারে তলিয়ে যেতে হতো না এই সমাজকে – বাঙালী হিন্দু নামের এই জাতিকে।

তথ্যসূত্র :
১) ‘দ্য ইংলিশম্যান’ পত্রিকার ডিজিটাল আর্কাইভ
২) ‘অমৃতবাজার পত্রিকা’-র ডিজিটাল আর্কাইভ
৩) ‘যুগান্তর’ পত্রিকার ডিজিটাল আর্কাইভ
৪) ‘যশোহর-খুলনার ইতিহাস’ – প্রথম ও দ্বিতীয় খন্ড – সতীশ চন্দ্র মিত্র
৫) ‘আত্মচরিত’ – আচার্য্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়
৬) ‘Communalism and Bengal politics 1929 – 1947, A case study of Hindu Mahasabha’ – Dr Pragati Chatterjee

 

(লেখক পরিচিতি: ইতিহাস চর্চায় ব্যাপ্ত নিবন্ধকার)

 

Leave a Reply