সংস্কৃতি

কলমচিদের আড্ডাখানায় – ৮

( সপ্তম পর্বের পর)

আনন্দবাজার পত্রিকার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দেশ পত্রিকার দফতরে ছিলো আরও কিছু আড্ডার গল্প। যখন দেশ পত্রিকা বর্মণ স্ট্রিটের বাড়ি থেকে প্রকাশিত হতো তখন থেকে শুরু করে প্রফুল্ল সরকার ষ্ট্রিটের ঝাঁ-চকচকে বাড়ি পর্যন্ত অনেক গল্প ছড়িয়ে আছে এই পত্রিকা ঘিরে। কিংবদন্তী প্রতীম সম্পাদক সাগরময় ঘোষের কাছে নানান প্রয়োজনে বাংলার শিল্প সংস্কৃতি জগতের নানা মানুষ আসতেন। আড্ডার ছলে তাঁদের নানা অভিজ্ঞতা গল্প সকলের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া – সে এক মণিকাঞ্চনযোগ। বর্মন স্ট্রিটের দেশ পত্রিকার দফতরটি ছিল বেশ নিরিবিলি। প্রত্যেক শনিবার সাগরময়ের সমবয়সী অনেক সাহিত্যিক বন্ধু সেখানে আসতেন। দুটি টেবিল থাকতো জোড়া দেওয়া। তার ওপর পাতা হতো খবরের কাগজ। সের খানেক মুড়ি ঢালা হতো। সঙ্গে থাকতো বাতাসা,ছোলা,নারকোল, চিনাবাদাম।

বিমল মিত্র নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী প্রভাত দেব সরকার, প্রমুখ সেই আড্ডায় হাজির থাকতেন। একদফা মুড়ি নারকোল শেষ হতেই বিমল মিত্র আবার মুড়ি তেলেভাজার অর্ডার দিতেন। একদিন শনিবার বিকেলবেলায় শালপাতা মোড়া ঠোঙা নিয়ে বিমল মিত্র এসে উপস্থিত হলেন,- বড় বাজারের মোড়ে নেমে দেখি ফুটপাতের ধারে অয়েল কেক একেবারে গরমাগরম। আড্ডার গল্পের সঙ্গে ভালো জমবে ভেবেই একঠোঙা নিয়ে এলাম। বললেন বিমল মিত্র। – -অয়েল কেক? সে আবার কি?সকলেই উদগ্রীব হয়ে সকলেই জিজ্ঞাসা করলেন। 

– আমাদের আদি ও অকৃত্রিম তেলেভাজা। এবার বুঝলেন তো। রাস্তার ধারে তোলা উনুনে ভাজছিলো। আর জানেন তো? যত ধুলো পড়বে ততই তার আস্বাদ,ততই তার রঙের খোলতাই। সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলেন বিমল মিত্র।

একবার বেশ বর্ষা হচ্ছে। তেলমুড়ি সহযোগে চাপর্ব চলছে। মুড়ি চিবুতে চিবুতে সুশীল রায় দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে আক্ষেপ করে গেয়ে উঠলেন।
– এমনও দিনে তারে খাওয়া যায়।
তরুণ কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীই বা কম যাবেন কিসে।তিনি তাঁর সুরেলা গলায় গেয়ে উঠলেন,
“ইলিশ ভাতে দিয়ে সরিষায়,
এমনও দিনে তারে খাওয়া যায়।”

দেশ পত্রিকা অফিসের আরেকটি আড্ডা বসতো সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে কেন্দ্র করে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় যে ঘরে বসতেন সেই ঘরে তাঁর সঙ্গে বসতেন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, জয় গোস্বামী প্রমুখ। রোজ বিকেলের দিকে সেই ঘরে আড্ডা বসতো। কত বিচিত্র বিষয় নিয়ে যে কথা হতো তার ইয়ত্তা নেই। দিব্যেন্দু পালিত, সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ,পার্থ বসু, সিদ্ধার্থ ঘোষ, হর্ষ দত্ত চলে আসতেন সেই ঘরে আড্ডা দিতে।সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কোনো মানুষকে ফেরাতেন না। যতটা সম্ভব ভালো ব্যবহার করা যায় করে চলতেন। অবলীলাক্রমে প্রশ্রয় দিতেন নতুন নতুন প্রকাশককে বা উদীয়মান কবিদের।

তাঁর কাছে মহিলাদের সমাগম ছিলো খুব বেশী। একবার সুনীল কয়েকদিনের জন্য আমেরিকা গিয়েছিলেন, এরপর কিছুদিন দফতরে আসা হয়নি।তারপর ফিরে এসে আবার দফতরে এসেছেন।সেদিন অসংখ্য মহিলা এসেছেন।সবাই মিলে জোরদার আড্ডা চলছে।

একজন এসে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়কে জিজ্ঞাসা করলেন,
– কেমন বুঝছেন?
শীর্ষেন্দু কিছু একটা লিখছিলেন।মুখ না তুলেই রসিক শীর্ষেন্দু মন্তব্য করলেন,
” মীনগণ হীন হয়ে ছিল সরোবরে
এখন তাহারা সুখে জলক্রীড়া করে”।

( ক্রমশঃ)

Leave a Reply